নববর্ষ

আত্মপ্রত্যয়ের উৎসব বাঙালির

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, বিপ্লব-বেঁচে থাকা, লোকজ সংস্কৃতি, কুটির শিল্প ও সংগ্রামের শিকড় সম্পর্ক। আমাদের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে পাকিস্তান আমলে। আঘাত এসেছে বাংলাদেশ আমলেও। ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ধর্মের নামে ভিনদেশি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার। বাঙালি বীরের জাতি, সেটা মেনে নেয়নি। বাংলা নববর্ষে আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ারে সেই ঘৃণ্য অপচেষ্টা ভেসে গেছে কচুরিপানার মতো। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বাংলা নববর্ষ অনুঘটকের মতো কাজ করেছে। জুগিয়েছে সামনে চলার অনন্ত প্রেরণা। তাই প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ প্রবল শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের সংকল্প নিয়ে হাজির হয় বাংলাদেশে। বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার চিরন্তন শিখা বাংলা নববর্ষ।

বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে বাংলা নববর্ষের রয়েছে নাড়ির সম্পর্ক। তাই নববর্ষে যাত্রাগান, পালাগান, বাউলগান, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, হালখাতা, লোকসংগীত, খেলাধুলা ও গ্রামীণ মেলা যেমনি প্রাণ ফিরে পায়, তেমনি উজ্জীবিত হয়ে উঠে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বৈশাখ উপলক্ষে এরই মধ্যে বিভিন্ন আউটলেট, ফ্যাশন হাউস ও শপিং মলে বিশেষ ছাড়ের অফার দিয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ ২৫০টির বেশি ব্র্যান্ডের পণ্যে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক অফার ঘোষণা করেছে। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের মাথাপিছু আয় ও ক্রয়ক্ষমতা। উৎসবের বাড়তি খরচের সঙ্গে ক্ষয়ক্ষমতার একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। জানা যায়, এবারের নববর্ষকে কেন্দ্র করে সারা দেশে কমবেশি ৩০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। নববর্ষ উপলক্ষে বর্তমান সরকার প্রবর্তিত ২০ ভাগ বৈশাখী ভাতা বাঙালির প্রাণের অনুষ্ঠানকে করেছে আরো উৎসবমুখর। এ বছর সরকার দেশের সব জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে র‌্যালি বের করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

প্রতিবারের ন্যায় এবারও বাংলা বর্ষবরণের জোর প্রস্তুতি চলছে রমনার বটমূলে। ছায়ানট এবার পালন করতে যাচ্ছে ৫২তম বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। রোববার ভোরে গানের সুরে সুরে নতুন বছরের প্রথম দিনটিকে সম্ভাষণ জানানো হবে। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত বাঙালি চেতনার এ গানের সঙ্গে চির নতুনের ডাকে পহেলা বৈশাখের ভোরে জেগে উঠবে রাজধানী ঢাকা। জেগে উঠবে নগর-বন্দর-গ্রামগঞ্জের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। রমনার বটমূলে ছায়াটনের বর্ষবরণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রার পাশাপাশি রাজপথে নেমে আসবে লাখো মানুষের ঢল। আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়বে গ্রাম থেকে নগরে ও শহর থেকে বন্দরে।

নববর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে বিশিষ্ট বরীন্দ্রসংগীতশিল্পী ও ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সভাপতি সনজীদা খাতুনের বক্তব্য হলো, ১৯৬৭ সালে সেই পরাধীনতার আমল থেকে নববর্ষের আবহনী করে আসছি। তখন প্রাণে স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। সেই উচ্ছ্বাসে ২০০১ সালে আঘাত আসে। বোমা হামলা হয়। এরপর ছায়ানট নিরাপত্তাবেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এ হিংসাত্মক আচরণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণ নয়। এ হিংসা অশিক্ষা থেকে এসেছে। মুখস্থ করে খাতায় উগরে দিলে তা শিক্ষা হয় না। সত্যিকারের শিক্ষার জন্য সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ অপরিহার্য। এ পথেই উদ্ধার সম্ভব। শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ না ঘটলে এ দেশ থেকে অজ্ঞ ও অজ্ঞতা দূর হবে না। অন্তর থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর হলেই আমরা মানুষ হতে পারব। হতে পারব সম্পূর্ণ বাঙালি।

পহেলা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সব কিছুকে ছাপিয়ে প্রেরণার সন্ধান করা হবে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ উদযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রার দায়িত্বে রয়েছেন চারুকলা অনুষদের ২১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে আছেন বর্তমান শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক ও চারুশিল্পীরাও। গত ১৯ মার্চ ছবি এঁকে এ প্রস্তুতি কাজের উদ্বোধন করেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ৪৮ নম্বর কবিতার ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আলোকে’ বাণীকে শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশ অনেক দিক দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। তার পরও নানা ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। সেজন্য এবারের শোভাযাত্রায় অনুপ্রেরণার উৎসবের সন্ধান করা হবে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাজানো হবে ১০টি তাৎপর্যপূর্ণ শিল্প কাঠামো দিয়ে। এর মধ্যে থাকবে ঘোড়া, পাখি, উল্টো, কলস। সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাঠামো হিসেবে থাকবে বাঘ ও বকের শিল্প কাঠামো। বাঘ ও বকের রূপকথা অবলম্বনে এ শিল্প কাঠামোটি তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের সাধারণকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির বিষয়টি সবার ওপরে তুলে ধরা হবে।

পহেলা বৈশাখে সকাল ৯টার পর বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বিভিন্ন লোকজ কাঠামো নিয়ে এ শোভাযাত্রা চারুকলার সামনে থেকে এসে বের হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল চত্বর ঘুরে চারুকলার সামনে এসে শেষ হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রা উদ্বোধন করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। শুরুর বছরেই তা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওই শোভাযাত্রায় ছিল পুতুল, ঘোড়া ও হাতির শিল্প কাঠামো। এরপর এটা বাংলা নববর্ষের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এ আনন্দ শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম ধারণ করে। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনিসেফের বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ স্বীকৃতি বাঙালি হিসেবে বিশ্বের দরবারে আমাদের মর্যাদাকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ ও শহর-বন্দরে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলা যেন পহেলা বৈশাখের প্রাণ, অন্তহীন আনন্দের উৎস। মেলায় বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। কুটির শিল্পজাত পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। মেলায় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, সানকি, ফুলদানি, নানা রকমের শোপিস, খেলনা, মাটির গহনা, ঘর সাজানোর সামগ্রীসহ কত কিছু পাওয়া যায়। কাচের চুড়ি, কানের দুল, আংটি, ক্লিপ, পুঁতির মালা, বাঁশের বাঁশিÑ এসব ছাড়া তো মেলার কথা ভাবাই যায় না। মেলা মানে বাঁশি বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফেরা। মেলা মানে বেলুন উড়াতে উড়াতে ঘরে ফেরা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠী নানা আয়োজন ও অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী নববর্ষ উদযাপন করে। চৈত্রের ৩০ ও ৩১ তারিখ এবং নববর্ষের প্রথম দিনে এ উৎসব পালন করা হয়। ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমাদের নববর্ষের অনুষ্ঠানকে একত্রে বলা হয় বৈসাবি। এ সময় পুরো পার্বত্য অঞ্চল থাকে উৎসবমুখর। চাকমারা বৈসাবির প্রথম দিনে ভোরে নদীতে ফুল ও প্রদীপ ভাসিয়ে উৎসবের সূচনা করে। পরদিন মূল বিজুর দিনে ছোট ছোট ছেলেমেয়েসহ সবাই ভোরে নদীতে স্নান করে নতুন জামাকাপড় পরে। নতুন বছরের প্রথম দিন সবার বাড়িতে ৩০ থেকে ৪০ প্রকার সবজি ও শুঁটকি দিয়ে পাজন নামের এক প্রকার নিরামিশ রান্না করা হয়। চাকমাদের ধারণা, সাত বাড়ির পাজন খেলে বছরটি ভালোভাবে কাটে। মারমাদের নববর্ষের অনুষ্ঠানকে বলা হয় সাংগ্রাই। তারাও চৈত্রের শেষ দুই দিন ও পহেলা বৈশাখ এ তিন দিনব্যাপী নববর্ষ পালন করে। এদের উৎসবের আকর্ষণীয় দিক হলো নতুন বছরের প্রথম দিনে তরুণ-তরুণীদের পানি খেলা। এ ছাড়া এ উৎসবে তারা পিঠা তৈরি, বৌদ্ধ পূজা ও বয়স্ক পূজার আয়োজন করে। নেপালেও পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালন করা হয় বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে। ইরানে সুপ্রাচীনকাল থেকেই ‘নওরোজ’ নামে নববর্ষ পালিত হয়ে আসছে। ইন্দোনেশিয়ার বালি ও জাভা অঞ্চলে শকাব্দের অনুসরণে ২৬ মার্চ নববর্ষ উদযাপন করা হয়। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামেও নববর্ষ পালিত হয় বর্ণিল আয়োজনে।

ভারতবর্ষে মুঘল সামাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। খাজনা পরিশোধে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌরসন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন পরে বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি., নাটোর

[email protected]

 

"