পর্যালোচনা

সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়

পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপ বিচ্ছিন্ন গোলযোগের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১০ মার্চ। সামনে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের আরো নির্বাচন অপেক্ষা করছে দেশবাসীর জন্য। প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচন মানুষের মাঝে কিছুটা উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। সংবাদপত্রের ভাষা বলছে, ব্যালট পেপার ছিনতাই, কেন্দ্র দখল ও ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের অনিয়মের কারণে ছয়টি উপজেলার ২৮ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ১০ মার্চের উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৬৪ উপজেলার ফল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে ৪২ উপজেলায় আর দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ২২টিতে। বাকি চারটিতে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। সবকিছু মিলে নির্বাচন তেমন জমে উঠেনি। ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক ছিল না প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায়। নির্বাচন যতটুকু আনন্দঘন ও অংশগ্রহণমূলক হওয়ার কথা, বাস্তবে তেমনটা না হলেও ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের নিয়মবহির্ভূত প্রচার-প্রচারণা উদ্বেগের জন্ম দিয়ে গেছে।

দেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অন্য সমমনা দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় জনমনে একটু অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। তবে তার চেয়ে বড় অসন্তোষের কারণ হচ্ছে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার মানসে পছন্দসই প্রার্থীর বিজয় ছিনিয়ে আনার অতি উৎসাহী কর্মকান্ড ভাবনায় ফেলে দিয়েছে ভোটারসহ সচেতন মানুষকে। কারণ অনেক এলাকায় ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্যদের অধিক ওকালতিতে আওয়ামী লীগ নীতিনির্ধারণী পর্যায় তার ব্যক্তিগত পছন্দের তৃণমূল দলবিচ্ছিন্ন জনসম্পৃক্ততাহীন অযোগ্য প্রার্থীর হাতে নৌকা তুলে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জোরজবরদস্তি জালভোটের অপকর্ম করতে পিছপা হবে না এমপি বলয়ের ওই মানুষরাÑ এমনটি ধারণা করছে নির্বাচনী এলাকার অধিকাংশ মানুষ। জনগণের উৎকণ্ঠিত এ ধারণা যে একেবারে মিছে নয়, তা এমপি অনুগতদের কথাবার্তা ও আচার-আচরণেই প্রতীয়মান হয়েছে।

ধরে নেওয়া যাক, সুরমাচর একটি উপজেলা। বজলু বিন বাহাদুর ও মছদ্দর মিয়া মামুন এখানকার নির্বাচনে শক্তিশালী চেয়ারম্যান প্রার্থী। বজলু বাহাদুর ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত এবং মছদ্দর মামুন একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। আর আলাউল গনি আবুল সেখানকার সংসদ সদস্য। তার একান্ত বাসনা বজলু বাহাদুরকে উপজেলার মসনদে অধিষ্ঠিত করে ক্ষমতার পথকে আরো প্রশস্ত করা। যার অভিপ্রায় মছদ্দর মিয়াকে ছলেবলে কূটকৌশলে পরাজিত করতে সংসদ সদস্য আলাউল ও তার সঙ্গীয়রা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনটা যেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বজলু বাহাদুরের নয়। সুরমাচরের আসন্ন এ নির্বাচন হয়ে উঠেছে সংসদ সদস্য মহোদয়ের। তার সর্বসহায়তা সম্বলিত দৌড়ঝাঁপ দেখলে বোঝা যায় নির্বাচনে প্রার্থী বজলু বেটা আর জয় পেতে মুখিয়ে আছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলাউল গনি আবুল।

একজন পোড় খাওয়া সর্বজনস্বীকৃত ক্ষমতাসীন দলের দুর্দিনের সহযাত্রী, দীর্ঘ রাজনীতির পথচলায় ভিন্ন কোনো দলের পেছনে ছোটা দলছুট রাজনীতি যাকে স্পর্শ করেনি, সেই মছদ্দর মিয়া মামুনকে পরাজিত করে নিজের ক্ষমতা আরো পাকাপোক্ত করতেন। টাকার জোরে আচমকা উঠে আসা স্থানীয় সংসদ সদস্য আলাউল গনি, যার হাল ধরেছেন তার ক্ষমতাসীন দলে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা আছে কিংবা দলে কোনো পদপদবি আছে কি না, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। সময়ে সময়ে রাজনীতির খোলস পাল্টানো ওই দল সমর্থিত নেতা শুধু সংসদ সদস্য আলাউলের মন্দমৌন প্রচেষ্টায় বনে যান ক্ষমতাসীন দলের প্রতীক পাওয়া শক্তিশালী প্রার্থী। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য আলাউল কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন নিজের আধিপত্য বিস্তারে আরেক ধাপ এগিয়ে যেতে। অন্যদিকে আপাদমস্তক দলপ্রিয় নেতা মছদ্দর মিয়া তাদের অর্থবিত্ত পেশিশক্তির অপরাজনীতি চর্চা এবং দল অবমূল্যায়নে ব্যথিত হয়ে মাঠে নামেন বিদ্রোহী চাদর গায়ে জড়িয়ে। একনিষ্ঠ রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় পছন্দনীয় প্রতীক নিজের নামে আনতে সর্বশেষ তিরস্কৃত হলেও দমে যাননি সরকার দলের পরীক্ষিত নেতা মছদ্দর মিয়া মামুন। বরং তিনি স্বরূপে ফিরেছেন নির্বাচনী মাঠে।

দল দুর্দিনে জেল-জুলুমের শিকার হয়েও দলবিমুখ না হওয়া সুরমাচরের এই পরীক্ষিত নেতা নির্বাচন জয়ের বিজয়ী মুকুট মাথায় পরে জবাব দিতে চান নিজ দল ও বিরোধী বলয়কে। যারা তার ছায়াতলে থেকে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে তারা আজ স্থানীয় সংসদ সদস্য আলাউল গনি আবুলের অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার মোহে আসক্ত হয়ে পথ ধরেছেন বিপরীতমুখী রাজনীতির সুবিধাবাদী দলে। এ অবস্থায় তৃণমূলের দল শক্তিশালী সমর্থন ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা বিদ্রোহী প্রার্থী মছদ্দর মিয়ার মূল ভরসা। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের পদবিধারী অবমূল্যায়িত এ জাদরেল নেতাকে ভোটে হারাতে সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চাইছেন দলীয় সংসদ সদস্য ও তার সাঙ্গপাঙ্গ গোষ্ঠী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় আজকের ক্ষমতাশালী এ সংসদ সদস্য একসময়ে বর্তমান বিদ্রোহী প্রার্থীর রাজনীতি মন্দিরে মাথা টুকেছেন বারবার। আনকোড়া অরাজনীতিক সংসদ সদস্য আবুল (যখন তিনি নতুন সংসদ সদস্য) আজকের বিদ্রোহী প্রার্থী মছদ্দর মিয়ার কাছ থেকেই রাজনীতির স্থানীয় পথঘাট আয়ত্ত করেছেনÑ এমনটাই বলে আসছে সুরমাচরের রাজনীতি সচেতন মানুষ। কিন্তু আজ স্বার্থহানি হওয়ায় ওই এমপি এলাকার বিতর্কিত সুযোগ সন্ধানী ভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী নেতাকর্মী নিয়ে সরকারদলীয় প্রার্থী বজলু বিনের নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন। তার এ তৎপরতা দেখে সাধারণ মানুষ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। (এ গল্পের স্থান, চরিত্র ও বর্ণনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক)।

কাল্পনিক এ বাস্তবতা দেশের প্রায় অধিকাংশ অঞ্চলে। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসীন হওয়া বর্তমান সরকারের কিছু কিছু এমপি চাইছেন মঞ্চের ভেতর-বাইরে দুটোই জয় করতে। সংসদ নির্বাচনে লাখো ভোটের ব্যবধানে প্রশ্নবিদ্ধ জয় ছিনিয়ে এনে রাজনীতিবিচ্ছিন্ন আলাউল গনি আবুলদের অনৈতিকতার পাসপোর্ট তুলে দেওয়া হয়েছে কি না, সেটা ভেবে দেখতে হবে। নইলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় একটি নির্বাচনে এদের প্রভাব থাকবে কেন? উপজেলা নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা নিজ অনুগতদের যেকোনো উপায়ে নির্বাচিত করতে চাইছেন। এমন সংবাদ পত্রিকান্তরে প্রকাশ হয়েছে। জাতীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে যেন ‘শাঁখের করাতে’ পড়েছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলটির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা চাইছেন স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন যেকোনো মূল্যে জমজমাট ও প্রভাবমুক্ত করতে। কিন্তু বিএনপি না থাকায় সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই নির্বাচন জমাতে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন দিলেও বঞ্চিতদের ব্যাপারে ‘নমনীয়’ থাকবে আওয়ামী লীগ। এর অংশ হিসেবে কেন্দ্র থেকে অলিখিতভাবে চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানের কথাও জানানো হয়েছে। তবে কেন্দ্রের এমন কৌশলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলীয় সংসদ সদস্যরাই। একই সংবাদের অপর এক অনুচ্ছেদে বলা হয়, আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য জানান, কোনো উপজেলায়ই চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থী রাখতে চান না স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। তারা ভাইস চেয়ারম্যান এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদেও তাদের অনুগত প্রার্থী রাখার পক্ষে। কিন্তু একতরফা নির্বাচন হলে দলকে পড়তে হবে সমালোচনার মুখে। তিনি বলেন, ‘আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি উপজেলা নির্বাচন হবে প্রভাবমুক্ত। ইতোমধ্যে জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সরকারের এ অবস্থান জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের সংসদ সদস্যরা উপজেলা নির্বাচন একতরফা চাইছেন।’ অভিযোগ আছে তারা নিজেদের ‘বৃত্তের বাইরে’ কোনো প্রার্থীকেই মাঠে থাকতে দিতে চাইছেন না। তিনি চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান আর মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানÑ যে পদেই লড়তে চান না কেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ওই নেতারা জানান, বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে সংসদ সদস্যদের পছন্দের প্রার্থী পরাজিত হতে পারেন এবং এলাকায় তাদের আধিপত্য খর্ব হতে পারেÑ মূলত এমন আশঙ্কায় বিদ্রোহী প্রার্থী চান না তারা। তাই একতরফা নির্বাচন চাইছেন, যাতে ‘নিজের লোকের’ জয় নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে না হয়।

আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা পছন্দসই প্রার্থীর পক্ষে যেভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। বিএনপি নির্বাচনে না আসায় উপজেলা নির্বাচনের মাঠ ক্ষমতাসীনদের দখলে চলে গেছে। দেশের প্রায় সব উপজেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রার্থী ছাড়াও স্বতন্ত্র কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থীও প্রায় একই দলের হওয়ায় নিজেদের মধ্যেই নির্বাচনী প্রতিযোগিতা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। যেহেতু একই দলের দুই প্রার্থী, সেহেতু নির্দিষ্ট কারো পক্ষে যদি সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা অযাচিত বাহাদুরী দেখায়; তাহলে প্রশ্ন উঠবে বৈকী। ক্ষমতার পঙ্কিরাজ ঘোড়াটিকে যত দ্রুত সম্ভব বশে আনতে হবে। খামখেয়ালিপনায় ভেসে গেলে চলবে না। সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো মানুষই অহেতুক কর্মকান্ড সমর্থন করে না। আর দলপ্রিয় প্রকৃত আওয়ামী লীগারদের ধরে রাখতে হবে। কারণ এরাই দলের দুঃসময়ে এগিয়ে আসবেন। মনে রাখতে হবে, সুযোগ সন্ধানী সুবিধাবাদী দলছুট ১০০ জনের চেয়ে দলপ্রিয় একজনও শ্রেয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় প্রকৃত মুজিব সৈনিকদের বিকল্প নেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

"