পরিবেশ

জলবায়ু হুমকিতে শিশুর ভবিষ্যৎ

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

মোতাহার হোসেন

বাংলাদেশসহ বিশ্বের দেশে দেশে নানা কারণে শিশুদের জীবন ও বেড়ে ওঠা হুমকির মুখে। এটি চিরন্তন সত্য। হাল জামানায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের দেশে দেশে শিশুরা ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপদে নেই। এমনই একসময় এই চিরন্তন হুমকির মুখে নতুন মাত্রায় বাংলাদেশের মানুষকে আতঙ্কিত করার মতো একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। আমরা জানি, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এর মধ্যে জলবায়ু ঝুঁকির কারণে দেশের ১ কোটি ৯০ লাখ শিশুর ভবিষ্যৎ শঙ্কার মুখে। সম্প্রতি জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনিসেফ তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে এ উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে বন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে মানুষ আশ্রয়হীন হচ্ছে। এতে শিশুরা বেশি মাত্রায় ঝুঁকিতে পড়ছে। একই সঙ্গে নানা রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নানা সংকটে শিশুদের প্রাণ দিতে হচ্ছে। আবার কখনো কখনো চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায়ও শিশুরা অকাতরে মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো শিশুদের জন্য নতুন ঝুঁকি বয়ে আনছে জলবায়ু পরিবর্তন। দেশের দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ হুমকিতে পড়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনসহ অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয়ে ১ কোটি ৯০ লাখ শিশুর জীবন হুমকিতে পড়ে যাওয়ার কারণ। প্রকাশিত জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের আবাদযোগ্য জমির লবণাক্ততা, বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে জীবিকার জন্য অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছে। ভরণপোষণ চালাতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক মেয়ে শিশুকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে পরিবার। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু তাদের পরিবারের সঙ্গে শহরে আসছে। এসব শিশু কাজের জন্য ততটা শক্তপোক্ত নয়।

ইউনিসেফের ঢাকার মুখপাত্র জিন জ্যাকস সাইমন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১ কোটি ৯০ লাখ শিশুর মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ শিশু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ তারা নদীভাঙন এলাকা বা এসব অঞ্চলের কাছাকাছি বাস করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্য ৪৫ লাখ শিশু বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। এসব শিশুকে সব সময় ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্কে থাকতে হয়। প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা শিশু যারা শরণার্থী শিবিরে আছে, তারা বাঁশ ও প্লাস্টিকের তৈরি আশ্রয়স্থলে বসবাস করছে। এর বাইরে ৩০ লাখ শিশু যারা দেশের ভেতরে বাস করে, তারা বেশির ভাগ সময় নানা রকম অসুখে ভোগে। এ রকম নানা সংকটের কারণে গ্রাম থেকে পরিবারের সঙ্গে শহরে চলে আসছে শিশুরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬০ লাখ উদ্বাস্তু শিশু রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ দিগুণেরও বেশি হতে পারে।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও উন্নয়ন সংস্থার ফেলো সলিমুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, জলবায়ু বিপর্যয়ে শিশুরা যে হুমকিতে পড়েছে, তা বাস্তব। স্থিতিশীল অবস্থার ভালো রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব বিপজ্জনকভাবেই রয়ে গেছে বলে বাংলাদেশের শিশুরা শারীরিকভাবে দুর্বল। প্রতিবেদনে দেশে আঘাত হানা প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার ইতিহাস রয়েছে এ দেশে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। এ যুদ্ধে বাংলাদেশের জয় হয়। এতে আরো বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এতে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এই ঝড়ে উপকূলীয় অঞ্চল নিমজ্জিত, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং দেশের অভ্যন্তরের পানিতে লবণ ঢুকে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ব্রহ্মপুত্র নদের বন্যায় কমপক্ষে ৪৮০টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ৫০ হাজার টিউবওয়েল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হতো। বন্যায় উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে।

তবে জাতিসংঘসহ বিশ্বব্যাপী অংশীদারদের প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। কারণ ঘূর্ণিঝড়ের সময় আশ্রয় দিতে কয়েক হাজার আশ্রয়কেন্দ্র গড়েছে। এছাড়া ঝড়ের সময় বিপদগ্রস্তদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিতে ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবকের প্রশিক্ষণ দিয়েছে বাংলাদেশ। সারা দেশে বন্যা সুরক্ষা বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ভৌগোলিক কারণে দেশে বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে।

ইউনিসেফ বলছে, ১৯৯০ সালের প্রথমদিকে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ঝুঁকি কমানো কর্মসূচিগুলো দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলে থাকা মানুষকে জলবায়ু বিপর্যয়ের বিপদ থেকে সহনশীল করেছে। অপরদিকে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলেছে, এসব দুর্যোগ সত্ত্বেও বিশ্বের পাঁচটি দ্রুত ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গত দশকে, এর হার বছরে ৬ শতাংশ ছিল। জুনে শেষ হতে যাওয়া চলতি অর্থবছরে এটা বেড়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়াবে।

কিন্তু সরকারের উচ্চাকাক্সক্ষার এজেন্ডা থাকা সত্ত্বেও, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্র উপকূলবতী অঞ্চলে বসবাসকারি পরিবারগুলোকে ক্রমাগত দরিদ্র ও স্থানচ্যুত করছে। ফলে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তাদের বেড়ে ওঠাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশগত হুমকিও বাড়ছে। এগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলোকে। তারা তাদের সন্তানদের যথোপযুক্ত বাসস্থান, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারছে না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এমনি অবস্থায় সরকারকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা উপজেলায় প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ ও দ্রুত তা বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি সহনীয় প্রযুক্তির প্রয়োগ করা এবং এ কারণে সম্ভাব্য রোগব্যাধি থেকে শিশুদের নিরাময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধান করা। এসব করা হলে আমাদের শিশুরা জলবায়ু ঝুঁকির ক্ষতি থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]il.com

"