মুক্তমত

সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় গণহত্যা

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা অঙ্কুরে বিনাশ করতে চেয়েছে নজিরবিহীন গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে। গণহত্যা ঢাকা থেকে ছড়িয়ে পরবর্তী ৯ মাসে সমগ্র বাংলাদেশে অব্যাহত ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ কিংবা আরো বেশি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের অধিক বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক হাজার বধ্যভূমি চিহ্নিত। আফসোসের বিষয় স্বাধীনতার ৪৮ বছরে এই বধ্যভূমিগুলো অরক্ষিত রয়ে গেছে। অরক্ষিত উল্লেখযোগ্য বধ্যভূমিগুলো নিয়ে এই ধারাবাহিক রচনা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ একটি অভিশপ্ত রাত। ওই রাতে শুরু হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতম গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও ২২ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা ২৫ মার্চ রাত ১২টার আগে একযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দফতর ও অন্যান্য স্থানে পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র ও নিরীহ বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করতে শুরু করে।

অন্যান্য এলাকার মতো ১৯৭১ সালের ২৫ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা সদরঘাট এলাকায় তান্ডবলীলা ও গণহত্যা চালিয়েছিল। এলাকাবাসী জানান, ওই রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সদরঘাট এলাকায় অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। পুরান ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্কের কাছে পৌঁছার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল শাঁখারীবাজারের দিকে, আরেকটি দল সদরঘাটের দিকে অগ্রসর হয়। নর্থব্রুক হল রোড দিয়ে বাংলা বাজারের মেহেরবান হোটেলের কাছে তারা একজন মাঠাওয়ালাকে গুলি করে হত্যা করে। তারপর শুরু হয় প্রচন্ড গুলির আওয়াজ।

পাকিস্তানি সৈন্যরা গাড়ি থেকে নেমে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে তৎকালীন কায়েদে আযম ফিজিক্যাল ক্লাবের (পরবর্তীকালে নবযুগ শরীরচর্চা কেন্দ্র) পাশে অবস্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের ছাউনির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তারপর তারা একত্রিত হয়ে তাদের অপারেশন শুরু করে। পাকিস্তানি সৈন্যরা জুবিলি স্কুল, মুসলিম হাইস্কুল ও জগন্নাথ কলেজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালায়। সেখানে কোনো ছাত্রকে না পেয়ে তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ভাড়ায় চালিত হলুদ ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এসে গাড়িগুলোর ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে। সেখানে প্রায় ২৫টি হলুদ ট্যাক্সি ছিল। কয়েকটি গাড়ির মধ্যে চালক অবস্থান করছিলেন, তারা প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বাহাদুরশাহ পার্কের কাছে পাঁচটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং সেই বাসের ভেতরে অবস্থানরত বেশ কিছু মানুষ জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।

কিছু পাকিস্তানি সৈন্য পাটুয়াটুলি রোড ধরে ওয়াইজঘাট বুলবুল ললিতকলা একাডেমির (বাফা) কাছ দিয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের দিকে অগ্রসর হয়। তখন মাত্র ভোরের হালকা আলো ফুটে উঠছিল। ঢাকা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে প্রতি রাতে হাজার হাজার মানুষ অবস্থান করত। তাদের মধ্যে ছিলেন লঞ্চের অনেক যাত্রী ও স্টাফ, কুলি, ভিক্ষুক, হকার, ছিন্নমূল মানুষ। অন্যান্য দিনের মতো তাদের মধ্যে অনেকেই টার্মিনালের অভ্যন্তরে শুয়েছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ওপরে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। কিছু মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিল। কতক মানুষকে এই স্থানে হত্যা করা হলো তার কোনো হিসাব রইল না।

সদরঘাটের এই গণহত্যার তথ্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বসহকারে লিপিবদ্ধ ও প্রচারিত হয়নি। এ গণহত্যার তথ্য একটি শহীদ মিনারে লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন, যেন জাতি জানতে পারে কীভাবে এ দেশের সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও কলামিস্ট

 

"