বিশ্লেষণ

পাট ও পাটকলের অস্থিরতা

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়

এবার পাটকলে দেখা দিয়েছিল অস্থিরতা। বিভিন্ন দাবিতে পাটকল শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। দাবি আদায় করতে পাটকল শ্রমিকরা নেমে আসেন রাস্তায়। মজুরি কমিশন-২০১৫ বাস্তবায়ন, বকেয়া পরিশোধ, বেতন-ভাতা পরিশোধ, গ্র্যাচুইটি, পিএফ ফান্ডের টাকা দেওয়া, বদলি শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ, অবসর শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া পরিশোধসহ ৯ দফা দাবিতে গত ২ এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে ধর্মঘট পালন করে আসছিল পাটকল শ্রমিক লীগ সিবিএ ও নন-সিবিএ পরিষদ। রাজ ও রেলপথ দখলে নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যান রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন পাটকলের শ্রমিক-কর্মচারীরা।

সুদিনে ফেরা পাটের গর্বিত পথচলায় শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি আবার সোনালি আঁশে বিবর্ণ বার্তা বয়ে আনে। পত্রিকান্তরে গেল কদিনের পাটকল-সংক্রান্ত সংবাদ একসময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল সোনালি পাটের সোনালি ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি করে। বিশ্বে আমাদের পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি পাটকলগুলোর অব্যাহত লোকসান পাটকে ফের দুর্দিনের পথে নিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশে বেসরকারি পাটকলগুলো ভালো করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি পাটকলগুলো কেন লোকসানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে, সেটাই বড় প্রশ্ন। এর আগে গত বছরের শুরুতেই বকেয়া মজুরি পরিশোধ এবং মজুরি কমিশন গঠন, বাস্তবায়নসহ ১১ দফা দাবিতে সারা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করেছিল। তখন ধর্মঘটে নামা পাটকল শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। রয়েছে দূরদর্শিতার অভাব ও গাফিলতি। এর দায় বর্তাচ্ছে শ্রমিকদের ওপর। লোকসানের অজুহাত তুলে পাটকল শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা দিতে গড়িমসি করা হচ্ছে।’ এর বিপরীতে বিজেএমসির মহাব্যবস্থাপক গাজী শাহদাৎ হোসেন বলেছিলেন, ‘এখন পাট কিনে দুর্নীতি করার সুযোগ নেই। কারণ সবকিছুই প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। আর বিজেএমসি যেহেতু সরকারের প্রতিষ্ঠান, তাই যেভাবে প্রতিষ্ঠানটি ভালো চলবে সরকার সেভাবেই ব্যবস্থা নেবে।’ সেই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস যেন আশ্বাসেই ব্রেকেটবন্দি থেকেছে। শ্রমিকদের কল্যাণে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বিধায় পাটকল শ্রমিকরা পথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। এ নিয়ে ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত কয়েক দফা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে ধর্মঘট ডাকা হয়। এভাবে বারবার ধর্মঘটের কারণে পাটশিল্প খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কিন্তু কেন এই অস্থিরতা?

পাটকলে শ্রমিক অসন্তোষের পরবর্তী ফল হচ্ছে ধর্মঘট। আর তখনই ধর্মঘটের মতো অসহিষ্ণু বাস্তবতা দেখা দেয়; যখন কারো পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। আমরা অতীতে দেশের রফতানিকারক অন্যতম শিল্প পোশাক খাতের লাখো শ্রমিককে আন্দোলনে নামতে দেখেছি। যে ধর্মঘট পোশাক শ্রমিকদের কর্মময় জীবনের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল সোনালি শিল্প পাটের সুদিন ফিরে আসার আশাজাগানিয়া প্রেক্ষাপটে পাটকল শ্রমিকদের ধর্মঘট আশার পালে ধমকা হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে। ধর্মঘটের ডাক দেওয়া আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, ‘সরকার জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫ সুপারিশ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ গ্রাচ্যুইটি ও মৃত শ্রমিকের বিমার বকেয়া টাকা প্রদান, টার্মিনেশন ও বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ীকরণ, পাট মৌসুমে পাট ক্রয়ের অর্থ বরাদ্দ, উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মিলগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিএমআরই করাসহ ৯ দফা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু আমাদের দাবিগুলো এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমরা রাজপথে আবার নামতে বাধ্য হয়েছি।’

সোনালি আঁশখ্যাত পাটের উর্বর ভূমি বাংলাদেশ। দেশের রফতানিকারক যে কটি শিল্প আছে তার মধ্যে পাট অন্যতম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের গ্রহণযোগ্যতা সর্বাধিক। তার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি পাটকলগুলো কেন বারবার লোকসানে পড়ছে। আর সেই লোকসানের ভারে বিপন্ন শ্রমিকরা কেনইবা পথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। যেখানে পাটের সুদিন ফিরে এসেছে বলে বাহবা কুড়ানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে; সেখানে পাটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটে নামা সোনালি পাটের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কতটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে, সেটাই প্রশ্ন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত অভিমতসূচক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পাটের সুদিন আবার ফিরে এসেছে। এমনকি বাংলাদেশেও বেসরকারি পাটকলগুলো ভালো করছে। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে রফতানি আয়ও বাড়ছে। অথচ সরকারি পাটকলগুলো ক্রমাগত লোকসান দিচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাটকলগুলোর লোকসান হয়েছে ৪৬৬ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লোকসানের পরিমাণ ৩৯৫ কোটি টাকা। ফলে স্বভাবতই পাটকল শ্রমিকদের বেতন বকেয়া পড়েছে ৮-১০ সপ্তাহের। অন্যদিকে কর্মচারীরা বেতন পান না তিন মাস ধরে। অতঃপর পাটকল শ্রমিকরা ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘট ও অবরোধে নেমেছেন রাজপথ-রেলপথে। পাটকল শ্রমিক নেতাদের মতে, সরকারি পাটকলের লোকসানের অন্যতম কারণ কাঁচা পাট কেনায় চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। মিল কর্তৃপক্ষ পাট কেনে দেরিতে এবং বেশি দামে। এ ছাড়াও সরকারি পাটকলের উৎপাদন ক্ষমতা কম, উৎপাদনে খরচ বেশি, যন্ত্রপাতি পুরোনো ও মজুরি বেশি। তদুপরি চট ও চটের বস্তা ছাড়া আর কিছু তৈরি করতে পারে না সরকারি পাটকলগুলো। সরকারি পাটকলগুলোর এই বাধ্যবাধকতা সোনালি পাটের সুদিন ফেরাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। পাটের সোনালি অতীতকে আরো ঝকঝকে আয়নির্ভর করে গড়ে তুলতে সরকারের ইতিবাচক প্রচেষ্টা পাটকল শ্রমিক অসন্তোষের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে কি না, সেটা ভেবে দেখতে হবে।

পাটের অতীত উজ্জ্বলতা একটা সময়ে হারিয়ে যেতে বসলেও বর্তমানে ফিরে এসেছে স্বর্ণযুগ। পরিবেশবান্ধব পাট থেকে তৈরি হচ্ছে নানা জাতের পণ্য। পাটজাত পণ্যে আকৃষ্ট হচ্ছে মানুষ, ঝুঁকছে পৃথিবী। বর্তমানে পাট থেকে তৈরি হচ্ছে ২৩৫ রকমের আকর্ষণীয় ও মূল্যবান পণ্য। সবচেয়ে বড় কথা, পাট থেকে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব পচনশীল পলিথিন। বর্তমানে যে প্লাস্টিক পলিথিন দেশে ও বিদেশে যথেচ্ছ ব্যবহৃত হচ্ছে, তা প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য সমূহ ক্ষতিকর। শুধু স্থলভাগেই নয়, সাগর-মহাসাগর পর্যন্ত পলিথিন দূষণে জর্জরিত। সে অবস্থায় বিকল্প হিসেবে পাটের পলিথিন ব্যবহারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে বিশ্বব্যাপী। বিশ্ববাজারে পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে ৫০০ বিলিয়ন পিসের। এর ১০ শতাংশ বাজার দখল করতে পারলে বছরে আয় করা সম্ভব ৫০ হাজার কোটি টাকা। পাট খাতের বৈশ্বিক রফতানি আয়ের ৭২ শতাংশ এখন বাংলাদেশের দখলে। তার পরও সরকারি পাটকলে লোকসান হচ্ছে, এমনটা সত্যিই আশ্চর্যজনক বটে। এ লোকসানের আসল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্বে পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পাটে লোকসানের বিষয়টি দুর্নীতির নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে বলে প্রতীয়মান হয়।

পাট উর্বর বাংলাদেশ যদি পাট শিল্পটির দিকে নজর দেয়; তা হলে সত্যিই পাটে সুদিন ফিরে আসবে। পাট থেকে রেকর্ড পরিমাণ আয় করতে পারবে বাংলাদেশ। সেই সম্ভাবনা অতি উজ্জ্বল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়েছে, ২০১৯ সালের মধ্যে সদস্যভুক্ত সব দেশ পণ্যের মোড়কসহ বহনের জন্য সব ব্যাগে প্লাস্টিক ও কৃত্রিম আঁশজাত উপজাত দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধ করবে। সুখবর দিয়েছেন বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। তারা পাটের জন্মরহস্যের (জেনোম) তথ্য দিয়ে উদ্ভাবন করেছেন নতুন জাতের পাটবীজ, যা থেকে প্রায় তুলার সুতার মতো স্বচ্ছ আঁশ উৎপাদন করা সম্ভব হবে অচিরেই। এই সুতা দিয়ে উন্নত মানের জামদানিসদৃশ কাপড় উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতসব সম্ভাবনা ও পাটের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চললেও রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি ২২টি পাটকল কেন ধারাবাহিক লোকসানে পতিত হচ্ছে কিংবা পাটকল শ্রমিকরা দফায় দফায় ধর্মঘট আন্দোলনে নামছে, তার কারণ অনুসন্ধান যেমন অপরিহার্য; তেমনি চিহ্নিত সমস্যা সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব প্রয়োজন।

১৯৬৬ সালের প্রদত্ত ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণার ৫ঘ ক্রমিকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় পাটের প্রসঙ্গটি আর্থ-রাজনৈতিক ব্যাখ্যাসহ উল্লেখ করা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে বিদেশি মুদ্রার তিন ভাগের দুই ভাগই অর্জিত হতো পাট হতে। অথচ পাটচাষিকে পাটের ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা আবাদি খরচটাও দেওয়া হতো না। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে পাট-সংক্রান্ত আধুনিক শিল্প-বাণিজ্যের বিকাশ এবং প্রসার শুরু হয়েছিল। প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাসে ব্রিটিশ বা পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক সরকার যা করার চিন্তা করেনি; এমনকি স্বাধীন ভারতেও যে বিষয়টি ভাবাই হয়নি, বাংলাদেশের যাত্রা শুরুর সময়ই বঙ্গবন্ধু পাট খাতে সে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে ভগ্নদশায় পতিত হতে থাকে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল এ খাত। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পাট খাতকে লাভজনক করার অঙ্গীকার করেছিল। সরকারের সদিচ্ছাপ্রসূত সোনালি দিনে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে দেশের বৃহৎ এই কৃষিজাত পণ্যটি। বাঙালির অন্যতম অহংকারের জায়গাটিকে আরো পাকাপোক্ত করতে প্রয়োজন সঠিক তদারকি। পাট নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতসহ রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি পাটকলগুলোতে নিয়োজিত শ্রমিক সমাজের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে পাটে সুদিন ফেরার বিপরীতে দুর্দিন ফিরে আসবে। গুরুত্ব সহকারে চিহ্নিত করতে হবে পাটকল ও পাটচাষিদের সমস্যা। পাটের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র রোধ করতে হবে। বন্ধ পাটকলগুলো চালু করতে হবে। তবেই ফিরে আসতে পারে পাটের সুদিন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

bishwa85@gmail.com

 

"