মতামত

নিরাপদ পানি না বিলাসী পণ্য

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

পৃথিবীতে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জীবনধারণের জন্য যে কটি জিনিস (পানি, বায়ুসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান) ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয় তার মধ্যে অন্যতম পানি ও বায়ু মহান সৃষ্টিকর্তা বিনামূল্যে দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মানবসৃষ্ট কর্মকান্ডেই পানি ও বায়ু দূষিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বিশ^ব্যাপী পানি নিয়ে ব্যবসা চলছে! নিরাপদ পানি আজ বহুজাতিক কোম্পানির বোতলে বোতলে বন্দি! এক তথ্যমতে, পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগ লোক নিরাপদ পানি পান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সারা পৃথিবীতে দরিদ্র মানুষরাই সবচেয়ে বেশি পানিদূষণের শিকার হচ্ছে। সারা পৃথিবীতে পানির ভিত্তি ও উৎসগুলো ধ্বংস ও দূষিত করা হচ্ছে। প্রাণ-প্রকৃতি-পানির মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যেখানে গাছপালা ও প্রকৃতির আধার ধীরে ধীরে কমতে থাকে সেখানে পানির উৎসও ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিশ^ব্যাপী। একদিকে দুর্যোগ, অন্যদিকে খরার কারণে পুরো পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে হিমালয় অঞ্চলে (৪২ লাখ বর্গকিলোমিটার) তীব্র পানি সংকট দেখা দিচ্ছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলোর ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশ হিমালয়কেন্দ্রিক ৮টি দেশের অন্তর্ভুক্ত। মূলত বরফ ও হিমালয়নির্ভর পানির এই দুই উৎস জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে পানির ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ উৎসগুলোর প্রতি চাপ বাড়ছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, হিমালয়ের এ অঞ্চলগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কোটি কোটি মানুষ গভীর পানি সংকটে পড়বে।

আয়তনের দিক দিয়ে বিশে^র ছোট দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা বিরাট চ্যালেঞ্জ বটে! পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো দিন দিন নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। নদ-নদীগুলো ব্যাপক মাত্রায় দূষিত হয়ে পড়েছে। অনেক নদ-নদী মরে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। খাল-বিল-জলাশয়গুলো দিন দিন ভরাট করা হয়েছে। ফলে শহরবাসীর পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যাপক চাপ পড়েছে ভূগর্ভস্থ উৎসের প্রতি। এখন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর থেকেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির স্তর অনেক নিচে চলে গেছে। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রতি বছর পানির স্তর একটু একটু করে নিচে চলে যাচ্ছে। তথ্যমতে, ঢাকা শহরে পানির স্তর প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ ফুট নিচে চলে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের অবস্থা আরো ভয়াবহ। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রামে পানির স্তর ৭০-৮০ ফুট নিচে নেমে গেছে। ঢাকা শহরে পানির চাহিদার শতকরা ৭৬ ভাগ আসে ভূগর্ভস্থ পানির উৎস থেকে আর বাকি ২৪ ভাগ আসে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস থেকে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এমন একটা সময় আসবে, যে সময় পানির স্তর কমতে কমতে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে পানি পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তাই জোর দিতে হবে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসগুলোর প্রতি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, নদ-নদীর দূষণমাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করার ফলে পানি পরিশোধন করাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিবেশ অধিদফতরের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, দেশের ২৯ নদ-নদীর দূষণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এসব নদ-নদীতে ক্রোমিয়াম, আয়রন ও জিংকের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব নদ-নদীতে ভারী ধাতু মানমাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। মূলত নদ-নদী দূষণের কারণ হলোÑ শিল্প-কারখানার বর্জ্য, কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহৃত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং ঘরবাড়ির ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলা ইত্যাদি। ঢাকার আশপাশের পাঁচ নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু, ধলেশ^রী নদীর দূষণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব নদ-নদীকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে না পারলে নগরবাসীর নিরাপদ পানি প্রাপ্তি গভীর সংকটের সম্মুখীন হবে। সম্প্রতি বিশ^ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ অপরিচ্ছন্ন এবং অনিরাপদ উৎসের পানি পান করছে! আর পানির নিরাপদ উৎসগুলোর ৪১ শতাংশই ক্ষতিকারক ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াযুক্ত। আবার বাসাবাড়িতে পাইপের মাধ্যমে সংগ্রহ করা পানিতে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি আরো বেশি। এ ছাড়া দেশের পানীয়জলের নিরাপদ উৎসগুলোতে ব্যাকটেরিয়া ও আর্সেনিকের ভয়ংকর মাত্রায় উপস্থিতি রয়েছে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের লাখ লাখ মানুষের নিরাপদ পানি প্রাপ্তি রীতিমতো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন! পানের উপযোগী এক ফোঁটা পানির জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় হাহাকার চলছে! চারদিকে পানি আর পানি। কিন্তু সবটাই লবণপানি। সেখানে অনেক কষ্ট করে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে নিরাপদ পানি সংগ্রহে নামতে হচ্ছে। উপকূলীয় জেলাগুলোর টিউবওয়েলের পানিও মাত্রাতিরিক্ত লবণ ও আয়রণযুক্ত। উপকূলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীরাই নিরাপদ পানি সংকটে পড়ছে বেশি। পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দূষিত হলে তার প্রভাব পড়ে সবখানে। একটি দূষণের প্রভাব আর একটি দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, জলাশয়গুলো দূষণ ও দখলের হাত থেকে নিরাপদ রাখা যেত, তা হলে দরিদ্র মানুষকে পানির জন্য এত কষ্ট করতে হতো না। পানির স্তর ধীরে ধীরে নিচে চলে যাচ্ছে, ফলে পানির উপরিভাগের উৎস নিরাপদ রাখা ছাড়া এখন আর বিকল্প পথ খোলা নেই। তাই দেশের প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি নদ-নদী, খাল-বিলসহ সব ধরনের জলাশয় দখল-দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। ভরাট হয়ে যাওয়া নদী-খালগুলো পুনঃখনন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নদীতে বর্জ্য ফেলা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। নতুন-পুরোনো সব শিল্প-কারখানায় ইপিটি (বর্জ্য শোধনাগার) স্থাপন ও তা চালু রাখতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করতে হবে।

নিরাপদ পানি-পয়ঃনিষ্কাশন-পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে পরিবেশ ও নিরাপদ স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে। নিম্নমানের পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পানিকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে ভাবলে চলবে না, জীবন্তসত্তা হিসেবে ভাবতে হবে। নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে শহরগুলোর প্রতিটি ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে না পারলে প্রতিটি শিশুর উন্নত ভবিষ্যৎ এবং দেশের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরাপদ পানির বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"