পর্যালোচনা

অভিজাত ও বাণিজ্যিক কৃষিই গন্তব্য

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি এবং বার্ষিক খাদ্য উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। তখন ৮০ ভাগ লোক গ্রামে বাস করত এবং প্রায় শতভাগ লোকের পেশা ছিল কৃষি। স্বাধীনতার ৪৯ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৬ কোটি। তার পরও দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। মোট শ্রমশক্তির শতকরা ৪০ ভাগ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য, পুষ্টি ও শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎসও কৃষি। দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান ও রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষিকে কেন্দ্র করেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে।

৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তার ইচ্ছে ছিল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এবং শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার। তিনি বলতেন, ‘এই স্বাধীন দেশে মানুষ যখন পেটভরে খেতে পাবে, পাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন; তখনই এ লাখো শহীদের আত্মা শান্তি পাবে।’ সে কারণেই স্বাধীনতার পর তিনি ডাক দিয়ে ছিলেন সবুজ বিপ্লবের এবং কৃষিকে দিয়ে ছিলেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কৃষকের মঙ্গলের কথা ভেবে তিনি ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা রহিত করেছিলেন। পাকিস্তান আমলের ১০ লাখ কৃষকের নামে দায়ের করা সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার এবং সুদসহ সমুদয় কৃষিঋণ মওকুফ করে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ভালোভাবেই জানতেন, কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়; সম্ভব নয় তার স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তবায়ন। কৃষির কাক্সিক্ষত উন্নয়নের জন্য এ পেশায় মেধাবী মানুষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাই কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজে মেধাবী ছাত্রদের আকর্ষণ করতে তিনি কৃষিবিদদের সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করেন। কৃষিকাজে জনগণের অধিকতর সম্পৃক্ত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে জাতীয় কৃষি পুরস্কার প্রবর্তন করেন। তিনি কৃষি উন্নয়ন, গবেষণা ও আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনসহ অনেক নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। এতে কৃষিবিষয়ক শিক্ষা ও প্রযুক্তিচর্চায় মেধা আকর্ষণের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ওইসব সাহসী পদক্ষেপের জন্যই দেশের মেধাবী সন্তানরা আগ্রহী হয়ে উঠেন কৃষির মতো একটি মহৎ পেশায়। তারই ফলে আজ কৃষি গবেষণা, কৃষিশিক্ষা ও কৃষি সম্প্রসারণে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের অদম্য অগ্রযাত্রা।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে অদ্যাবধি বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাস্তব ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে সারের দাম চার দফা কমিয়ে প্রতি কেজি টিএসপি ৮০ থেকে ২২ টাকা, এমওপি ৭০ থেকে ১৫ টাকা, ডিএপি ৯০ থেকে ২৫ টাকায় নির্ধারণ। সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতে আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত এসব খাতে মোট ৬৫ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা আর্র্থিক সহায়তা প্রদান , যার মধ্যে সার খাতেই সহায়তা প্রদান করা হয়েছে ৫৮ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন বাবদ ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান। কৃষকদের মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া। ২ কোটি ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন কৃষকের মধ্যে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ। ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার লক্ষ্যে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে দেশের হাওর ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় কৃষকের জন্য ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকার জন্য ৫০ শতাংশ হারে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সরকারি আর্থিক সহায়তা । এ পর্যন্ত এ খাতে ২২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে কৃষিতে অর্জিত হয়েছে অভাবনীয় সফলতা। ফসলের জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে প্রথম। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ২০টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত বাংলাদেশ পেরিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সফলতার সঙ্গে আবাদ হচ্ছে। সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়, চাল ও মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে সপ্তম ও আম উৎপাদনে অষ্টম। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ৪ কোটি ১৩ লাখ ২৫ হাজার টন দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণততা অর্জন। একই সময়ে দেশে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৫৪ হাজার টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে অথচ ২০০৬ সালে দেশে শাকসবজির উৎপাদন ছিল মাত্র ২০ লাখ ৩৩ হাজার টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ১২ লাখ ৮৮ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়। শাকসবজি ও ফলমূলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য রফতানি করে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬৭৩ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলার আয় করে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের কৃষিতে যেমন সফলতা ও সম্ভাবনা আছে; তেমনি রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাসহ নানা রকমের চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জগুলো হলোÑ এক. শস্য রোপণ, পরিচর্যা ও কর্তনকালে কৃষিশ্রমিকের অভাব। দুই. কৃষিপণের ন্যায্যমূল্যের অনিশ্চয়তা। তিন. কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাব। চার. ত্রুটিপূর্ণ বাজারব্যবস্থা। পাঁচ. উত্তম কৃষিচর্চার অভাব। ছয়. কৃষিতে বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততা। সাত. কৃষিপণ্য রফতানিতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব ইত্যাদি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকেই ২০১১ সালে বিশ্বে নগরবাসীর সংখ্যা গ্রামবাসীর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৫১ দশমিক ৩ ভাগ লোক নগরে বসবাস করে। আগামী ২০৫০ সালে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ ভাগ লোক নগরে বসবাস করবে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৫ কোটি লোক নগরে বসবাস করে। ২০২০ সালে ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৮ দশমিক ৫ কোটি লোক এবং ২০৫০ সালে দেশের শতভাগ লোক অর্থাৎ ২১ কোটি ৫০ লাখ লোক নগরে বসবাস করবে। তখন গ্রাম বলে কিছুই থাকবে না। শহরের সব সুবিধাই পৌঁছে যাবে গ্রামে। নগরই হবে মানুষের স্থায়ী ঠিকানা। তাই এখন থেকেই গ্রামীণ কৃষির পাশাপাশি নগরবাসীর প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য, ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, মাংস নগর ও তার আশপাশে উৎপাদনের জন্য পরিবেশবান্ধব নগরীয় কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় দেশের দূর-দূরান্ত থেকে খাদ্য পরিবহন করে অথবা বিদেশ থেকে খাদ্যসামগ্রী আমদানি করে নগরবাসীর খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। সম্ভব হবে না নগরবাসীর দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা।

এখন কৃষি শুধু ধান, পাট ও আখ চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফলমূল, শাকসবজি ও ঔষধি উদ্ভিদের মতো মূল্যবান ফসলের চাষ, কৃষক পর্যায়ে উন্নত মানের বীজ উৎপাদন, মাশরুমের চাষসহ কৃষি আজ বিস্তৃত হচ্ছে সম্ভাবনাময় সব সেক্টরে। যোগাযোগও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে গ্রামে গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে হাঁস, মুরগি, গবাদিপশু ও দুগ্ধখামার। স্থাপিত হচ্ছে ফুল, ফল ও বনজবৃক্ষের চারা উৎপাদনের জন্য প্রচুর নার্সারি। কোথাও হচ্ছে কুয়েল ও টার্কি পালনের মতো ছোট ছোট বিদেশি প্রাণী পালনের খামার। স্ট্রবেরি ও ড্রাগনের মতো বিদেশি ফলেরও চাষ হচ্ছে দেশের কোনো কোনো স্থানে। আম্রপালি, বারি আম-৪, বারি আম-১১ জাতগুলা দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ফলচাষিদের কাছে। মাত্র তিন বছরে ফল উৎপাদনে সক্ষম ভিয়েতনামি খাটো জাতের নারিকেল; সিয়াম গ্রিন কোকোনাট ও সিয়াম ব্লু কোকোনাটের চাষ দেশের দক্ষিণ অঞ্চলসহ সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেশের বহু জায়গায় অত্যন্ত লাভজনকভাবে চাষ হচ্ছে আপেলকুল, বাউকুল, থাই পেয়ারা, রেড লেডি জাতের হাইব্রিড পেঁপে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও রাজশাহীসহ দেশের অনেক স্থানে ফ্রুট ব্যাগিং-এর মতো নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষক বিষমুক্ত গুণগত মানের নিরাপদ ফল উৎপাদন করছেন। কোথাও কোথাও ব্রকলি ও স্কোয়াশের মতো বিদেশি সবজি উৎপাদন করছেন কৃষক। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রেণু থেকে পোনা, ডিম থেকে হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করে দেশের অনেক যুবক গ্রামীণ অর্থনীতিতে রাখছে উল্লেখযোগ্য অবদান। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মাছের খাবার এবং ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গ্রামের উদ্যোগী যুবকরা। ভালুকার নিশিন্দার মতো নিভৃত গ্রামে পলিহাউসে উৎপাদিত হচ্ছে বিশ্বমানের জারবেরা ফুল। কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে গ্রামীণ মহিলাদের। তাই আমরা অনায়াসে বলতে পারি, বাংলাদেশ আজ খোরপোষের কৃষি থেকে এক অভিজাত বাণিজ্যিক কৃষির দিকে যাত্রা করেছে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর

[email protected]

 

"