পর্যালোচনা

শুভ বনাম অশুভ শক্তি

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

অলোক আচার্য

বাংলা নতুন বছর শুরু হয়েছে। নতুন করে সব কলুষতা, সব প্রতিহিংসা, ভুলত্রুটি, বিভেদ দূর করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের সামনে প্রতিবন্ধকতা যেমন আছে; তেমনি আছে বিপুল সম্ভাবনাও। সব প্রতিবন্ধকতাকে পায়ে ঠেলে আমরা এগিয়ে চলেছি। দেশ উন্নয়নের পথে ধাবমান। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছি। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে মাঝারি আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া আমাদের দেশ নতুন এক সাফল্য স্পর্শ করেছে। পাকিস্তানিদের শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। কিন্তু এত কিছুর ভেতরেও দেশ ক্রমোন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে। এ দেশের অর্থনীতি হবে একসময় এশিয়ান টাইগার। কিন্তু কিছু ঘটনা, কিছু সামাজিক ক্ষয়-অবক্ষয় আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি আমাদের পিছু ছাড়ছে না। আমরাই এসব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিচ্ছি। যারা এসব কর্মকান্ডে জড়িত তাদের ক্ষমতা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি। নিজেদের মননশীলতায় আমরা উন্নত হতে পারছি না। সেই আয়না বিবেকের। সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের চেহারা বেশ ভয়ংকর, কুৎসিত। দামি বেশভূষা পরা মানুষের আড়ালে মানুষের কদাকার রূপ হরহামেশাই বাইরে বেরিয়ে আসছে। পত্রিকার পাতায় সেসব মানুষের মুখ দেখে নিজেদের আতঙ্কিত হতে হয়। পহেলা বৈশাখের কয়েক দিন আগে অগ্নিদগ্ধ নুসরাত মারা গেছে।

নুসরাত যেখানে অগ্নিদগ্ধ হয়েছে সেটা ছিল তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেখানে তার নিরাপদে থাকার কথা ছিল। কিন্তু নুসরাত এড়াতে পারেনি সমাজের লুকিয়ে থাকা মানুষরূপী হায়েনাদের চোখ। এসব নিরাপদ স্থানেই আজকাল হায়েনাদের বসবাস। তাই তাকে মরতে হলো। কেবল নুসরাতের ভাগ্যেই এমনটা ঘটছে না। দেশে প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই পাতায় পাতায় ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনের খবর। শিশু, গৃহবধূ কেউ এই হিংস্রতা থেকে বাদ যাচ্ছে না। এত হায়েনায় ভরে গেছে দেশ! শকুন নামের পাখি আজ আর খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু মানুষরূপী শকুনের চোখ থেকে নুসরাতের মতো মেয়েরা বাঁচতে পারছে না। নতুন বছরের প্রথম দিনেও দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। নুসরাতের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের পক্ষেও যে মিছিল হয়, তাও আমাদের দেখতে হয়েছে। সেলুকাস! অনেকেই নুসরাতকে দোষী করার অপচেষ্টাও করেছে। সমাজ বহুমুখী শয়তানে ভরে গেছে। এসব বহুমুখী শয়তান সমাজের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুযোগ পেলেই ধারালো নখ দিয়ে আঁচড়ে দেয় সমাজটাকে। এ দলে যেমন আছে অশিক্ষিত, তেমনি লেবাসধারী শিক্ষিতরাও আছে। দুই ধরনের শয়তান মিলেমিশে দেশটাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ধিক্কার উঠছে তাদের ঘিরে, তবে সেসব নপুংসকের মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটানো যাচ্ছে না। তাদের কর্ণ কুহরে আমাদের ঘৃণার বাণী পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাদের মনে ঘৃণ্য দরজায় শুধু অন্ধকার। নপুংসকদের কামনার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে বিবেকপূর্ণ সমাজ। নিরাপদ করতে চেয়েও পারছি না। বাসযোগ্য করতে গিয়ে বারবার এসব বোধহীন, রুচিহীন মানুষ মুখোশ খুলে বেরিয়ে আসছে। মেয়েদের ওপর হিংস্রতা আরো বেড়ে গেছে।

আদিকাল থেকেই পৃথিবীতে দুই ধরনের শক্তি বিরাজমান। শুভ শক্তি এবং অশুভ শক্তি। শুভ শক্তির সঙ্গে অশুভ শক্তির দ্বন্দ্ব চিরকাল চলে এসেছে। অশুভ শক্তির অত্যাচারের মাত্রা যখনই বৃদ্ধি পেয়েছে তখনই কোনো না কোনো শুভ শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। বিনাশ হয়েছে অশুভ শক্তির। শুভ শক্তি সংখ্যায় কম হলেও শেষ পর্যন্ত তা বিজয়ী হয়েছে। এটাই বাস্তবতা। যখনই কোনো নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে এসে সমালোচনার ঝড় তুলেছে তখনই অন্যায়ের প্রতিবাদ হতে দেখেছি। রাস্তায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, পত্রিকার পাতায়, টিভি টকশোতে সব জায়গায় প্রতিবাদ দেখেছি। জেগে ওঠে শুভ শক্তি। তবে সেই জেগে ওঠার সময়টা খুব ক্ষণস্থায়ী। সমাজে আজ অশুভ শক্তির সংখ্যাধিক্য না থাকলেও প্রতিনিয়িতই এদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শুভ শক্তির পক্ষের মানুষরা আজ কোণঠাসা। মাঝে মধ্যে হঠাৎ জাগরণ ঘটলেও আবার কোনো কারণে তা চুপ হয়ে যায়। যখন প্রতিবাদের খুব প্রয়োজন, শুভ শক্তির একত্রিত হওয়া প্রয়োজন, তখন গণজাগরণ ঘটছে না। আমাদের চারপাশে প্রতিদিন অসংখ্য অন্যায় হয়ে চলেছে। আমরা কোনটারই প্রতিবাদ করতে পারছি না। কারণ শুভ শক্তির মানুষের ক্ষমতা আপাতদৃষ্টিতে কম। আমরা মাথা উঁচু করে বলতে পারছি না এটা অন্যায়। কারণ সমাজের গতিটাই উল্টোপথে চলেছে। উল্টোপথের উল্টোরথে চড়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমরাও সেই পথের যাত্রী হয়েছি। অথচ বাঙালির ইতিহাসে মাথা নোয়ানোর কোনো ইতিহাস নেই। দেশভাগের পর থেকে প্রতিটি ইতিহাসের সঙ্গে বাঙালির সাহসিকতা আর আত্মত্যাগের ইতিহাস রয়েছে। তারপর যখন এই দেশটা নিজের করে পেলাম, তখন নিজেদের ভালোর জন্য কেন আমরা সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারছি না, তা বোধগম্য নয়।

ইতিহাস সাক্ষী পৃথিবীতে যতবার অশুভ শক্তি মাথা তুলে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছে, যতবার অন্যায়ের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে; ততবার কোনো না কোনোভাবে শুভ শক্তির জাগরণ ঘটেছে। যতই অশুভ শক্তির উত্থান ঘটুক না কেন, এক দিন শুভ শক্তির জোয়ারে সব ধুয়ে-মুছে যাবে। এ সংখ্যা যত কমই হোক না কেন, তাতেই অশুভ শক্তির বিনাশ নিশ্চিত। কারণ ন্যায় আর অন্যায়ের ব্যবধান স্পষ্ট। ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে সবাই। শুভ শক্তি হাতে হাত মিলিয়ে প্রতিবাদ জানাবে। সব অনিয়ম আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদী হবে। আজ যেমন কোনো দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ভয় হয়, এক দিন আর সেই ভয় থাকবে না। এক দিন দুর্নীতিবাজরা হিংস্র শকুনের দল ভয় পাবে শুভ শক্তির জোয়ার দেখে। নুসরাতদের মতো কাউকে লালসার বলি হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে না। পত্রিকার পাতায় পাতায় নৃশংসতা আর খারাপ কোনো খবর প্রকাশিত হবে না। তার বদলে থাকবে সব ভালো খবর। শুভ শক্তির খবর। নতুন বছর থেকেই যেন সেই শুভ শক্তির জাগরণ ঘটে। শুভ শক্তির হাতে যে অশুভ শক্তির বিনাশের নিয়তি লেখা রয়েছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

 

"