মুক্তমত

শুভবুদ্ধি ও কল্যাণবোধ জাগ্রত হোক

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

সম্প্রতি পুরান ঢাকার চকবাজারে যে মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটে গেল, এর চিত্র হয়তো এত স্ফীত হতো না, যদি নিমতলীর ঘটনার পর তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হতো। এখন দেখছি চকবাজারে এত বড় মর্মন্তুদ ঘটনার পর রাসায়নিক গুদাম সরাতে গিয়ে দায়িত্বশীলরা বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে অনিয়ম-দুর্নীতি নির্মূলে যে কঠোর অবস্থান-অঙ্গীকারের কথা আমরা শুনি, এর বাস্তবায়ন হবে কী করে! সন্দেহ পোষণ করি না যে, দুর্নীতি নির্মূলে সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা সরকারের আরো অনেকেরই সদিচ্ছা-আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি আছে। কিন্তু কয়েকজনের পক্ষে দুর্নীতির বৃত্ত ভাঙা অত্যন্ত দুরূহ। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে বিবেকের তাগিদে দায়িত্বশীলদের এ ব্যাপারে নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে। লালসার তাড়ায় যারা তাড়িত তাদের বর্জন করতে হবে। এই যে স্বাস্থ্য খাতে কিংবা বিমানের এত বড় ক্ষতচিত্র ভেসে উঠল, এর প্রতিকারে দৃষ্টি দিতে হবে আরো গভীরে। ভূমি অফিসগুলোর নানা স্তরে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র নাকি আরো স্ফীত। এ নিয়ে নানা রকম নেতিবাচক মন্তব্যও শোনা যায়। বর্তমান সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েই এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। সংবাদটি শুভ। তবে এর অগ্রগতি কতটা, মানুষ তা জানতে পারেনি। দুর্নীতিকে কখনোই সমাজের ব্যাধি হতে পারে না। রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলে থেকে যাওয়া ব্যাধির উপসর্গ। দুর্নীতির বীজ রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসন ব্যবস্থার মূলেই থেকে যায়।

রাষ্ট্র, দেশ, সমাজে সেই বীজ সর্বক্ষেত্রে চারাগাছ হিসেবে বাড়তে থাকে এবং ক্রমেই মহিরুহ বিষবৃক্ষ হিসেবে দেখা দেয়। অতীতে আমরা এমনটিই দেখেছি। কাজেই ওপর থেকে ভাসা ভাসা ব্যবস্থা নিলে কখনোই দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করা যাবে না। তাকে যদি ধ্বংসই করতে হয়, তাহলে একেবারে বীজেই নাশ করতে হবে। তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, দুর্নীতির বীজ মূলত দেশের সম্পদের পরিমাণ, জনসংখ্যার আয়তন, সম্পদ বৃদ্ধি, সম্পদ থেকে উৎপাদনের বন্দোবস্ত এবং সম্পদ ও উৎপাদনের বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যেই থাকে। যদি উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক তারতম্য থাকে তাহলে দেশে যে শোষণ ব্যবস্থা তৈরি হয়, দুর্নীতি তাতেই আরেকটি মাত্রা যোগ করে। সবাই সৎ হও, সুযোগসন্ধানী হয়ো না, আত্মস্বার্থের পোষকতা করো না, বিবেক ও কল্যাণবোধের আহ্বানে সাড়া দাও, যে যেখানে আছ নিজের অবস্থানে সৎ থাকো- এসব কথা দিন-রাত প্রচার করলেও দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ হবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহিষুষ্ণতার অঙ্গীকার রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনর্বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। বলা যায়, পূর্ববর্তী দুই সরকারের ধারাবাহিকতাই এ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠন করে এবার প্রথমেই যে ব্যাপারে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন তাহলো, দুর্নীতি নির্মূলে কোনোরকম অনুকম্পা নয়। অনিয়ম-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না বলে তিনি জানিয়েছেন। পুনর্বার তার এই অঙ্গীকার ও দৃঢ় অবস্থান ব্যাধিগ্রস্ত এ সমাজে আশার আলো দেখিয়েছে। তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

কিন্তু এর পাশাপাশি বিপরীত চিত্রও দেখা যাচ্ছে। সরকারপ্রধানের এমন কঠোর অবস্থানের পরও দুর্নীতির বহুবিধ চিত্র ওঠে আসছে। কয়েক দিন আগে কয়েকটি দৈনিকে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ওঠে এসেছে। পত্রিকাগুলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির যেসব চিত্র ওঠে এসেছে তাতে এই শঙ্কা থেকেই যায়-এ খাতের উন্নয়নে সরকারের এত চেষ্টা কীভাবে সফল হবে? কিংবা স্বাস্থ্যসেবার মান কাক্সিক্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাবে? বিগত এক দশকে দেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা অসত্য নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এ-ও ধারণা করা যায়, এ খাতে বরাদ্দ যত বেড়েছে দুর্নীতির ক্ষেত্রও যেন পাল্লা দিয়ে ততটাই বিস্তৃত হয়েছে। তবে আশার কথা এই, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সরকারের দায়িত্বশীল সংশ্নিষ্টরা এ ব্যাপারে কঠোর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কীভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে এবং এর ফলে জাতীয় সংস্থাটির পঙ্গুত্বের পথ কীভাবে প্রশস্ত হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলছে। গত সাড়ে তিন দশকে বিমান লাভের মুখ দেখেনি। বিমানের বহরে নতুন নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলেও আন্তর্জাতিক গন্তব্য বাড়ার বদলে ক্রমেই কমে এসেছে। এই পরিস্থিতির জন্য বিমানের ভেতরে জেঁকে বসে থাকা দুর্নীতিবাজদের কারসাজিকে দায়ী করা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে আটটি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ১১টিসহ মোট ১৯ ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক।

দুদকের দুটি বিশেষ দল বিমানের দুর্নীতি অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব পেয়েছে। আকাশে শান্তির নীড় গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বিমান। পৃথিবীকে ছোট করে আনার চেষ্টা চালাতে গিয়ে যেন ছোট হয়ে গেছে বিমানেরই পৃথিবী! লোকসানের বৃত্ত থেকে বিমান কেন বের হতে পারছে না- সাম্প্রতিক এই চিত্রই বিষয়টি বোঝার জন্য যথেষ্ট। বিশ্বের বিভিন্ন বিমান সংস্থা যেখানে রমরমা বাণিজ্য করছে, তখন আমাদের বিমান নুইয়ে পড়ছে। বিমানের দুর্নীতি নিয়ে অতীতেও অনেক কথা হয়েছে। এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিমানের দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক যে সুপারিশ করেছে, তা খতিয়ে দেখে বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভাগগুলোর। কিন্তু নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতির চিত্র ওঠে আসছে, এর উৎস চিহ্নিত করার পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত করা না গেলে সুফল মিলবে না।

আমাদের দেশে যে কোনো অঘটন ঘটলে খুব দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কোনো কোনো কমিটির প্রতিবেদন আলোতে আসে, কোনোটি চলে যায় হিমঘরে। আবার অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থাই নেওয়া হয় না। এমন নেতিবাচক দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। কোনো এক বিশেষ অসুখ সারাতে আলাদাভাবে তার চিকিৎসা করার চেয়ে পুরো শরীরটাকে সুস্থ রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে অসুখ আদৌ দেখা দিতে না পারে। অতীতে দেখা গেছে সর্বত্র দুর্নীতি, ঘুণে খাওয়া আসবাবের মতো গোটা দেশটাকে যেন ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। আমরা পরপর কয়েকবার বিশ্বে দুর্নীতিতে শীর্ষে ছিলাম। ওই অবস্থা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পেরেছি বটে; কিন্তু দুর্নীতি যে নির্মূল হয়নি এখনো, বিদ্যমান বাস্তবতা এরই সাক্ষ্যবহ। পরপর পাঁচবার নি¤œক্রম অনুসারে শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আমাদের যে বিশ্বখেতাব জুটেছিল, তা লজ্জার। তারপরও কোনো শিক্ষা কি আমরা নিতে পেরেছি? জোর করে কি বলতে পারি যে, আমাদের অবস্থান এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-ছায়াবৃত থাকবে ভবিষ্যতে? দুর্নীতিরোধ করা বলতে আমরা এক ধরনের ব্যারোমিটারের সাহায্য নিচ্ছি মাত্র। পারদ কখনো ওঠছে, কখনো নামছে। অনন্তকাল এই কর্ম করে গেলেও তাতে দুর্নীতি হ্রাস পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কাজের কাজটা করতে হবে এবং তা কী, সেটা দায়িত্বশীলরা নিশ্চয় ভালো করেই জানেন।

যে গণতন্ত্রে দেশে সিংহভাগ মানুষকে মানবেতর পর্যায়ে রেখে হাজার হাজার কোটিপতি পরিবার সৃষ্টি করা সম্ভব হয়, হাজার হাজার কোটি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করা ও বিদেশে পাচার করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া যায় কিংবা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে তার কোনো ব্যবহার না করে তাকে স্থির অথর্ব ও কালো টাকা হিসেবে জমায়েত করার সুযোগ করে দিতে পারে-সেই গণতন্ত্রকে কি গণতন্ত্র বলা যায়? যখন দুর্নীতির কথা ভাবছি, তখন আমাদের এ দেশের গোটা পরিপ্রেক্ষিত বিচার করে দেখতে হবে এবং উপস্থিত মতো প্রতিরোধসহ মৌলিক ও স্থায়ী প্রতিরোধ সৃষ্টি করার জন্য তৎপর হতে হবে। এই যে বিমান, স্বাস্থ্য খাত, ভূমি কিংবা আর্থিক খাতের বিশেষ করে ব্যাংকের দুর্নীতির চিত্র গণমাধ্যমে এরই মধ্যে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। এর প্রতিকারে যদি দ্রুত দৃষ্টান্তযোগ্য ব্যবস্থা না নিয়ে করি, করব, করছি ইত্যাদি শব্দের জটাজালে করণীয় বিষয়টি বন্দি থাকে, তাহলে আবারও গণমাধ্যমে এর চেয়ে আরো বিবর্ণ চিত্র ওঠে আসবে। সমাজে এর আরো বিরূপ প্রভাব প্রড়বে। মানুষের শুভ প্রত্যাশা মাঠে মারা যাবে। কাজেই কাজের কাজটা করতে হবে দ্রুত এবং তা করতে হবে রাষ্ট্রকেই। উল্লেখ্য, তরুণরাই যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, এই দেশ যে তাদেরই, তাদেরই রাষ্ট্র পরিচালনার হাল ধরতে হবে, এ কথা এতই সত্য যে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। যদি তাই হয়, তাহলে সর্বত্র দুর্নীতি ও দূষণের বীজ রেখে দিয়ে এই কীটদষ্ট বাংলাদেশ যদি তাদের হাতে দিয়ে যায়, তাহলে তারা কি আমাদের ক্ষমা করবে?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

 

"