পর্যালোচনা

কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ড. মো. মিজানুর রহমান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বুলেটের আঘাতে সে স্বপ্ন স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ ভাবেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে জাতির জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করেন অর্থাৎ ভিশন-২০২১ ঘোষণা করেন। ভিশন-২০২১ কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়, বরং তার এক সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা। যার মূল দর্শন হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের দক্ষতা বাড়িয়ে দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। এভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বিশ্বের কাতারে স্থান করে নেওয়া।

বঙ্গবন্ধু কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ‘কুদরত-ই-খুদা’ শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। ১৯৭৫-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও তারপর গঠিত কোনো শিক্ষা কমিশনই আলোর মুখ দেখেনি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ ও খড়সা শিক্ষা আইন-২০১৬ প্রণয়ন করেন। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, যে দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যত বেশি; সেদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় তত বেশি। পাশের ছক থেকে যা সহজেই বোঝা যাচ্ছে।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স : বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি বৈদেশিক কর্মবাজারে কর্মরত আছেন; যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ, যারা প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ২০১৮ সালে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে। যা জিডিপির ১১ শতাংশর বেশি। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের অর্ধেকের বেশি অদক্ষ। ইন্ডিয়া-শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ করা গেলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেত কয়েকগুণ বেশি। তাই ভবিষ্যতে যত লোক বিদেশে কর্মবাজারে প্রবেশ করবেন তাদের কারিগরি বৃত্তিমূলক শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রেরণ করা গেলে রেমিট্যান্স বাড়ার পাশাপাশি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।

তাই তিনি এ দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করার লক্ষ্যে ২০২১ সালের আগেই কারিগরি শিক্ষার হার ২০ শতাংশ করার এবং ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালে ৪০ শতাংশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ (National Skill development policy 2011) প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই নীতিসমূহ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন পরিষদ (NSDC) সচিবালয় ছিল। বর্তমানে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। ওই কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বর্ডির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী। NSDC সচিবালয় কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নকল্পে পাঁচটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে।

১)  Policy and project Formulation Taskforce

২) Industry and Institute linkage Taskforce

৩) TVET Enrollment Taskforce

৪) Curiculum development Taskforce

৫)  Job Market Assesment and Employment Taskforce.

Enrollment বৃদ্ধির জন্য Field Level-এ ব্যবস্থা গ্রহণ ও সুপারিশ প্রেরণের জন্য সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। দেশে ২৩টি নতুন পলিটেকনিক, উপজেলা লেভেলে ১০০টি টিএসসি নির্মাণ করা হচ্ছে। SDG-4.3.৩ এর Terget আছে By 2030, ensure equal access for all women and men to affordable and quality Technical, Vocational and Tertiarty Education, including University. মহিলাদের জন্য বিভাগীয় শহরে মহিলা পলিটেকনিক এবং টিএসসি নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু তার পরও Target fullfill হবে না। তাই আরো কী কী পন্থায় এনরোলমেন্ট বৃদ্ধি করা যায়, তা খুঁঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে সুধী সমাজের মতামত বা পরামর্শ আবশ্যক।

আমি মনে করি, নিম্নবর্ণিত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে Enrollment বৃদ্ধি করা

যেতে পারে :

সরকারি/বেসরকারি TVET  ইনস্টিটিউটসমূহের অবকাঠামো এবং জনবল বৃদ্ধি করে।

প্রতিটি মাদরাসায় একটি করে ওয়ার্কশপ নির্মাণের মাধ্যমে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের যেকোনো একটি বিষয় কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান নিশ্চিত করে।

জেনারেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের Skill Traning দানের জন্য TVET Institute এ সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে পার্টটাইম/খন্ডকালীনভাবে ইন্ডাস্ট্রি থেকে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল বা কলেজকে কারিগরি কলেজে রূপান্তর করে কারিগরি শিক্ষার এনরোলমেন্ট বৃদ্ধি করা যেতে পারে। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি ওয়ার্কশপ নির্মাণ করে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি বিষয়ে Skill Traning গ্রহণের মাধ্যমে অধিক হারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে TVET Graduate কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হলে শিক্ষার্থীরা TVET এ ভর্তি হতে আগ্রহী হবে।TVET-এর গুরুত্ব তুলে ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশের আয়োজন করা।

লেখক : অধ্যক্ষ

গোপালগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ

"