মতামত

উন্নয়ন চাইলে নিয়মশৃঙ্খলা মানতেই হবে

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। এর মানে হচ্ছে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা করেছে; যার গন্তব্য হচ্ছে সবদিক থেকে উন্নতসমৃদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নীত হওয়া। এর আগে আমাদের অবস্থান ছিল দরিদ্র দেশের তালিকায়। সেই তালিকায় যারা অবস্থান করে তারা শুধু আর্থসামাজিক ক্ষেত্র নয়, শিক্ষা-দীক্ষা, সাংস্কৃতিক ও আইনকানুন, আচার-আচরণ এবং শৃঙ্খলায় এতটাই পিছিয়ে পড়ে আছে যে, সেখানে বেশির ভাগ মানুষের জীবনের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেওয়া মোটের ওপর অসম্ভব। আমাদের সমাজজীবনে দারিদ্র্য কতটা প্রকট ছিল তা আমরা এখনো ভুলে যায়নি, অন্যান্য ক্ষেত্রেও পশ্চাৎপদতা এবং অনুন্নয়ন কতটা বিস্তৃত ছিল তাও আমাদের ভুলে যাওয়ার মতো সময় এখনো হয়নি। আমাদের দু-তিন দশক আগেও মধ্যপ্রাচ্যে ‘মিসকিন’ বলে তিরস্কার করা হতো, একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে উপহাস করা হতো। দরিদ্র দেশের জন্য এমন অপমান মুখবুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় কী! সমাজেও ধনীরা গরিবদের এভাবেই অবহেলা করে। বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থায় গরিবরা এমন নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকে। বিশ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান ও বৈষম্য বিরাজ করছে। এর ভুক্তভোগী আমরাও একসময় হয়েছিলাম। তখন সাহায্য দাতা সংস্থা ও রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশকে ঋণ বা অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অবমাননাকর শর্তজুড়ে দিত। যা মানা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের পক্ষে খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু দেশের মানুষের স্বার্থে বা উন্নয়ন দ্বারা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সরকারকে ওইসব ঋণ গ্রহণ করতে হতো। এ ছাড়া সরকারের মধ্যেও বিশেষ সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ছিল, যারা বিদেশি অনুদানে নিজেদের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে তৎপর ছিল। এ ধরনের নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে চলতে হয়েছিল। তবে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল সময়ে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া বিদেশি ঋণ গ্রহণে অনেক বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই বাংলাদেশ ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়ানোর নীতি শুরু করে। ২০০৯-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণ গ্রহণে মোটেও মাথা নত না করার নীতি কার্যকর করেছে। বিশেষত পদ্মা সেতুর ঋণ গ্রহণ না করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান বিশ্বব্যাংককে পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের সরকারের সময় থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নের স্বাধীন ধারায় নিজেকে যুক্ত করে; দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বর্তমান মেয়াদে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাই বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিতে বসেছে। দেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে। অচিরেই এধারা বেগবান হলে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধিশালী দেশে পরিণত হবে; এটি এখন বাংলাদেশের সম্মুখে লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে স্থির হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছেÑ উন্নয়নের এই মহাসড়কে গতিপথ যথাযথ ধারায় ঠিক রাখতে হলে মহাসড়কের নিয়মকানুন মেনেই বাংলাদেশকে চলতে হবে; এর কোনো ব্যত্যয় ঘটলে দুর্ঘটনা ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। এখন কথা হচ্ছে, উন্নয়ন মহাসড়কের নিয়মকানুন, বিধিবিধান মেনে চলা বলতে আমরা কী বুঝব? মনে রাখতে হবে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে শুধু অর্থনৈতিকভাবে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশই বোঝায় না, মানুষের জীবনযাপন, সুখ-সমৃদ্ধি, মানবাধিকার ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় আইন, নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলায় পরিচালিত হয়ে থাকে।

অনুন্নত সমাজ ও রাষ্ট্রে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অনেক কিছুরই চরম অভাব ও ঘাটতি ছিল। এর মধ্যে আইনকানুন, বিধিবিধান ইত্যাদি বলতে গেলে ছিলই না। সে কারণেই সেসব সমাজ ও রাষ্ট্রে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে সম্পদ নিয়ে কাড়াকাড়ি, দখল-বেদখল, শোষণ-নির্যাতন ইত্যাদি ব্যাপকভাবে বিরাজ করত বা করছে। মানুষের প্রতিকার চাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না বা নেই। প্রাচীন যুগে যেসব সভ্যতা ছিল তার সবকটিতেই রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব আমরা দেখেছি। সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার কথা ভাবতে পারত না, দাস হিসেবে প্রভু বা মালিকের নির্দেশমতো কাজ করতে বাধ্য ছিল। এর কোনো প্রতিবাদ করা চলত না। যারা করত তাদের দাস মালিক হত্যাও করতে পারত। এমন অবস্থাকে ধরে রাখার জন্যই প্রাচীন যুগে কিছু কিছু আইন হয়েছিল। যেমনÑ আক্কাদ নগররাষ্ট্রের রাজা ডুঙ্গির হাতে ‘চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক’ এ ধরনের আইনের প্রচলন ঘটেছিল। এরপর পুরোনো ব্যাবিলনের সম্রাট হামুরাব্বির হাতে তৈরি হয় বিশাল কোড, যেখান থেকে পরবর্তী সময়ে আইনের পরিবর্তন ঘটতে ঘটতে একসময় রোমান আইন প্রবর্তিত হয়। এটি আধুনিক যুগের বেশ আগে হলেও মানুষের কিছু অধিকারের আইনের ধারণা এতে লুকায়িত ছিল। ১৫০০ শতকের পর জ্ঞান-বিজ্ঞান, আবিষ্কার ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ইউরোপ আধুনিক তথা নিয়মকানুনের রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। সেখান থেকেই আধুনিক যুগের আর্থসামাজিক, রাষ্ট্র রাজনৈতিক, শিক্ষা সাংস্কৃতিক, জীবন দর্শন, শিল্পকলা ইত্যাদির নতুন রূপান্তর ঘটে। বর্তমানে পশ্চিমা দুনিয়া সেই নিয়মকানুনের সমাজ ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে গর্ব করছে। অন্যান্য দুনিয়া পাশ্চাত্যের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কমবেশি অনুসরণ করছে কিংবা এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।

এখন আমরা যারা উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের কথা বলছি বা স্বপ্ন দেখছি, আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অবশ্যই আইন, নিয়মশৃঙ্খলা ইত্যাদিতে রাষ্ট্র ও সমাজকে পরিচালিত করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। তবে আমাদের জন্য মস্তবড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের ইতোপূর্বেকার আর্থসামাজিক ব্যবস্থা যেভাবে চলেছে তাতে নিয়মশৃঙ্খলার অভাব সর্বত্রই ছিল। দুর্নীতি, আইন না মানার সংস্কৃতি, ধনী হওয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা ইত্যাদিতে আমাদের উঠতি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত অনেক বেশি বেপরোয়া ছিল। তা ছাড়া সমাজে শ্রেণিবৈষম্য ব্যাপক পরিমাণে থাকায় উঠতি মধ্যবিত্ত-উত্তর শ্রেণিগুলো অনেক বেশি নিয়মকানুন ভঙ্গ করে নিজেদের পেশা, বাসস্থান, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিকে পরিচালিত করেছে। আবার সরকারগুলো সুবিধাবাদী উঠতি শ্রেণির পক্ষে থাকায় নিয়মকানুন ও আইনের প্রয়োগ সমাজে খুব একটা ঘটেনি। ফলে যেখানে যা কিছু অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার সমর্থনে চলেছে সেখানে আইন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা হয়নি। এর ফলে আমাদের নগরজীবন বাহ্যিকভাবে হু হু করে বেড়ে উঠলেও এর ভেতরে ছিল নিয়ম, আইন ও বিধিবিধান ভঙ্গ করার ব্যাপক উদাহরণ। সম্প্রতি আমাদের দেশে অবৈধ স্থাপনা ভাঙার যে অভিযান শুরু হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সরকারি জমি, নদী, জলাশয় ইত্যাদি দখল করে অসংখ্য প্রভাবশালী ব্যক্তি নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ভূমিদস্যু বলে একটি কথা বেশ প্রচলিত আছে। এমন অপকর্মের সঙ্গে অনেক ধনী ব্যক্তি জড়িত আছেন। শুধু তাই নয়, সরকার ও প্রশাসনের বহু হর্তাকর্তা এসব দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ঢাকা শহরের সর্বত্র বাড়িঘর ইত্যাদি নির্মাণে রাজউকের বিধিবিধান প্রায় শতভাগই লঙ্ঘিত হয়েছে বলে সবাই স্বীকার করছেন। কিন্তু এ নিয়ম ভঙ্গের মধ্যে শুধু মালিক পক্ষই নয়, রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ভূমিকা রয়েছে। আবার আবাসিক এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কল-কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল সব একাকার হয়ে আছে। এখানে যে মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে, সে কথা মালিকপক্ষ, ভাড়াটেÑ কোনো পক্ষই তোয়াক্কা করছে না। এর ফল যা হওয়ার তাই ঘটছে। আগুন লাগছে, নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে দেশের পরিবহন খাতে চলছে চরম অরাজকতা, নৈরাজ্য ও দুর্ঘটনার নানা দাবিয়ে বেড়ানো অশক্তির অবস্থান। কেউই যেন কিছুই মানছেন না। যার গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা নেই, সেও গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে থাকে। মালিক যেনেও না জানার ভান করে থাকেন। যাত্রীরা নিরুপায়, পথচারীরা রাস্তার নিয়ম ভঙ্গ করে চলেন। শিক্ষা খাতে চলছে শিক্ষাবহির্ভূত নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অশিক্ষা, অন্ধত্ব ও বিজ্ঞানবিরোধী নানা ধারণা ও বিশ্বাসের চর্চা। মানুষের মধ্যে সুস্থ ও স্বাভাবিক চিন্তার বিকাশ খুব কমই ঘটার সুযোগ রয়েছে। দেশের রাজনীতিতে দেশপ্রেমের বড়ই অভাব। সেখানে চলছে শক্তির মহড়া, ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের হীন প্রচেষ্টা। দুর্নীতি ও অর্থ সঞ্চয়ের নানা উপায়। প্রশাসনেও কমবেশি এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

এসব অনিয়মের মূলভিত্তি হচ্ছে আমাদের পূর্ববর্তী আর্থসামাজিক ব্যবস্থার দুর্বলতা। রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগই আধুনিক চিন্তাধারা থেকে অনেক দূরের মানুষ ছিলেন। দেশকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের নিয়মকানুন, আইন ও শৃঙ্খলায় মানুষকে গড়ে তোলতে হয়, তার ধারেকাছেও তারা ছিলেন না। ফলে বাংলাদেশে সুশাসনের ব্যাপক অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে যে মধ্যবিত্ত, উচ্চ ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে বা যে শিক্ষিত মানবগোষ্ঠী এ দেশে গড়ে উঠেছে, তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যুগের ধ্যান-ধারণার সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নন। কিংবা আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতা দিয়ে জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হবেÑ এমন দৃষ্টিভঙ্গি খুব কম মানুষের মধ্যেই গড়ে উঠেছে। সে কারণে চারদিকের বর্তমান অনিয়ম, নীতিহীনতা, দ্বিচারিতা, দুর্নীতিপরায়ণতা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি প্রকট হতে দেখা যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, এসব অনুষঙ্গ দিয়ে শুধু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, নিজেদের টিকে থাকার বাস্তবতা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যেতে বাধ্য হবে। এর বেশ কিছু লক্ষণ আমরা এখন দেখতে শুরু করেছি। তবে আশার কথা হলো, এসব অনিয়ম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য জীবনকে টিকিয়ে রাখা, পরবর্তী প্রজন্মকে নিরাপদ জীবন দেওয়া, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নীত হওয়ার তথ্যপ্রযুক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আইন, বিধিবিধানের প্রয়োগ ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা অনেকেই এখন উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। বলছেন বেঁচে থাকার জন্যই তো সম্পদ আর সেই সম্পদ হতে হবে বৈধ, আইনসম্মতভাবে। তা হলেই জীবন হবে নিরাপদ। রাষ্ট্র হবে আধুনিক। বাংলাদেশকে আধুনিক রাষ্ট্রের আধুনিক নিয়মকানুন, বিধিবিধানে চলতেই হবে। মানুষকে তেমন শৃঙ্খলায় জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতেই হবে।

লেখক : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত)

ইতিহাসবিদ ও কলামিস্ট

 

"