মতামত

সুশৃঙ্খল জীবন গড়তে স্কাউটিং

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

সতীর্থ রহমান

স্কাউটিং হচ্ছে এমন একটি প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে (ষষ্ঠক/উপদল) পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল, সৎ, চরিত্রবান ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। শিশু-কিশোর ও যুবদের জন্য প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি স্কাউটিং একটি সম্পূরক শিক্ষাব্যবস্থা। তাদের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিজীবনে তার ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের শারীরিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে। স্কাউটিং শিশু-কিশোর ও যুবদের আত্মমর্যাদাবান, আত্মনির্ভরশীল, সৎ, চরিত্রবান, উচ্চ মনোবলসম্পন্ন, অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।

বাংলাদেশ স্কাউটসের মূলমন্ত্র : কাব স্কাউট মূলমন্ত্র : যথাসাধ্য চেষ্টা করা। স্কাউট মূলমন্ত্র : সদাপ্রস্তুত। রোভার স্কাউট মূলমন্ত্র : সেবা। একত্রে বলা হয় ‘সেবার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে যথাসাধ্য চেষ্টা করা’। স্কাউট আইন ৭টি। ১. স্কাউট আত্মমর্যাদায় বিশ^াসী। ২. স্কাউট সকলের বন্ধু। ৩. স্কাউট বিনয়ী ও অনুগত। ৪. স্কাউট জীবের প্রতি সদয়। ৫. স্কাউট সদা প্রফুল্ল। ৬. স্কাউট মিতব্যয়ী। ৭. স্কাউট চিন্তা, কথা ও কাজে নির্মল। কাব স্কাউট প্রতিজ্ঞা : আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, আল্লাহ ও আমার দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করতে, প্রতিদিন কারো না কারো উপকার করতে, কাব স্কাউট আইন মেনে চলতে আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। (আল্লাহ শব্দের পরিবর্তে নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ^াস অনুসারে সৃষ্টিকর্তার নাম উচ্চারণ করা যাবে।) কাব স্কাউট আইন : ১. বড়দের কথা মেনে চলা। ২. নিজেদের খেয়ালে কিছু না করা। স্কাউট/রোভার স্কাউট প্রতিজ্ঞা : আমি আমার আত্মমর্যাদার ওপর নির্ভর করে প্রতিজ্ঞা করছি যে, ১. আল্লাহ ও আমার দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করতে। ২. সর্বদা অপরকে সাহায্য করতে। ৩. স্কাউট আইন মেনে চলতে, আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

স্কাউটিংয়ের মূলনীতি তিনটি : ১. স্রষ্টার প্রতি কর্তব্য পালন, ২. অপরের প্রতি কর্তব্য পালন, ৩. নিজের প্রতি কর্তব্য পালন।

স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট স্টিফেনসন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল। বিশ^ব্যাপী তিনি বিপি হিসেবে সমধিক পরিচিত। ১৮৫৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বিপি লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যক্তিজীবনে সেনাবাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। ১৮৯৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষুদ্র সীমান্ত শহর ম্যাফেকিং-এ তিনি ২১৭ দিন বুয়রদের দ্বারা অবরুদ্ধ ছিলেন। তিনি তখন তার নিজ সেনাদলের স্কাউটদের ব্যবহার করে যে সফলতা লাভ করেছিলেন, পরবর্তীতে সে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্কাউটিংকে বালকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেন। কালক্রমে তা আন্দোলনে রূপ লাভ করে। ১৯০৭ সালে ইংল্যান্ডের ব্রাউনসি দ্বীপে ব্যাডেন পাওয়েল ২০ জন বালক নিয়ে যে পরীক্ষামূলক ক্যাম্প আয়োজন করেছিলেন তারই ফলে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় এবং পর্যায়ক্রমে সারা বিশে^ এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০৮ সালে স্কাউটদের জন্য বিপির লেখা ‘স্কাউটিং ফর বয়েজ’ বইখানা প্রকাশিত হয়, যা আজও সারা বিশে^ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়।

১৯০৯ সালের মধ্যে চিলি, জার্মানি, সুইডেন, ফ্রান্স, নরওয়ে, হাঙ্গেরি, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, সিংগাপুর প্রভৃতি দেশে স্কাউট আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১০ সালে ভারতবর্ষে স্কাউটিং শুরু হলেও তখন শুধু ইংরেজ ছেলেদের মধ্যে স্কাউটিং সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯১৬ সালে ভারতীয় অধিবাসী ছেলেদের মধ্যে পৃথক স্কাউট সংগঠন গঠিত হয়। ১৯১৬ সালে কাব স্কাউটিং শুরু হয়। ১৯১৮ সালে রোভার স্কাউটিং শুরু হয়। ১৯২০ সালে ইংল্যান্ডের অলিম্পিয়াতে প্রথম বিশ^ স্কাউট জাম্বুরি অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১ ডিসেম্বর পাকিস্তান বয় স্কাউট সমিতি গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ২২ মে ঢাকায় ইস্ট বেঙ্গল স্কাউট অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়। ১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশ স্কাউট সমিতি। এ বছরেই ৯ সেপ্টেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির ১১১নং আদেশবলে বাংলাদেশ স্কাউটসকে সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। প্রথম জাতীয় কমিশনার নির্বাচিত হন পিয়ার আলী নাজির। ১৯৭৪ সালের ১ জুন বিশ^ স্কাউট সংস্থা বাংলাদেশ স্কাউটসকে ১০৫তম জাতীয় স্কাউট সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৭৮ সালের ১৮ জুন পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল সভায় বাংলাদেশ বয় স্কাউট সমিতির নাম করা হয় ‘বাংলাদেশ স্কাউটস’। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ স্কাউটস বিশ^ স্কাউট সংস্থার অনুমোদনক্রমে এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওন-এর অন্যান্য দেশের ন্যায় গার্ল-ইন-স্কাউটিং প্রবর্তন করে।

বাংলাদেশের স্কাউট আন্দোলন মূলত তিনটি শাখায় বিভক্ত। ক. কাব স্কউট : বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশু-কিশোরদের (৬+ থেকে ১০+ বছর বয়সী) কাব স্কাউট বলা হয়। খ. স্কাউট : মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসার বালক-বালিকাদের (১১+ থেকে ১৬+ বছর বয়সী) স্কাউট বলা হয়। গ. রোভার স্কাউট : কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের যুব বয়সীদের (১৭+ থেকে ২৪+ বছর বয়সী) রোভার স্কাউট বলা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে মুক্ত দল। বয়স্করা প্রশিক্ষণ নিয়ে ইউনিট লিডার বা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকমন্ডলী ও সংশ্লিষ্ট সবাই স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্কাউটসের মহতী প্রচেষ্টায় শরিক হয়ে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে কাব স্কাউট, স্কাউট ও রোভার স্কাউট এবং বয়স্ক নেতা মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ সদস্য রয়েছে। পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশে^ বাংলাদেশ স্কাউটসের অবস্থান পঞ্চম। কাব স্কাউটদের বড় সমাবেশকে বলা হয় ক্যাম্পুরি, স্কাউটদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমাবেশকে বলা হয় জাম্বুরি এবং রোভারদের বড় সমাবেশকে বলা হয় রোভার মুট। জাতীয় পর্যায়ে প্রতি চার বছর অন্তর ক্যাম্পুরি, জাম্বুরি ও মুট অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ ছাড়া উপজেলা, জেলা, অঞ্চলভিত্তিক কাব, স্কাউট ও রোভার স্কাউটদের সমাবেশ হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ স্কাউটস কর্তৃক স্কাউটিং কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্কাউটদের জন্য তিনস্তরে তিনটি সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড প্রবর্তন করা হয়েছে। কাব স্কাউটদের জন্য ‘শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড’। এ অ্যাওয়ার্ড প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে কাব স্কাউটদের মাঝে বিতরণ করেন। স্কাউটদের জন্য সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড হচ্ছে ‘প্রেসিডেন্টস স্কাউট অ্যাওয়ার্ড’। রোভার স্কাউটদের জন্য সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড ‘প্রেসিডেন্ট’স রোভার স্কাউট অ্যাওয়ার্ড’। এ দুটি অ্যাওয়ার্ড রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কাউট ও রোভার স্কাউটদের প্রদান করেন। এডাল্ট লিডারদের জন্য অন্যান্য অ্যাওয়ার্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড হচ্ছে রৌপ্য ব্যাঘ্র এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড হচ্ছে রৌপ্য ইলিশ। বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রতিটি স্তরে কাব স্কাউট, স্কাউট ও রোভারদের জন্য রয়েছে স্তরভিত্তিক বই। এ ছাড়াও বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রায় ৩০টি প্রকাশনা রয়েছে। বাংলাদেশ স্কাউটস থেকে প্রতি মাসে অগ্রদূত নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে অগ্রদূত নামে একটি অনুষ্ঠান নিয়মিত সম্প্রচার করা হয়। বাংলাদেশ স্কাউটসের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত স্কাউট শপে স্কাউটিং সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের ব্যাজ, স্কার্ফ, ওয়াগল, বই, পুস্তিকাসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ স্কাউটসের বিভিন্ন স্তরের প্রশিক্ষণের জন্য রয়েছে উচ্চ মানসম্পন্ন দক্ষ ও স্বতঃপ্রণোদিত প্রশিক্ষণ টিম। প্রায় ৯০ একর জায়গায় আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বাংলাদেশ স্কাউটসের জাতীয় স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি রয়েছে গাজীপুরের মৌচাকে। এ ছাড়াও সারা দেশে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশ স্কাউটসের জাতীয় কাউন্সিলের ৪৭তম বার্ষিক সাধারণ সভায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘সমাজে স্বার্থপরতা, হিংসা, লোভ ও নৈতিকতার অবক্ষয় শিশু-কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি বিশ^ব্যাপী সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও প্রযুক্তির অপব্যবহারও তরুণদের বিপথে পরিচালিত করতে ভূমিকা রাখছে। এতে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিভা অকালে ঝরে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে তরুণদের মুক্ত রেখে তাদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্কাউট আন্দোলন এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।’

বর্তমানে বাংলাদেশ স্কাউটসের সংখ্যা ১৭ লাখ, যা জনসংখ্যার অনুপাতে পর্যাপ্ত নয়। স্কাউট সদস্য সংখ্যা ২১ লাখে উন্নীত করতে বাংলাদেশ স্কাউটস ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০২১’ বাস্তবায়ন করছে। এ পরিকল্পনার আলোকে স্কাউটের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্কাউটিংয়ের মান বৃদ্ধিতে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। স্কাউটিং মানুষকে সামাজিক ও সমাজবদ্ধ করে। স্কাউটিং সামাজিক ঐক্য ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে। স্কাউটরা অবসর সময়কে সফলভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পায় এবং নিজ, পরিবার, সমাজ তথা বৈশ্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। কাব হচ্ছে স্কাউট আন্দোলনের প্রথম স্তর। কাব স্কাউটের সংখ্যা ও মান যত বৃদ্ধি পাবে স্কাউটিংয়র তত প্রসার ঘটবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে স্কাউট ও রোভারের তুলনায় কাবের সংখ্যা অনেক কম। অথচ কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সংখ্যা অনেক বেশি। কাব বয়সী ছাত্রছাত্রীদের সৎ মনমানসিকতা সৃষ্টি, সঠিক দিকনির্দেশনা দান, যথাযথ শারীরিক বিকাশ ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষামূলক কর্মকাে জড়িত রাখার জন্য কাব স্কাউটিং কার্যক্রম অত্যন্ত সহায়ক। সম্প্রতি দেশব্যাপী প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাব দল গঠন ও সুষ্ঠুভাবে দল পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের এ মহতী উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

info.skcbd@gmail.com

 

"