পর্যালোচনা

অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতিতে দুর্বিষহ হাওর

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়

২০১৭ সালের অকাল বন্যায় মারাত্মক ক্ষতির বেদনাদায়ক রেশ এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে হাওর পাড়ের অগণিত কৃষককে। তখন হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমির বোরো ফসল সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সীমাহীন ক্ষতির শিকার হয়েছিল ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৫৩৩টি পরিবার। সেই ক্ষত সেরে উঠতে হাওরাঞ্চলের মানুষ এবারও চেয়ে আছেন ফসলি মাঠে। কিন্তু ফসল রক্ষার নেতিবাচক নানাদিক হাওর পারে অস্বস্তির জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। বিগত বছরের মতো প্রকৃতি এবার বেঁকে বসলে হাওরে নেমে আসবে দুর্গতি, এমন ভাবনায় শঙ্কিত কৃষক। হাওরবুকে জেগে ওঠা ফসলের আগাম প্রস্তুতি তাগিদ কৃষকের মন ভরিয়ে দিলেও অসময়ের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দুঃখস্মৃতি দুর্বল করে দিচ্ছে কৃষকের নিস্তেজ দেহ।

থেমে নেই হাওর দুর্নীতি। পাল্টেছে ধরন, চলছে পুরোনো ধাঁচের দুর্নীতি নমুনা। ২০১৭ সালের দুর্নীতি বিপন্ন হাওর প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির আচরে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিগত বছরে অকাল বন্যা আর দুর্নীতি অদম্য অন্যায্যতা হাওর পাড়ে নীরব দুর্ভিক্ষের জন্ম দিলেও থেমে থাকেনি হাওরখেকো মহড়া। হাওরের সেই পুরোনো দুর্নীতিবাজরা নামে-বেনামে পিআইসি বনে তদারকি করেছেন হাওররক্ষা বাঁধের কাজ। হাওর পাড়ে এদের লম্ফঝম্ফ নীরব অসন্তোষের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। হাওরে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ, বেঁধে দেওয়া সময়ে সংস্কার কাজ শেষ না হওয়া এবং চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের পিআইসিতে রেখে হাওররক্ষা বাঁধের কাজ ফের তাদের হাতে তুলে দেওয়াসহ দুর্নীতির নিত্যনতুন নমুনা ফসলপূর্ণ হাওরকে অরক্ষিত করে তুলছে। পত্রিকান্তরে ফলাও করে প্রকাশ হয়েছে হাওর-সংক্রান্ত নেতিবাচক সব সংবাদ। দুর্নীতির নানা রকম নমুনা প্রতিফলিত হয়েছে এসব প্রতিবেদনে।

বাস্তবতা বলছে, হাওরখ্যাত সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জস্থ হাওর বাঁধে অনিয়ম-অসংগতির চিত্র সত্য। শোনা যাচ্ছে কৃষকদের শঙ্কিত কথা। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী হাওরের প্রকৃত কৃষক এবং হাওরে যাদের জমি আছে, তাদের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) করে এসব কাজ করার কথা। এ ছাড়া হাওররক্ষা বাঁধের কাজে কোনো দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধিকে রাখা হবে না। হাওর তলিয়ে যাওয়া পরবর্তী সময়ে এমন সুর উঠলেও পলাতক বিতর্কিত ইউপি সদস্যকে হাওররক্ষা বাঁধের কাজে দেখলে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন জাগেÑ পুরোনো দুর্নীতিকে ফের জিইয়ে রাখার বন্দোবস্ত কি না। কিন্তু কেন এই তৎপরতা। তা হলে কি দুর্নীতিবাজদের ফের সুযোগ দিয়ে হাওরের অগণিত অসহায় কৃষকের সর্বস্বান্ত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে! হাওর দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত গুণধরদের বিচারের বিপরীতে তাদেরকে জামাই আদরে আবারও পিআইসি বানিয়ে হাতে কাজ তুলে দেওয়া বিচারহীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়া নয় কি?

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জস্থ হালি হাওরের বাস্তবতা বাদ দিয়ে পত্রিকান্তরে উঠে আসা সংবাদে দৃষ্টি দেওয়া যাক। জাতীয় একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়, ঘুরেফিরে তারাই! দুদকের মামলার আসামি হওয়ার পরও সুনামগঞ্জের শাল্লার পাঁচ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির পাঁচ সভাপতিকে (পিআইসি সভাপতি) পিআইসির সভাপতি করা হয়েছিল এবারও। এই সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে হাওররক্ষা বাঁধের কাজের শুরুতে বহিষ্কারও করা হয় এ পাঁচ পিআইসি সভাপতিকে। এই বহিষ্কারের সংবাদও ছাপা হয় গণমাধ্যমে। কিন্তু বৃহস্পতিবার এদেরকেই আবার হাওররক্ষা বাঁধের টাকা তুলতে দেখেন শাল্লার গণমাধ্যম কর্মীরা। হাওর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘুরেফিরে হাওররক্ষা বাঁধের কাজ করেছেন তারাই। ২০১৭ সালের হাওর দুর্নীতির কারণে জেলা আইনজীবী সমিতির দায়ের করা মামলায় আসামি ছিলেন যারা এবারও হাওররক্ষা বাঁধের পিআইসি সভাপতি তাদের করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় এবং জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর ওই পাঁচ পিআইসি সভাপতিকে বহিষ্কার করে উপজেলা হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি। এ সংবাদও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাস্তবে বাঁধের কাজ করেছেন এরাই। দুই কিস্তির বিলের টাকাও তাদের নামেই উঠেছে। বৃহস্পতিবার তৃতীয় কিস্তির টাকা অবশ্য এই ইউপি সদস্যরা নিজেরা উপস্থিত থেকেই অন্য নামে তুলেছেন।

হাওররক্ষা বাঁধের কাজে চরম অসংগতি, অবহেলা, দুর্নীতির দুষ্ট থাবা এবং অতীত দুর্নীতিগ্রস্ত দুষ্ট লোকদের কোনো না কোনোভাবে ফের বাঁধের কাজে যুক্ত হওয়ার চাতুর্য্যপনা হাওরে শোনাচ্ছে ফসল তলিয়ে যাওয়ার পদধ্বনি। হাওর এলাকার বাস্তবচিত্র এবং পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে প্রতীয়মান হয় ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এখনো প্রায় অরক্ষিত। সংবাদ ভাষ্যে তা পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। খবরে বলা হয়, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করার কথা ছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার চার দিন পরও বেশির ভাগ প্রকল্পেই কাজ শেষ হয়নি। গত ৪ মার্চ সোমবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলায় ৯০ শতাংশ, নেত্রকোনায় ৯০ শতাংশ এবং কিশোরগঞ্জে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। স্থানীয় কৃষক ও সংগঠকদের মতে, কিশোরগঞ্জে কাজ হয়েছে ৫০ শতাংশের মতো। জেলার কোথাও কোথাও কাজ শুরুই হয়েছে নির্ধারিত সময়ের দেড় মাস পরে। সুনামগঞ্জে কাজ এগিয়েছে ৬০ শতাংশের মতো। ওই দুই জেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ আছে।

হাওর দুর্নীতির নমুনা একেক সময় একেক রূপ ধারণ করছে। সুনামগঞ্জের ৩৭টি হাওরে চলতি অর্থবছরে দুই শতাধিক ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অপ্রয়োজনীয়। এতে সরকারের প্রায় ৩০ কোটি টাকার অপচয় হয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় কৃষক নেতারা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফোরামে ফসলরক্ষা বাঁধ তদারকির দায়িত্বে থাকা জেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটিকে অবগত করা হলেও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করা হয়নি। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে তেমন কাজও হয়নি বলে মনে করেন স্থানীয় কৃষক নেতারা। উল্লেখ্য, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৫৬৭টি প্রকল্প হাতে নেয় জেলা কাবিখা (কাজের বিনিময়ে টাকা) মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

আবারও যদি ২০১৭ সালের অকাল বন্যার পুনরাবৃত্তি হয় তা হলে আমরা হয়তো প্রকৃতির ওপরই দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। বলব, প্রকৃতি বিরোধিতা করলে কিছু করার নেই। তবে বেদনার ক্ষেত্রটা তখনই থেকে যায়, যখন দেখি প্রকৃতির সঙ্গে দুর্নীতির বিষয়টা গিয়ে যুক্ত হয়। ২০১৭ সালের দেশ কাঁপানো হাওরবিধ্বংসী খেলায় কৃষক বিপন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ জানতে পারে হাওররক্ষা বাঁধে বরাদ্দকৃত সরকারের শত শত কোটি টাকা কীভাবে দুর্নীতিবাজদের পকেটে চলে যাচ্ছে। দুর্নীতির শাণিত ফলা দিয়ে লাখো কৃষকের বক্ষবিদীর্ণ করে কীভাবে ফসলহারা কষ্ট উপহার দেওয়া হচ্ছে। অকাল বন্যা ও অসময়ের বৃষ্টিতে নামকাওয়াস্তে সংস্কারকৃত বাঁধ ভেঙে হাওর তলিয়ে না গেলে হাওরপাড়ের কৃষক হয়তো জানতেই পারতেন না বাঁধরক্ষা কাজের নামে কোটি কোটি টাকা কে বা কারা ভোগ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। বিগত বছরের দুর্নীতি তান্ডবে হাওর তলিয়ে গেলে বেরিয়ে আসে দুর্নীতিবাজদের আসল চেহারা। শুরু হয় ধরপাকড় দায়িত্ববোধের রাষ্ট্রীয় মহড়া।

তখন হাওরের নীরব আর্তনাদ থামাতে সরকারের যুগোপযোগী খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি হাওর এলাকায় স্বস্তি এনে দিয়েছিল। সরকারের জনবান্ধব কর্মসূচিতে সর্বত্র সন্তুষ্টির ইতিবাচক আবহ টের পাওয়া যায়। প্রশংসা কুড়ায় সরকারের কৃষক উপকৃত এ নীতি। কিন্তু যাদের কারণে দেশ রক্ষাকারী চাষা সম্প্রদায়ের আশা-ভরসা ও স্বপ্নের সলিল সমাধি হয়েছে তাদের বিচারের আওতায় আনতে পারেনি সরকার। দুর্নীতিবাজদের প্রতি সরকারের সোহাগপ্রীত মনোভাব মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। হাওরসন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত এই দুর্নীতিবাজরা শুধু মুক্ত পরিবেশে ঘুরেই বেড়াচ্ছে না, তাদের ফের দুর্নীতির ছাড়পত্র দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে বিচারের বদলে দুর্নীতিবাজদের দুর্নীতিকে সমর্থন দিয়ে হাওর পাড়ের অগণিত কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে কি না; সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, এই সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম কারিগর এ দেশের অবহেলিত কৃষক সমাজ। তাদের হাতেই উৎপন্ন খাদ্যশস্যে বাংলাদেশ আজ দারিদ্র্যমুক্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ। হাওরের ফসলহারা পীড়িত চাষা সম্প্রদায় দেশকে এগিয়ে নিতে নীরব ভূমিকা পালন করলেও তারাই আজ অরক্ষিত।

হাওরের মানুষ অনিশ্চিত যাত্রায় আর এগিয়ে যেতে চায় না। তারা ফসল সুরক্ষার নিশ্চয়তা চায়। কীভাবে হাওরের এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে তাদের ফলনপ্রাপ্তির সংশয়রহিত অবস্থানে নিয়ে দাঁড় করানো যায়; সে পথ খোঁজে বের করতে হবে। প্রথমে হাওরের পার্শ্ববর্তী সব নদী, ডোবা, খাল খনন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা অবশ্যই জরুরি। দ্বিতীয়ত. বছরের পর বছর হাওরে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি না করে উন্নত টেকসই দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করাটাই হবে দুর্যোগ মোকাবিলার একমাত্র উপযোগী সিদ্ধান্ত। প্রতি বছরই দেখা যায়, হাওররক্ষায় অধিকাংশ বাঁধ মাটি ভরাটের মাধ্যমে মেরামত করা হচ্ছে, আবার বর্ষায় হাওর তলিয়ে গেলে মেরামতকৃত এ বাঁধগুলো ঢেউয়ের উপর্যুপরি আঘাতে ফের আগের অবস্থানে ফিরে যাচ্ছে। ফলে আবারও হাওরে বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এভাবে বছরের পর বছর সরকারের শত শত কোটি টাকা হাওরের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এটা অনর্থক ব্যয় বরাদ্দ ছাড়া আর কিছুই না। তাই হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণে গ্রহণ করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রতি বছর এভাবে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এতে করে বরাদ্দকৃত বেশির ভাগ টাকা চলে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজদের পকেটে। তাই বাঁধবিষয়ক এ কাজে সরকারকে উন্নত ব্যবস্থাপনার দিকেই এগিয়ে যেতে হবে। তৃতীয়ত. হাওর সুরক্ষিত নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি ভাটির জীবনমান উন্নয়নসহ নিশ্চিন্তে ফলন ঘরে তোলার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সফল ভূমিকা পালন করতে হবে। তা হলে হয়তো কৃষকের সুদিন ফিরে আসতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

bishwa85@gmail.com

 

"