মতামত

‘লার্নিং বাই ডুয়িং’ মূলনীতির ভিত্তিতে পাঠক্রম

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম এ হামিদ

শিক্ষা সাংবিধানিক অন্যতম মৌলিক অধিকার হলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন সুবিন্যাসিত না হওয়ায় নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে চলছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার এ নানামুখী চাপ সবচেয়ে পড়ে প্রাথমিক স্তরের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর। মাত্রাতিরিক্ত বই ও পড়াশোনার চাপে তারা ন্যুব্জ প্রায়।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা যখন এমন লক্ষ্যহীন অভিযাত্রায় একই ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত, তখন ১৩ মার্চ ২০১৯ ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোনামণিদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে মাত্রাতিরিক্ত বই ও পড়াশোনার চাপ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। যার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর মমতাময়ী জননীর মাতৃৃদর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। সরকারপ্রধান হিসেবে তার এ উপলব্ধি ও অভিব্যক্তিতে সমগ্র জাতি আবেগে আপ্লুত। প্রধানমন্ত্রীর এ গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে নতুন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পাইলট প্রকল্পের নামে সংশ্লিষ্টদের কালবিলম্ব করার সুযোগ দেওয়া বাঞ্ছনীয় হবে না। দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতার আলোকে ও প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা যথার্থ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে, জাতি আবার পিছিয়ে পড়বে। কেননা, প্রাথমিক শিক্ষাই জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মূলভিত্তি। প্রসঙ্গত, ১৯৫২, ৬৬, ৬৯ ও ৭১ সালে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বল্পকালীন শাসনামলে দেশব্যাপী একক জাতিসত্তায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু যথাযথ নেতৃত্ব ও স্কুল-কলেজে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসংবলিত কারিকুলামের অনুপস্থিতি ও শিক্ষাদান অব্যাহত না থাকায় বিগত বছরগুলোতে জাতি বারবার বিভ্রান্তির পথে ধাবিত হয়েছে। ফলে দিকভ্রান্ত জাতি অব্যাহতভাবে একই ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত হয়েছে এবং তৎপ্রেক্ষিতে একক জাতিসত্তার সুদৃঢ় ঐক্য দানা বাঁধাতে পারেনি। এমনি পরিস্থিতিতে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একক জাতিসত্তায় গড়ে তোলার লক্ষ্যে অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে (কিন্ডারগার্টেন, মাদরাসা ইত্যাদিসহ) আমাদের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসংবলিত অডিও-ভিডিও শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। দেশের সমগ্র প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের মূল দর্শন হবে ‘লার্নিং বাই ডুয়িং’। এ দর্শনের ভিত্তিতে ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা পাঠ্যক্রম ঢেলে সাজাতে হবে। এতে বই ও পড়াশোনার চাপ যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে পড়াশোনা ভীতি দূর হয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত আনন্দদায়ক হবে।

খেলার ছলে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা গেলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও কর্মে মনোযোগী হবে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সব কাজ ও শিক্ষাকে উপভোগ্য হিসেবে গ্রহণ করবে এবং কাজ ও কাজের মানুষের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধের জন্ম নেবে; যা পর্যায়ক্রমে কাজ ও কাজের মানুষকে ঘৃণা বা অবজ্ঞা করার সংস্কৃতি থেকে ছেলেমেয়েদের বাইরে আনা সম্ভব হবে এবং জীবনের বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে কাজকে সম্মান করে কাজে আগ্রহী হবে। যার মধ্য দিয়ে দেশে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। বৃদ্ধি পাবে জাতীয় উৎপাদনশীলতা। ছোট ছোট শিক্ষার্থী ঘুম থেকে ওঠা ও ঘুমানো পর্যন্ত প্রতিদিন যেসব সমস্যা অতিক্রম করে; সেসব সমস্যা সমাধানের পদ্ধতিতে সৃজনশীল চিন্তায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে এবং জীবনব্যাপী নিজ নিজ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী ও প্রযুক্তি ব্যবহার শিখবে এবং পর্যায়ক্রমে কারিগরি শিক্ষায় সুদক্ষতা অর্জন করবে। ফলে সমগ্র জাতির মধ্যে এক সময়ে দক্ষতা সংস্কৃতি গড়ে উঠবে; যার মধ্য দিয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ তথা দক্ষ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত হবে। এর ফলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (ওজ ৪.০) চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের সম্ভাবনার বিশাল জনরাশিকে জনসম্পদে পরিণত করার ভিত্তি রচিত হবে। আমাদের জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমে সর্ব ক্ষেত্রে (প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা) শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রবর্তন ব্যতীত কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা ও দক্ষতা একটি অপরটির পরিপূরক। একটি ব্যতীত অন্যটি পঙ্গু বিধায় কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না।

প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে ‘লার্নিং বাই ডুয়িং’ পদ্ধতি প্রবর্তনে এ মুহূর্তেই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে না। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিম্নোক্ত কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের মূলভিত্তি বিবেচনাপূর্বক মূল স্রোতধারার শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ লার্নিং বাই ডুয়িং পদ্ধতিতে কারিকুলাম প্রণয়নে যথার্থ নির্দেশনা প্রদান। ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাসের উপযোগী কী ধরনের ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের জন্য যথাযথ ইকুইপমেন্ট এবং প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি ও সহজ ব্যবহার বিষয়ে মডিউল তৈরি ও বাস্তবায়ন করা। তাতে ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যতে কারিগরি শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠবে। ফলে উন্নত দেশের ন্যায় সরকার ঘোষিত ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ ভাগ কারিগরি শিক্ষা প্রবর্তন করা সম্ভব হবে। ‘লার্নিং বাই ডুয়িং’ শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে কারিগরি শিক্ষক তথা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী সময় পর্যায়ক্রমে শিল্পী, ফিজিক্যাল, নৃত্য, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ক শিক্ষকসহ সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে কী কী ধরনের শিক্ষক প্রয়োজন তার ভিত্তিতে শিক্ষক কাঠামো তৈরি করা। দেশের সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা ও শহীদ দিবস উদযাপন, জাতির পিতার সংগ্রামী জীবনের ওপর অডিও-ভিডিওভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রবর্তনসহ দৈনিক ক্লাস শুরুর প্রাক্কালে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং ২-৩ বাক্যের একটি শপথনামা পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে জাতীয় উন্নয়ন কার্যক্রম বেগবান হওয়ায় বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী। মধ্যম, উচ্চ মধ্যম, উন্নত এবং সর্বোপরি বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে ব্যাপক জনরাশিকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পরিণত করতে হবে মানবসম্পদে। বিষয়টি উপলব্ধি করে প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক স্তরের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের

পাঠদানে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার যথার্থ বাস্তবায়নার্থে বর্ণিত সুপারিশগুলো সরকার ও সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

লেখক : সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, আইডিইবি

"