পর্যালোচনা

জাগছে ভূমি, বাড়ছে সম্ভাবনা

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

ঠিক যখনই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সিংহভাগ তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে; ঠিক তখনই বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা ছোট ছোট ভূমি অভাবনীয় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এ যেন আরেক বাংলাদেশ! ধারণা করা হচ্ছে, বঙ্গোপসাগর ও উপকূলবর্তী বিভিন্ন নদীতে এখন বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বর্গকিলোমিটারের বেশি নতুন ভূমি জেগে উঠছে। তথ্য মতে, প্রতি বছর যে পরিমাণ ভূমি নদীভাঙন ও ভূমিধসের কারণে বিলীন হয়, প্রতি বছর জেগে ওঠা ভূখন্ড তার চেয়ে বেশি! গত চার দশকে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি যুক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, নতুন ভূমি বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগেরও বেশি। গত কয়েক দশকে উপকূলের জেলাগুলোতে (চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ফেনী, ভোলাসহ অন্যান্য উপকূলীয় জেলা) আনুমানিক ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের নতুন ভূমি জেগে উঠেছে। অনেক আগেই নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠে নিঝুম দ্বীপ, স্বর্ণ দ্বীপ, ভাসানচরসহ আরো অনেক দ্বীপ। মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় যে পরিমাণ ভূমি বিলীন হচ্ছে তার বিপরীতে এর চারদিকে কয়েকগুণ ভূমি জেগে উঠছে। হাতিয়া উপজেলায় প্রতি বছর যে পরিমাণ ভূমি জাগছে, তাতে কয়েক বছরের মধ্যে হাতিয়া একটি জেলার আয়তনের সমান হবে! সব মিলিয়ে নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় প্রতি বছর প্রায় ৭০ হাজার নতুন ভূমি জাগছে। হাতিয়ায় জেগে ওঠা স্বর্ণ দ্বীপের আয়তন একটি উপজেলার আয়তনের সমান! স্বর্ণ দ্বীপের প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ভাসানচর। ভাসানচরের আয়তন প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার। ভাসানচরের দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বিশাল আয়তনের গাঙ্গুরিয়া চরের অবস্থান। এ ছাড়া হাতিয়ার দক্ষিণে আরো বেশ কয়েকটি চর জেগে উঠেছে। এগুলো হলোÑ পশ্চিমে ঢাল চর, চর মোহাম্মদ আলী, সাহেব আলীর চর, চর ইউনুস, চর আউয়াল, মৌলভীর চর, তমরদ্দির চর, উত্তরে নলের চর, জাগলার চর, কেয়ারিং চর, জাহাইজ্জার চর ইত্যাদি। এমন অনেক চর বা ভূমি অনেক আগে থেকেই বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে উঠেছে। এ ছাড়া ৩০-৪০টির বেশি ডুবোচর (ভাটার সময় জেগে উঠে, জোয়ারের সময় ডুবে যায়) রয়েছে, যেগুলো জেগে উঠার অপেক্ষায় রয়েছে। হাতিয়ার কোনো কোনো চরে জনবসতি গড়ে উঠেছে, শুরু হয়েছে চাষাবাদ। এ ছাড়া সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীর আশপাশেও ছোট ছোট চর জেগে উঠেছে। এসব স্থানে সবুজবেষ্টনী গড়ে তোলা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের সন্দীপের ১৫০ বর্গকিলোমিটার দ্বীপ ঘিরে চারপাশে নতুন ভূমি গড়ে উঠেছে এর দ্বিগুণ। এ ছাড়া মেঘনা নদীর পাড় ঘিরে বিভিন্ন সময় সৃষ্টি হওয়া আরো ৬০টির বেশি চর জেগে উঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সে হিসেবে সব মিলিয়ে আগামী দুই দশকে বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেক পরিমাণ নতুন ভূমি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে! ২০১৩ সালে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন উপকূলীয় অংশে প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি জেগে উঠেছে। নতুন এসব ভূমি জেগে ওঠার ফলে মূল ভূখন্ডের পরিমাণই বাড়বে না, তৈরি হয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনার হাতছানি। এখন শুধু দরকার পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ। বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠা নতুন ভূমিকে পরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মতভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সদ্য প্রণীত ‘শতবর্ষব্যাপী বদ্বীপ পরিকল্পনা- ২১০০’-এর মাধ্যমে জেগে উঠা চরগুলো অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। যদিও জেগে উঠা নতুন ভূমিকে কেন্দ্র করে সরকার ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা করেছে। তবে সবার আগে দরকার বনায়ন। নতুন ভূমিতে ব্যাপকভিত্তিকি বনায়ন সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া জেগে উঠা এসব নতুন ভূমিতে বসতিহীন প্রান্তিক মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। জেগে উঠা চরগুলোকে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করতে ক্রসড্যাম বা আড়াআড়ি বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করতে হবে। চরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ব্যাপক। এক একটি চর হয়ে উঠতে পারে এক একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র! এ ছাড়া নতুন ভূমিতে কৃষিকাজ ও মাছ চাষের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। চরকেন্দ্রিক পর্যটন সম্ভাবনাও ব্যাপক। প্রতিটি চর ও দ্বীপ ঘিরে পর্যটনশিল্পের বিকাশের কথা বিবেচনা করতে হবে। সর্বোপরি, বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠা ভূমিকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে পারলে ভূ-রাজনৈতিকভাবে অন্যান্য দেশের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে বাংলাদেশ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"