মতামত

চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম এ হামিদ

দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার সপ্তম বার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত) প্রণয়ন করেছে। ওই পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনাটি একটি ভালো ডকুমেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ওই পরিকল্পনা বইতে ১৩টি চাপ্টার রয়েছে। বর্ণিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ধারিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য দেশে যথার্থ দক্ষ জনবলের (উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নপর্যায় পর্যন্ত) তীব্র সংকট রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পার্শ¦বর্তী দেশ থেকে লাখ লাখ দক্ষ জনবল আমদানি করতে হচ্ছেÑ এতে চলে যাচ্ছে ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ঝঙ্কার শোনা যাচ্ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যাত্রায় পথচলা শুরু করেছে, আবার কোনো কোনো দেশ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। বাংলাদেশ বাধ্য হয়েই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্চ মোকাবিলা করতে হবে- না হয় ছিটকে পড়তে হবে উন্নয়নের ধারা থেকে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত তিনটি শিল্পবিপ্লব পাল্টে দিয়েছে সারা বিশ্বের গতিপথ ও জীবনধারা। প্রথম শিল্পবিপ্লবটি হয়েছিল ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে। এরপর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ ও ১৯৬৯ সালে ডিজিটাল ইলেকট্রনিক্সের আবিষ্কার ও প্রচলন শিল্প বিপ্লবের গতিকে বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। তবে আগের তিনটি বিপ্লবকে ছাড়িয়ে সারা দুনিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করে নবরূপে আবির্ভূত হয় ইন্টারনেট প্রযুক্তি। এই ইন্টারনেট প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মেশিন লার্নিংয়ের কল্যাণে এখন যে বিপ্লব শুরু হয়েছে তাকেই বলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব।

এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ভিত্তির ওপর শুরু হওয়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লব তথা ডিজিটাল এ বিপ্লবের ফলে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে গাণিতিক হারে, যা আগে কখনো হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে এ পরিবর্তন প্রভাব ফেলছে, যার ফলে পাল্টে যাচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা, এমন কী রাষ্ট্র চালানোর প্রক্রিয়া। আইডিইবি আইসিটি ও ইনোভেশন সেলের প্রধান উপদেষ্টা ড. মো. শাহ আলম মজুমদারের ভাষায় চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হচ্ছে ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্মিত মানব সভ্যতার নতুন একটি যান্ত্রিক অনুভূতিপ্রবন সিস্টেমে পদার্পন, যা একগুচ্ছ ইমার্জিং টেকনোলজি সমন্বিত ও নিখুঁত ক্রিয়াকলাপের ফল। এটা ইন্টারনেটের কল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিং লার্নিং, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিউরো-প্রযুক্তির নিত্য নতুন ক্ষমতার প্রকাশ আর প্রচলিত কর্মযজ্ঞের অবলুপ্তির ভীতি মিশ্রিত এক নবতর জগত। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শ্রমবাজার আর ভবিষ্যতের কাজকর্মের ধরন, আয়ের অসমতা, ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের কাঠামোকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করছে এবং করবে। সারা বিশ্বের আলোড়নের ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। ডিজিটাল বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।

‘ইন্টারনেটের আবির্ভাব এবং বহুমুখী ব্যবহারের ফলে এরই মধ্যে ব্যক্তিজীবন, সমাজ এবং রাষ্ট্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। হাভাস মিডিয়ার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট টম গুডউইন পরিবর্তিত ব্যবস্থাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাক্সি কোম্পানি উবারের নিজের কোনো ট্যাক্সি নেই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিডিয়া ফেসবুক নিজের কোনো কনটেন্ট তৈরি করে না, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাইকার কারবারি প্রতিষ্ঠান আলীবাবার নিজস্ব কোনো গুদাম নেই এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রোভাইডার এয়ার বিএনবির নিজেদের কোনো রিয়েল এস্টেট নেই।’ সত্যিকারের অর্থে তাবৎ দুনিয়ার ব্যবসা বাণিজ্যের তত্ত্ব ও কৌশলের ধারণাই পাল্টে দিয়েছে আর এসব কারণে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস সোয়াব প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে দেখছেন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হিসেবে।

আমরা চাই বা না চাই, এতদিন পর্যন্ত আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম, চিন্তা-চেতনা যেভাবে চলেছে সেটা এখন বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিকমিউনিকেশনে আসছে বিশাল পরিবর্তন। প্রযুক্তির এই স্তরে ২০৩০ বা ২০৪১ সালের শিল্পব্যবস্থাায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির স্থানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, রোবোটিকস, জৈব প্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। যুগের সঙ্গে তাল মিলাতে বাংলাদেশকেও প্রযুক্তির এই বিশাল পরিবর্তন সাদরে গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। দক্ষ ও উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এ ব্যাপারে দেশময় কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর সমাজব্যবস্থায় দক্ষ মানুষ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি নির্ভরতা ছাড়া আমাদের দুটি ভিশনের কোনোটিই অর্জন সম্ভব নয়। আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর যথাযথ কৌশল অবলম্বন ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও সম্ভব হবে না।

ওপরের চিত্র থেকে এটা পরিষ্কার যে, একদিকে দেশে দেশে চলছে কর্মীর কাজ হারানোর ঝুঁকি। অন্যদিকে চলছে মারাত্মক দক্ষতা সংকট। মনে রাখতে হবে, উন্নত বিশ্বের দেশগুলো কর্মক্ষম দক্ষ জনবলের সংকটে নিমজ্জিত হয়ে অনন্যোপায় হয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নব নব আবিষ্কারকে স্বাগত জানাচ্ছে, জীবনকে আরো গতিশীল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার জন্য। অন্যদিকে, আমরা এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের অনন্য সোনালি সুযোগের মোক্ষম সময়ে অবস্থান করছি। ২০৩০ সাল যেমন জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আন্তর্জাতিক বছর। তেমনি বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ডের অনন্য সোনালি সুযোগের মোক্ষম সময়ে অবস্থান করছে। ২০৩০ সাল যেমন জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আন্তর্জাতিক বছর। আবার সেই বছরটিই আমাদের সর্বোচ্চ কর্মক্ষম মানুষের দেশ (১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের মানুষ) বা সর্বনিম্ন নির্ভরশীল মানুষের দেশ হওয়ার বছর। এ সুযোগকে আমরা বলি ‘গোল্ডেন অপোরচুনিটি ফর বাংলাদেশ’। এ গোল্ডেন অপোরচুনিটিকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত কৌশলগত শ্রমশক্তি পরিকল্পনা যার ছয়টি স্তর হচ্ছে- ১. কৌশলগত দিক-নিদের্শনা প্রদান। ২. কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যোগ্য জনবলের সরবরাহ বিশ্লেষণ। ৩. কর্মসংস্থানের চাহিদার বিশ্লেষণ। ৪. সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান বিশ্লেষণ। ৫. সমাধান সূত্রায়ন, প্রয়োজনীয় ইন্টারভেনশন এরিয়া ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণসহ বাস্তবায়ন। ৬. বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ। কৌশলগত কর্মসংস্থান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গভর্নেন্সের ত্রিমাত্রিক অনুশীলন এখন সময়ের দাবি। গভর্নেন্সের তিনটি মাত্রা বা ডাইমেনশন রয়েছে- যেমন : ক. ইন্সট্রুমেন্ট। খ. ইন্সট্রুুমেন্সগুলোকে কার্যকরণের জন্য প্রোগ্রাম তৈরি/কর্মসূচি প্রণয়ন/প্রজেক্ট প্রণয়ন। গ. ওই প্রোগ্রাম/কর্মসূচি/প্রজেক্ট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উৎপাদন বা সেবার নির্ধারিত মান যথোপযুক্ত সময়ে নিশ্চিত সমৃদ্ধি তরান্বিত করা। ঝঃৎধঃবমরপ ডড়ৎশভড়ৎপব চষধহ এর ছয়টি স্তরের মধ্যে প্রথম স্তরটি বাস্তবায়নে এরই মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত হয়েছে। যা বহুল আলোচিত ভিশন-২০২১ ও ভিশন-২০৪১। এদিক নির্দেশনা সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সংস্থা এবং শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মিশনগুলো নির্ধারণের জন্য টিভিইটি এনরোলমেন্ট ২০২০ সালে ২০ শতাংশ, ২০৩০ সালে ৩০ এবং ২০৪০ সালে অন্তত ৪৫ শতাংশে উন্নীত করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপযোগী টিভিইটি গ্র্র্যাজুয়েট তৈরি ও শ্রমবাজারে যুক্ত করার কার্যক্রম জোড়দার করতে হবে।

ঝঃৎধঃবমরপ ডড়ৎশভড়ৎপব চষধহ -এর অন্যান্য স্তর তথা শ্রমশক্তির চাহিদা নিরুপণ, সরবরাহ বিশ্লেষণ ও ব্যবধান নির্ণয়। এ ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের এতদ্সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা, ২০৩০ এ সর্বোচ্চ সংখ্যক কর্মক্ষম জনশক্তির পটেনশিয়ালিটি এবং উন্নত দেশগুলোয় জনসংকট ও স্কিল ক্রাইসিসের সুযোগ গ্রহণের লক্ষ্যে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য অকুপেশনভিত্তিক চাহিদা নিরুপণ, সে অনুযায়ী জনসম্পদের সরবরাহ বিশ্লেষণ এবং তদ্বপ্রেক্ষিতে যোগ্যতা ও দক্ষতার ঘাটতি নির্ণয় করার জন্য শ্রমশক্তির একটি ফোরকাসটিং রিপোর্ট তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য বিদ্যমান শ্রেণিবিন্যাসকৃত জনবল কাঠামো ঘঞঠছঋ এর হরাইজন্টাল ও ভার্টিক্যাল এক্সপানশন তথা ইছঋ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষে দেশের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীকে যোগ্য করে তোলার একটি রোডম্যাপ আইডিইবি এরই মধ্যে প্রণয়ন করে সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে। যা এ স্তরের জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। পলিসি, পরিকল্পনা ও প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ইঁরষফ ঝশরষষ ইধহমষধফবংয গবেষণা বইটিতে ১৪টি সাধারণ ও পাঁচটি শিক্ষা প্রযুক্তিবিষয়ক আইন প্রণয়ন এবং আইনের দ্বারা সংশ্লিষ্ট ১৪টি সংস্থা গঠনের সুপারিশ আছে।

কার্যত এই সুপারিশের ভিত্তিতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখনই দেশের চাহিদা ও প্রযুক্তিভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরিবিষয়ক শিক্ষার কোর্স চালু করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করা ও আর্থিক খাতকে সাইবার নিরাপত্তা প্রদানের জন্য তৈরি করতে হবে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এজন্য প্রয়োজন হাজার হাজার আইসিটি ও সাইবার নিরাপত্তা কর্মী ও ব্যবস্থাপক। এজন্য এখনই কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে তথ্য প্রযুক্তিমনস্ক করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই সম্ভব হবে অতিরিক্ত কর্মক্ষম জনমানবকে কাজে লাগানো আর মোকাবিলা করা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ। যার মাধ্যম গড়ে তোলা সম্ভব উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

লেখক : সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি

আইডিইবি, ঢাকা

"