পর্যবেক্ষণ

ভারতের নির্বাচনী হালচাল

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

অলোক আচার্য

বিশে^র বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সাত ধাপের প্রথম ধাপের নির্বাচন দোরগোড়ায়। নির্বাচনের গরম হাওয়ায় উত্তপ্ত রাজনীতি। ১১ এপ্রিল থেকে শুরু করে শেষ দফার ভোট হবে ১৯ মে। আর ভোট গণনা হবে ২৩ মে। প্রচার-প্রচারণায় দলগুলো মুখর। ভারতের বাজারে ভোটের শাড়ি এসেছে। তার নাম প্রার্থীদের নামে। প্রিয়াঙ্কা শাড়ি, মমতা শাড়ি, মোদি শাড়িÑ এসব ভিন্ন ভিন্ন নামে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ভারতের রাজনীতিতে কে আসবেন? গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী বিজেপি তাদের এক-তৃতীয়াংশ এমপিকে প্রার্থী করছে না। ২০১৪ সালে নির্বাচিত ৭১ জন এমপিকে বাদ দিয়েছে এ পর্যন্ত। মোদি বলছেন, বিজেপিতে পরিবারতন্ত্র চলে না। তবে এ পদক্ষেপের পর বিজেপিতে গৃহদাহ বাড়ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। মোদি ম্যাজিকে ফের বিজেপি নাকি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় আসবে, তা নিয়ে জোর গুঞ্জন চলছে। কথার লড়াই চলছে বিজেপি-কংগ্রেস-তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতর। মোদির ব্যক্তি ইমেজ ভারতের রাজনীতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই ব্যাপক বেকারত্ব ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষের কারণে এবারের নির্বাচনে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা কম হলেও মোদির বিপরীতে ভারতীয়রা কাকে বেছে নেবেন বা কার ওপর তাদের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন, তা আর কিছুদিনের মধ্যেই জানা যাবে। বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের নির্বাচন নিয়ে সারা বিশে^র দৃষ্টি এখন ভারতের দিকে। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা আর অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ ছিল মোদির বিজেপি এবং কংগ্রেসসহ ছোট-বড় সব দলের বিরুদ্ধে।

৫৪৩টি আসনে ভোট দেবেন ৮৪ কোটি ৩০ লাখ ভোটার। এর মধ্যে দেড় কোটি ভোটার এবারই প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। এই বড় অঙ্কের ভোটার এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে বলে থিংকট্যাংক মনে করছে। আমাদের দেশের নির্বাচনে যেমন তরুণ ভোটাররা বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। বেকার সমস্যাসহ নানা কারণে তরুণ ভোটারদের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন এবং বিগত আমলের তরুণদের জন্য নেওয়া উদ্যোগ এ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করবে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তরুণদের প্রতিক্রিয়া দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, তারা সবাই তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি উঠে আসে। তারা সবাই ভাবছেন, একটি নিরাপদ এবং কর্মসংস্থানপূর্ণ জীবনযাপন। এর সঙ্গে ধর্মীয় উত্তেজনা ও সাম্প্রদায়িক টানাপড়েন নিয়েও তাদের উদ্বেগ রয়েছে অনেকের। কারণ এসব বিষয় সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তরুণ ভোটার যেকোনো দেশের নির্বাচনেই একটি আলোচিত বিষয়। তারা কী চান বা তাদের আশা-আকাক্সক্ষার কথা মাথায় রেখেই রাজনীতিবিদরাও প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রধান প্রার্থীর ওপর ফোকাস করে বিগত ৩০ বছরের রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করে বিজেপি। এ নির্বাচনেও তারা মোদিকে ফোকাস করেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইছে। পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলার পর দলটির নেতারা দাবি করেছিলেন ভারত এখন শক্ত ও নিরাপদ নেতৃত্বের হাতে রয়েছে। সব সমস্যার সমাধান হিসেবে মোদিকেই বেছে নিচ্ছে দলটি। বিজেপির শাসনামলে বৈশি^ক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তারা মোটামুটি সফল বলা যায়। মহাকাশসহ প্রযুক্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। তারা মূলত মোদি ম্যাজিকেই ভরসা রাখতে চান। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপিতে মোদি কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এবারের নির্বাচনেও ব্যক্তি মোদিও প্রভাব থাকবে। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তার প্রভাব কিছুটা হলেও মøান হয়েছে। তবে বিগত নির্বাচনের মতো এবারও জনগণের মনোযোগ তাদের প্রতি ঘোরাতে পারবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু সেবারের প্রেক্ষাপট থেকে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিছু ঘটনা মোদির পক্ষে কাজ করলেও সমালোচনারও অভাব নেই। এদিকে ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে একে অপরের প্রতি বাক্যবাণ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মহারাষ্ট্রের নাগপুরে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেছেন, তার দল ক্ষমতায় গেলে রাফায়েল নিয়ে তদন্ত হবে। এদিকে আসামের এনআরসি খসড়া প্রণয়ন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। বিরোধীরা এর সূত্র ধরেই মোদিকে কড়া আক্রমণ করছেন। আসামে জাতীয় নাগরিক তালিকা প্রণয়নের সমালোচনা করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, কে দেশ ছেড়ে যাবে, সে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিতে পারেন না। বিজেপি আবার ক্ষমতায় এলে মোদি সংবিধান অমান্য করতে সব চেষ্টা করবেন। এনআরসি প্রসঙ্গটি গত বছর থেকেই আলোচনায়। গত বছরের জুলাইয়ে আসামের খসড়া এনআরসিতে ৪০ লাখেরও বেশি নাম বাদ পড়ে। যাদের এখন নানা হয়রানি ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। এ ঘটনার পর থেকেই মোদি সরকারের নানা সমালোচনা হচ্ছে। বিরোধীরাও বিভিন্ন সময় মোদি সরকারের সমালোচনা করছেন। বিরোধী দল যতই চা-ওয়ালা বা চৌকিদার বলে ডাকুক না কেন, তাকে নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তা বিরোধী শিবিরে। মোদিকে নিয়ে যত সমালোচনাই হোক না কেন, তাকে পার হওয়া বেশ কষ্টকর হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"