মুক্তকথা

রক্ষক যদি ভক্ষক হয়ে ওঠেন

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

মোহাম্মদ আবু নোমান

পুরো শরীর ব্যান্ডেজ করা মেয়েটির ছবি চোখে দেখা ও সহ্য করার মতো নয়। আমরা কোন সমাজে বাস করছি! মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ছবি, সংবাদ দেখে রীতিমতো হতাশ ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়। সমাজের নানা জায়গায় যৌন হয়রানি আছে। সেটা চিন্তার। কিন্তু ইদানীং স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি প্রাইমারি ও মাদরাসাশিক্ষকদের কারো কারো নামে বিভিন্ন মিডিয়ায় যা দেখা যায়, তাতে সেটাকে শুধু সামাজিক অধঃপতন বলে কি পার পাওয়া যাবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দেবে। আর এখানেই যদি হয় শিক্ষকের দ্বারা যৌন হয়রানির ঘটনা ও ছাত্রীর ইজ্জতের ওপর আক্রমণ! সেটাও যদি হয় প্রতিষ্ঠানপ্রধান দ্বারা! তাও যদি হয় মাদরাসার অধ্যক্ষের দ্বারা! তা হলে মাদরাসায়ও এত অমানবিকতা, বর্বরতা! সেখানেও যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ আর দলাদলির মতো জঘন্য বিষয়গুলোর জায়গা করে নেওয়া! এমন হীন মন মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি কীভাবে মাদরাসার অধ্যক্ষ হলো, এটাই দেশবাসীর জিজ্ঞাসা।

সর্বশেষ রাস্তাঘাটে বা অন্য কোথাও নয়, পরীক্ষা দিতে গিয়ে হলে ঢোকার পরে যদি আগুনে পুড়িয়ে মারার হীন ও বর্বর অপচেষ্টা করা হয়! আর এতে বিবেকবান মানুষের গায়ে কষ্টের, বিদ্রোহের আগুন না লেগে পারে কি? ৭০-৭৫ শতাংশ পুড়লে মেয়েটি কীভাবে বেঁচে থাকবে? অপরাধীরা এত আস্ফালন পায় কোথায়! তা হলে কি মানুষের কোনো মূল্য নেই? আইনের কতটুকু প্রয়োগ হয়! দেশে আইনকানুন আর প্রয়োগকারীরা কোথায়?

ফেনীর পৌর শহরের সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে গত শনিবার (৬ এপ্রিল) নুসরাত জাহান ওরফে রাফি (১৮) নামে এক ছাত্রীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে। প্রসঙ্গত, গত ২৭ মার্চ মাদরাসায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে ওই ছাত্রীকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করার অভিযোগে মামলা করা হয়। ওই মামলায় অধ্যক্ষ এখনো কারাগারে। ঘটনার পর থেকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অধ্যক্ষের শাস্তির দাবিতে, আরেকটি অংশ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে উল্টো মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। এই শিক্ষার্থীরা কারা! রাফির ভাই নোমানের দাবি, ২৭ মার্চের ঘটনার জেরে মাদরাসার অধ্যক্ষের পক্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী রাফিকে মাদরাসা কেন্দ্রের ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে তাকে চাপ দেয়। এ সময় রাফি কিছু না বলায় তিনজন শিক্ষার্থী তার হাত ধরে, একজন তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।

সম্প্রতি মানুষের প্রতি মানুষের হিংস্রতা এত বেশি প্রকট আকার ধারণ করছে, যার জন্য মানুষ আর পশুতে কোনো ভেদাভেদ থাকছে না। পশুর মধ্যেও এত হিংস্রতা নেই, যতটা মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এ ধরনের সংবাদ শোনার পর বিশ্বাস হয় না যে আমরা মানুষ। মানুষের মধ্যে পশুর মতো এমন হিংস্রতা সত্যি মেনে নেওয়া যায় না। মানুষ আর পশু এক নয়। মানুষের বোধশক্তি আছে, যেটা কি না একটা পশুর নেই। কোন কাজটা করলে ভালো হবে আর কোনটা করলে খারাপ হবেÑ এই বোধটুকু প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই থাকে; যেটা কি না একটা পশুর মধ্যে থাকে না। কিন্তু বর্তমানে মানুষ এত বেশি হিংস্র আর বর্বর হয়ে গেছে, তার মধ্যে বিচার-বিবেচনা বোধটুকুও লোপ পেয়েছে। ওইসব মানুষকে পশুর সঙ্গে তুলনা করা ছাড়া আর কী বলা যায়?

বলার, লেখার বা প্রতিবাদের ভাষা নেই! মানুষ কী করে মানুষের গায়ে আগুন ধরাতে পারে! প্রকৃত মানুষ হলে তো একটা কুকুরের গায়েও গরম পানি ঢালতে হাত কেঁপে উঠার কথা। ফেনীর সোনাগাজীর বেদনাদায়ক খবরে সবারই নির্বাক হওয়ার মতো অবস্থা। কোথায় আমার বোনের, সন্তানের নিরাপত্তা? আমরা কি অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি? যারা এই মেয়ের গায়ে এভাবে আগুন দিল, এরা কি আদৌ মানুষ? নাকি মানুষরূপী পশু! এ কেমন বর্বরতা, মানবতা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে আজ! শিক্ষকদের ভোলা উচিত নয়, পিতা-মাতার পর একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষকদের ওপরই সবচাইতে বেশি ভরসা করে। এর পরও সন্তানসম ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে এমন লজ্জাজনক আচরণ কোনো শিক্ষক কীভাবে করতে পারেন? শিক্ষকতা হচ্ছে মহান ও মর্যাদার পেশা। অথচ কতিপয় শিক্ষক এ মহান পেশার মর্যাদাকে কি অবলীলায় ভূলুণ্ঠিত করে চলছেন।

সোনাগাজীর এ মেয়েটি যখন শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছিল, প্রশাসনের উচিত ছিল তখন থেকেই মেয়েটির নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এ ঘটনা রচনা হতো না। রাফির আত্মীয়রা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বসে জানান, অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলা আগে থেকেই নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন। এর বিরুদ্ধে মাদরাসা পরিচালনা কমিটি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দেখা যায়, সব সময়ই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনা চেপে যায়। রক্ষকরাও যখন ভক্ষক হয়ে উঠেন, তখন আত্মসম্মানের কথা ভেবে বেশির ভাগ ভুক্তভোগীরা চুপ থাকেন। শিক্ষক হয়ে যখন এ রকম ঘৃণ্য কাজ করেন, তখন তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। একজন শিক্ষক কেবল মেধাবী ও উচ্চ ডিগ্রিধারী হবেন না; তার নৈতিক মান ও নীতিবোধও উঁচু হওয়া উচিত। উদ্বেগের বিষয়, আমাদের শিক্ষাঙ্গনে নীতি ও নৈতিকতাবোধ বিবর্জিত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে। অনেক সময় ছাত্রী কিংবা নারী শিক্ষকরা যৌন হয়রানির শিকার হলেও মুখবুজে সহ্য করেন। যখন কেউ সাহস করে প্রতিবাদ করেন বা প্রতিকার চান, তখনই সেটি গণমাধ্যমে আসে। প্রতিকারের দাবি উঠে।

ছাত্রীদের যৌন হয়রানি করা শিক্ষকদের নামের তালিকা লিখতে গেলে বড় একটি কিতাব হয়ে যাবে। যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন প্রাইমারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকও। কতিপয় শিক্ষক ছাত্রীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের সেসব দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন অনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখেন। ইতোপূর্বে চাকরিপ্রার্থী তরুণীকে মুঠোফোনে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ উঠে নোয়াখালী সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ আফতাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নোয়াখালীর তরুণ সমাজের ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে স্কুল, কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নাগরিকরা। সোনাগাজীর নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া চার দুর্বৃত্তই ছিল বোরকা পরা। ফলে রাফি কাউকেই চিনতে পারেনি। তবে একজন নারীকণ্ঠে রাফির সঙ্গে কথা বলেছে। বাকি তিনজন কোনো কথা বলেনি।

যারা নিজেরাই মানুষ হতে পারেননি, তারা কীভাবে মানুষ গড়ার কারিগর হবেন। শিক্ষকতা পেশাকে কলঙ্কিত করা নৈতিকতাবিবর্জিত এসব শিক্ষকের কারণে কত মেয়ের জীবন যে নষ্ট হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। অনেকে পড়ালেখা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার পথ। শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শব্দত্রয় একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষাগ্রহণ করতে হলে শিক্ষক বা ওস্তাদের প্রয়োজন। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষাই পারে একজন মানুষকে সঠিক ও সুন্দর পথ দেখাতে। এজন্যই প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে প্রকৃত আদর্শবান ও নৈতিকতাধারী শিক্ষকের বিকল্প নেই। একজন সফল মানুষের পেছনে শিক্ষকের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। শিক্ষক শুধু সফল নয়, একজন ভালো মানুষ হতে শেখান। শিক্ষক নিজে মানুষ হিসেবে কতটা আদর্শবান ও ভালো, তার ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা ভালো মানুষ হয়ে উঠবে কি না।

আদর্শ, সৎ চরিত্র ও নৈতিকতা ধ্বংসের সব পথঘাট, অলিগলি খুলে রেখে নৈতিকভাবে সুস্থ ও সৎ মানুষ পাওয়া যাবে না। অভিভাবকদেরও নৈতিক দায়িত্ব প্রাপ্তবয়স্ক কিংবা বয়োপ্রাপ্তির নিকটবর্তী হয়ে গেলে নিজ মেয়েদের ‘সহশিক্ষা’ পরিত্যাগ করে বালিকা স্কুলে শিক্ষাদান করানো। দেশে ছেলেমেয়েদের জন্য কম হলেও যতটুকু পৃথক শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, কেউ কেউ তাকেও উপেক্ষা করে মিশ্র শিক্ষাঙ্গনে সন্তানদের পাঠিয়ে ‘জল খেতে গিয়ে ঘটি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাই অধিক ঘটছে’। সর্বধর্মে যাকে অশ্লীল বলে অভিহিত করেছে, ওরা তাকে ‘প্রেম-ভালোবাসা’ বলে উপভোগ করছে।

শিক্ষকনামধারী কতিপয় চরিত্রহীনের দ্বারাই আজ বিভিন্নভাবে কলুষিত হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ। কোনো শিক্ষাঙ্গনেই যাতে এ ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক ঘটনা ঘটতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে। ফেনীর সোনাগাজীর ঘটনাটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে খতিয়ে দেখা জরুরি। এ ঘটনায় কে বা কারা জড়িত, তা তদন্ত করে বের করতে হবে। রাফির গায়ে আগুন দেওয়ায় অধ্যক্ষের ইন্ধন আছে কি না খতিয়ে দেখে, দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

abunoman1972@gmail.com

 

"