মুক্তমত

আন্দোলনের নামে সহিংসতা কাম্য নয়

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

পাট এমন একটি পণ্য, যার কিছু ফেলা যায় না, সেটি কেন লোকসান হবে? আমরা পাটে লোকসান শুনতে চাই না। জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে গত ৬ মার্চ, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, পাটকে আমারা আরো কীভাবে কাজে লাগাতে পারি সব সময় এটিই চেষ্টা করে যাচ্ছি। পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়িয়ে এ শিল্পকে লাভজনক করতে বিজ্ঞানীদের প্রতি উন্নত গবেষণা করার আহ্বানও জানান তিনি । তার প্রত্যাশা- এ শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে। লাভের মুখ দেখবে দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প।

এবারের জাতীয় পাট দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সোনালি আঁশের সোনার দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত । কারণ পাটচাষি ও শ্রমিকদের স্বার্থে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন সংগ্রাম করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক ২১ দফায়ও পাট ব্যবসাকে জাতীয়করণের দাবির কথা উল্লেখ ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পাটকলগুলো জাতীয়করণ করা হয় এবং কৃষকের স্বার্থে সরকারীভাবে পাটের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করা হয়।

চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, ৬০ জন যাত্রী আহত, ট্রেনের জানালার কাঁচ ভাঙচুর ও খুলনায় পুলিশ বক্সে হামলার মধ্যদিয়ে পাটকল শ্রমিকদের সারা দেশে ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘট ও অবরোধের সমাপ্তি ঘটে। সচেতন নাগরিকদের মতে আন্দোলনের নামে এ ধরনের সহিংসতা কাম্য নয়। বকেয়া বেতন, মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ ৯ দফা দাবিতে ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘট করেন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্র্রমিকেরা। ২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ধর্মঘটের পাশাপাশি তারা দৈনিক চার ঘণ্টা রাজপথ-রেলপথ অবরোধেরও কর্মসূচি পালন করেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা জোনের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকদের অবরোধের কারণে যানজট ও পরিবহন সংকটে পড়েন কর্মজীবী ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ। গত ২ মার্চ থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছেন সারা দেশের ৭০ হাজার পাটকল শ্রমিক। এর আগে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা বন্ধ করে লাল পতাকা মিছিল করলেও এবার ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘটের পাশাপাশি দৈনিক চার ঘণ্টা করে অবরোধে নেমেছেন তারা। আন্দোলনকারীদের কথাÑ ২০১৫ সালে জাতীয় নতুন পে স্কেল চালুর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে শ্রমিকদের জন্য জাতীয় মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার তিন বছর পরও পাটকল শ্রমিকেরা বর্ধিত বেতন পাচ্ছেন না। অন্যদিকে পাট ক্রয় মৌসুমে অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় পাটকলগুলো কাঁচামাল সংগ্রহ করতে ও বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। এ অবস্থায় তারা দাবি আদায়ে লাগাতার আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ধর্মঘটি শ্রমিকদের কথা- মজুরি বকেয়া থাকায় তারা পরিবারে সদস্যদের নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। সরকার ঘোষিত জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫-এর সুপারিশ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ, গ্র্যাচুইটি ও মৃত শ্রমিকদের বিমার বকেয়া প্রদান, টার্মিনেশন ও বরখাস্ত শ্রমিকদের পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ী করা, পাট মৌসুমে পাট ক্রয়ের অর্থ বরাদ্দ, উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে মিলগুলোকে পর্যাক্রমে বিএমআরই করাসহ ৯ দফা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দাবিগুলো এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় শ্রমিকরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। শ্রমিক নেতাদের কাছ থেকে জানা যায়, গত ১২ মার্চ সারা দেশে শ্রমিকদের ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে বিজেএমসির চেয়ারম্যান পাটকল শ্রমিকদের কাছ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত সময় চেয়ে নেন। এ কারণে ১৯ থেকে ২০ মার্চ ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘট ও প্রতিদিন চার ঘণ্টার অবরোধের পূর্বকর্মসূচি স্থগিত করা হয়। কিন্তু বিজেএমসির চেয়ারম্যানের নেওয়া সময়সীমার মধ্যেও দাবিপূরণ না হওয়াতে ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিকরা। পাটকল শ্রমিক নেতারা বিজেএমসি ভবনে বৈঠক করে আগামীতে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার কথা ভাবছেন।

বর্তমান সরকারের নানা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ সত্ত্বেও লাভের মুখ দেখছে না রাষ্ট্রায়ত্ত ২২টি পাটকল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাটকলগুলো ৪৬৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। আর চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে লোকসান দিয়েছে ৩৯৫ কোটি টাকা। লোকসানের এ অশুভ চক্র থেকে বের হতে না পারায় পাটকলের শ্রমিকদের ৮ থেকে ১০ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া পড়েছে। কর্মচারীরা বেতন পান না তিন মাস ধরে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি পাটকলে লোকসানের বড় কারণ হলো কাঁচাপাট কেনায় অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। পাটকলগুলো পাট কেনে দেরিতে ও বেশি দামে, যখন কৃষকদের কষ্টার্জিত সোনালি আঁশ মজুদ হয় মধ্যস্বত্ব¡ভোগী ব্যবসায়ীদের গুদামে। এতে একদিকে কৃষক পাটের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, অপরদিকে মিলগুলোকেও কোটি কোটি টাকা লোকসানের বোঝা বহন করতে হয়। কাঁচামালের অভাবে মিলে লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক পণ্য উৎপাদিত হয় না। উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। শ্রমিক-কর্মচারীরাও সময়মতো বেতন-ভাতা পান না। বাকি পড়ে অবসরগ্রহণকারী শ্রমিক কর্মচারীদের পাওনা। অবিক্রীত পণ্যের গুদামে স্তূপ জমে। প্রতি বছরই পাটের মৌসুমে কাঁচাপাট কেনার অর্থের জন্য সরকারের কাছে হাত পাততে হয়।

এ ব্যাপারে বিজেএমসির চেয়ারম্যানের ভাষ্য হলো আর্থিক সঙ্গতি না থাকাসহ কয়েকটি কারণে জাতীয় মজুরি স্কেল এতদিন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মোতাবেক এরই মধ্যে পাটকলে মজুরি নির্ধারণের কাজ শুরু হয়েছে। কাজটি শেষ হতে দুই থেকে তিন মাস লাগবে। নতুন কাঠামোতে শ্রমিকদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ হবে। সেই বাড়তি অর্থ সংস্থানে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাটকলগুলোকে লাভজনক করার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। শিগগিরই পাটের সোনালি ব্যাগ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হবে। গত বছর বন্ধ সিরিয়ার বাজারে ২৫ হাজার বেল পাট রফতানির আদেশ পাওয়া গেছে। সুদানের বাজারের সমস্যা সমাধানে কাজ করা হচ্ছে। আশা করা যায়, দুই থেকে চার বছরের মধ্যে অবস্থা ভালোর দিকে যাবে।

গত অর্থবছরে বিজেএমসির আয় ছিল ১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ অর্থাৎ ৬৩৯ কোটি টাকা শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মজুরি ও বেতন বাবদ ব্যয় করা হয়েছে। বর্তমানে শ্রমিকের মাসিক মূল মজুরি ৪ হাজার ১৫০ টাকা। ২০১৫ সালের মজুরি স্কেল বাস্তবায়িত হলে মাসিক নি¤œতম মজুরি হবে ৮ হাজার ৩০০ টাকা। বিজেএমসির সূত্র থেকে জানা যায়, গত দুই অর্থবছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর আয় কমছে। পাট ও পাটপণ্য রফতানি ও স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা আয় করে পাটকলগুলো। পরের অর্থবছরে সেই আয় কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আর গত বছর আয় হয়েছে আরো কম, মাত্র ১ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। শ্রমিকদের বেশি বেতনই পাটকলের লোকসানের বড় কারণ বলে মনে করেন বিজিএমসির কর্মকর্তারা। তবে শ্রমিকের অতিরিক্ত বেতন নয়, বরং কাঁচাপাট ক্রয়ের অনিয়মই পাটকলের লোকসানের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ পাটকল সিবিএ-ননসিবিএ ঐক্য পরিষদের নেতারা। তারা বলেন, ভরা মৌসুমে কাঁচাপাটের মণ ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, তখন বিজিএমসি পাট কিনেনি। দাম বেড়ে যখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে তখন বিজেএমসি পাট কিনেছে। সময়ের পাট অসময়ে কিনতে গিয়েই বিজেএমসিকে কোটি কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে লাভ হবে কীভাবে? গত অর্থবছরে বিজেএমসি ২২টি পাটকলে ২২ লাখ কুইন্টাল কাঁচাপাট কেনার লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৫ লাখ কুইন্টাল কিনতে সক্ষম হয় সংস্থাটি। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭১ শতাংশ পাট কেনে বিজেএমসি। এছাড়া সরকারি পাটকলের উৎপাদনশীলতা কম, উৎপাদন খরচ বেশি, যন্ত্রপাতি পুরোনো এবং বেসরকারি খাতের তুলনায় মজুরি বেশি। দেখা গেছে, সরকারি পাট লে একটন চটের বস্তা তৈরিতে গড়ে ৯০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে বেসরকারি মিলগুলোতে একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করতে শ্রমিক ব্যবহার করা হয় মাত্র ২৫ থেকে ৩০ জন।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ভারত, সিরিয়া, ইরান, মিসর, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, ইরাক, থাইল্যান্ড, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে, রফতানি চাহিদার মাত্র ২৪ শতাংশ পাটপণ্য সরকারি পাটকলগুলো থেকে পূরণ করা হলেও বেসরকারি পাটকলগুলো থেকে বাকি ৭৬ শতাংশ পূরণ করা হয়।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী সংসদে বলেন, দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলে মোট ৩০৭টি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৬টি এবং বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৮১টি। গত ৯ বছরে দেশে বন্ধ হওয়া পাঁচটি পাটকল সরকারীভাবে চালু করা হয়েছে। বিজেএমসির অধীন পাটের মিলগুলোকে লাভজনক করতে সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা রয়েছে। এ জন্য গত ১০ বছরে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পদক্ষেপগুলো হলো- পাটের উৎপাদন বাড়ানো, উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা গ্রহণ, পাটচাষিদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পাট ক্রয় এবং পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থাপনায় পাটকলগুলোকে লাভজনক করতে হলে শ্রমিক সংখ্যা, মিলের আকার ও প্রযুক্তি যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। পণ্য তৈরি করতে হবে চাহিদা অনুযায়ী। সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। এছাড়া সিবিএর দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক দলাদলি বন্ধসহ কাঁচাপাট ক্রয়ে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করার কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সঙ্গে মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন ও অবিলম্বে শ্রমিক-কর্মচারীদের দেনা-পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর

netairoy18@yahoo.com

 

"