বিশ্লেষণ

অর্থ ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনে দক্ষিণ এশিয়া

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের উরি হামলার জের ধরে ভারত ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে তৃতীয় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন। যেকোনো পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের অকৃত্রিম বন্ধু বলে পরিচিত বেইজিংয়ের ভূমিকা নিয়ে নয়াদিল্লি ঘোর সন্দিহান। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে চীনের ভূমিকা কী হবেÑ এ নিয়ে চলছে হিসাব-নিকাশ। সম্প্রতি পাকিস্তানে চীনের বিশাল অর্থনৈতিক প্রকল্প চালু হয়েছে। ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ব্যয়ে চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরকে (সিপিইসি) ইসলামাবাদে বেইজিংয়ের ব্যাপক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের ক্ষেত্রেও সহায়তা দিয়ে আসছে চীন। বলা যায়, চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ এবং তা আজও একইভাবে অব্যাহত রয়েছে। বাণিজ্য এবং সামরিক কৌশলগত কারণে, সর্বোপরি মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ তথা বহিঃরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন এবং গভীরতর করার জন্যও গোয়াদর বন্দর চীনের জন্য অপরিহার্য। গোয়াদরের অবস্থান এমন এক কৌশলগত স্থানে যেখান থেকে ইরানের দূরত্ব মাত্র ৭২ কিলোমিটার এবং ওমানের বন্দর কেইপ আল-হাদের দূরত্ব ৩২০ কিলোমিটার। আরব সাগরের তীরের গোয়াদর থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট হরমুজ প্রণালির দূরত্ব মাত্র ৪০০ কিলোমিটার। আর হরমুজের সঙ্গে রয়েছে পার্সিয়ান গালফের সংযোগ। এ গাফল পথে প্রতি বছর কমপক্ষে ১৯ ট্রিলিয়ন টন ক্রডওয়েলবাহী জাহাজ চলাচল করে। কাজেই গোয়াদর বন্দর চীনের অধীনে থাকার অর্থ দাঁড়ায় মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়া।

উল্লেখ্য যে, চীনের কাশগড় থেকে গোয়াদরের সড়ক যোগাযোগ দূরত্ব মাত্র ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার। চীন থেকে গোয়াদর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সমুদ্রপথে চীনের দূরত্ব ১২ হাজার কিলোমিটার কমে যাবে এবং গোয়াদর বন্দর দিয়ে ভারত মহাসাগরে চীন যে প্রবেশাধিকারের সুযোগ লাভ করবে, সেটা হবে ভারতের জন্য হুমকিস্বরূপ। ২০১৩ সালে চীন ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ চীনা অর্থায়নে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসি নামক অবকাঠামো উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই এ প্রকল্প নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা চলে আসছে। উভয় রাষ্ট্রের কাছে প্রতিবেশী ভারত প্রথম থেকেই এ প্রকল্প নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করে আসছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পের ন্যায় অন্য কোনো প্রকল্প নিয়ে এমন ধারা বিতর্ক সৃষ্টি হতে দেখা যায়নি আর কখনো। বিশেষ করে ভারতের প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ার মতো। কেন এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো, তা নিয়ে আলোচনার পূর্বাহ্নে সিপিইসি সম্পর্কে সম্যক ধারণা তুলে ধরা প্রয়োজন। অন্যদিকে, করাচি ও লাহোরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগের জন্য ১১০০ কিলোমিটার মোটরওয়ে নির্মাণ করা হবে। আর প্রতিটি সড়ক-মহাসড়কের শেষ গন্তব্য হয়ে গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দর। অর্থাৎ পুরো পাকিস্তানকে গোয়াদর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করার এক মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সিপিইসির মাধ্যমে এবং এটাও সত্য যে, এসব পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সড়ক নেটওয়ার্ক স্থাপন করা।

শুধু যে সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়ন করা হবে তা নয়, রেল নেটওয়ার্ক উন্নয়নের মহাপরিকল্পনাও রয়েছে সিপিইসি এর মাধ্যমে। রেলপথ উন্নয়নেরও লক্ষ্য হলো একদিকে চীন এবং অন্যদিকে গোয়াদর সমুদ্রবন্দরের মধ্যে সংযোগ সাধন করা। রেল যোগাযোগের উন্নয়নের অংশ হিসেবে করাচি শহর থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত মেইন রেললাইন উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্কার আপগ্রেডেশনের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে এবং চলতি সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে। এর সংস্কারকাজ শেষ হলে এ রেললাইনে প্রতি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করবে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের রেলওয়ে নেটওয়ার্ক বর্ধিত করে চীনের দক্ষিণ জিনজিয়াংয়ের কাশগড় পর্যন্ত বিস্তৃত করার এক মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে পাকিস্তানের নানা অঞ্চলের রেলওয়ে রুট উন্নয়ন, সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। সিপিইসি প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো চীন থেকে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা। এ পাইপলাইনের মাধ্যমে চীন গ্যাস ও তেল আমদানি-রফতানি সহজভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে পাইপলাইন সম্প্রসারণের জন্য গোয়াদর বন্দর থেকে ইরানের নওয়াবশাহ পর্যন্ত ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গোয়াদর থেকে নওয়াবশাহ পর্যন্ত ৭১১ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য সিপিইসি প্রকল্প গেম চেঞ্জার হিসেবে ভূমিকা রাখবে। এটা হবে পাকিস্তানের ভাগ্যেরও পরিবর্তনকারী। এই প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে। অন্তত সাত লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, এর বেশির ভাগই হবে পাকিস্তানে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের বিবর্তনে সিপিইসির মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রোফাইলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে চীনই সিপিইসির মাধ্যমে সর্বাধিক বেনিফিশিয়ারি হতে পারে।

এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চীন কৌশলগতভাবে লাভবান হবে এবং শক্তিমত্তায় চীনের আঞ্চলিক জিওপলিটিক্যাল প্রভাব বাড়বে এবং স্বাভাবিকভাবে সেটা এশিয়া ও বৈশ্বিক পর্যায়ে আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। তাই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসার জন্যই চীনের প্রয়োজন পাকিস্তান এবং বিশেষ করে গোয়াদর সমুদ্রবন্দরÑ এমনটাই অভিমত বিশেষজ্ঞদের। সিপিইসি প্রজেক্ট চীনের বহিঃবাণিজ্য ও তেল বাণিজ্য সহজীকরণ হবে এ কারণে যে, বহিঃবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ দূরত্ব অনেকটা কমে যাবে এবং ফলে পরিবহন খরচ কমে যাবে। যাতায়াতের সময়ও কমে যাবে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ইত্যাদি অঞ্চল থেকে একটা ওয়েল কার্গো জাহাজ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে চীনের যেকোনো বন্দরে পৌঁছাতে সময় লাগে ৪৫ দিন। অথচ গোয়াদর বন্দর হয়ে সেটি পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ১০ দিন। অন্যদিকে, মালাক্কা ও হরমুজ প্রণালি হয়ে চীনের সাংহাই বন্দরের দূরত্ব ১০ হাজার কিলোমিটার। অথচ সিপিইসি প্রজেক্টের চীনের কাশগড় হতে গোয়াদর বন্দরের দূরত্ব ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার এবং সাংহাই বন্দর থেকে কাশগড়ের দূরত্ব ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ সাংহাই থেকে কাশগড় হয়ে গোয়াদর বন্দরের দূরত্ব দাঁড়ায় ৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার।

দীর্ঘ এ মহাসড়ক নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রকল্পটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অন্যতম একটা পাইলট প্রকল্প চীনের কাশগড় থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তানের কাশ্মীর অংশের গিলগিট বালিস্তান, বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া, পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশের বিভিন্ন স্থান স্পর্শ করে মূলত বেলুচিস্তানের গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরকে চীনের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। প্রকৃতপক্ষে, এটা আধুনিক ট্রান্সপোর্টেশন নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে দেশ দুটির মধ্যে সড়ক যোগাযোগ, রেল যোগাযোগ এবং তেল-গ্যাস সরবরাহ-সংক্রান্ত পাইপলাইনের সংযোগ সাধিত হবে। শুধু পাকিস্তানের সঙ্গেই নয়, এর মাধ্যমে পুরো মধ্য এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার সঙ্গে চীনের সংযোগ স্থাপিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে চীন-পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি উভয় রাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক আরো জোরদার হবে এবং নতুন সুযোগ, নতুন লক্ষ্যে উভয় রাষ্ট্রের লক্ষ্যার্জনে গতিবেগ সৃষ্টি করবে। আর বিশেষ করে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে অভিমত উভয় দেশের বিশেষজ্ঞদের। সিপিইসি মূলত একটা বহুমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক মেগা প্রজেক্ট। বৃহৎ এ প্রকল্পের প্যাটার্ন সাজানো হয়েছে, এক ও চার অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে। অর্থাৎ কেন্দ্রে থাকবে সিপিইসি এবং এর মাধ্যমে গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পসহ প্রধান চারটা ক্ষেত্র; যেমনÑ যোগাযোগ ও যাতায়াত অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাত, শিল্প খাত ইত্যাদি উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা। এমনকি ভবিষ্যতে সেবা ও আর্থিক খাতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে, পর্যটন খাতে, শিক্ষা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ খাতে এবং সর্বোপরি নগর উন্নয়ন খাতে সিপিইসির মাধ্যমে উন্নয়ন সহযোগিতামূলক কর্মকান্ড সম্প্রসারণ করা হবে মর্মে চীন ও পাকিস্তান একমত হয়েছে।

সিপিইসির আওতায় সড়ক ও মহাসড়ক অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে চীন-পাকিস্তানের মধ্যে সংযোগকারী কারাকোরাম মহাসড়ক, হাসান আবদাল থেকে চীনা সীমান্ত পর্যন্তও পুনর্নির্মাণ করা হবে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্প পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূকৌশলগত রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে এবং আঞ্চলিক ও বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রতিযোগিতায় চীন এক প্রকার বড় ধরনের সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল অভিমত প্রকাশ করেছে। চীন পাকিস্তানে পারমাণবিক চুল্লিও নির্মাণ করছে। দুটির নির্মাণকাজ এরই মধ্যে শেষ পর্যায়ে এসেছে। আরো কয়েকটির কাজ চলছে। চীন থেকে এরই মধ্যে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে মালামাল পরিবহন করা হয়েছে গোয়াডর বন্দর পর্যন্ত। সেখান চীনের পণ্য গেছে আফ্রিকায় এবং পশ্চিম এশিয়ায়। এখন অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি করার বিষয়টি চীনের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। ইসলামাবাদে নতুন একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের একজন কর্মী বলছিলেন, দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক আরো ভালো হবে বলে তিনি মনে করেন। এখন দুই দেশের সম্পর্ক খুব ভালো। ভবিষ্যতে আরো গভীর হচ্ছে আমাদের সম্পর্ক। কমিউনিস্ট দেশ চীন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পাকিস্তানের এই সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষকদেরও কৌতূহল কিন্তু বেড়েই চলেছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

 

"