পর্যালোচনা

স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ডা. সমীর কুমার সাহা

প্রতি বছর ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। ১৯৫০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই দিবসটি পালিত হয়। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকে সামনে রেখে ওই দিন বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়। যদিও প্রতি বছর আমরা এই দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালন করে আসছি, আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে এখনো নানা সমস্যা বিরাজমান, যেমন: দেশব্যাপী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব, চিকিৎসক স্বল্পতা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা ব্যবস্থা। যাদের আর্থিক সচ্ছলতা আছে তারা বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পেলেও ব্যাপক সংখ্যক গরিব মানুষ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি (আয়ুর্বেদ ও ইউনানি) একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। আয়ুর্বেদ হচ্ছে পৃথিবীর প্রাচীন ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি। এটা ব্যক্তির আরোগ্যের ক্ষেত্রে সার্বিক বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, দেহ ও মন তথা সার্বিক সুস্বাস্থ্য রক্ষা করা। আয়ুর্বেদ এখন আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসার হচ্ছে। জটিল-কঠিন রোগ তথা এ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর চিকিৎসায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছেন এই পদ্ধতির মাধ্যমে।

আয়ুর্বেদের লক্ষ্য হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন পদ্ধতির বিষয়ে নির্দেশনা দান করা, যাতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করে চলতে পারেন এবং যারা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন তারা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করতে পারেন। আয়ুর্বেদের উল্লেখযোগ্য প্র্যাকটিসগুলো হলো- ধ্যান (মেডিটেশন), যোগ ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ব্যায়াম (প্রাণায়াম), পঞ্চকর্ম এবং বিভিন্ন হার্বস বা ওষুধ।

আয়ুর্বেদে খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও জীবনযাপন পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং মন ও শরীরের সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আয়ুর্বেদ একটি প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে মন, শরীর, আচরণ ও পরিবেশের বিষয়টি ব্যাপক একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করে সুস্থতা অর্জনে সহায়তা করা হয়। আয়ুর্বেদে বলা হয়, মন, শরীর ও আত্মার ভারসাম্য রক্ষার ওপর মানুষের সুস্থতা নির্ভর করে। আয়ুর্বেদকে জীবনের বিজ্ঞান বলে অভিহিত করা হয়, যেটা কিনা প্রকৃতি এবং জীবনের সব দিক নিয়ে আলোচনা করে।

প্রাকৃতিক এই চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের সার্বিক ব্যবস্থার একটি ধারণা দেয়, যা আমরা স্বাস্থ্যকর খাদ্য, ওষুধ ও ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারি। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে, অনেক আধুনিক ওষুধ প্রাকৃতিক এই ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিকে অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে।

অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ডাক্তার, নার্স ও মিডওয়াইফের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রাকৃতিক চিকিৎসার কর্মী বাহিনী ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারি আমাদের স্বাস্থ্য খাতে। আমাদের জন্য এখন সময় এসেছে প্রাকৃতিক এই চিকিৎসা পদ্ধতির সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কর্মরত জনশক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আয়ুর্বেদ ও ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আয়ুনস) ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নে কাজ করে আসছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে দেশের সংশ্লিষ্ট তরুণ সমাজের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতার সৃষ্টি ও এই বিষয়ে গবেষণা এবং উন্নয়নের জন্য আয়ুনস ভূমিকা পালন করছে। এ খাতে উন্নয়ন সাধন করা গেলে আমরা স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে পারব। এ জন্য তারা এই চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর আমাদের দেশে ঐতিহ্যগত পদ্ধতির আওতায় অনেক জটিল রোগেরও আরোগ্য করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সবাই যদি এগিয়ে আসেন এবং তাদের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন, তা হলে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে একটি বিপ্লবী ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আয়ুনস

 

"