বিশ্লেষণ

লবণে হতাশ উপকূলচাষিরা

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

লবণ উৎপাদনের ভরা মৌসুমে পণ্যটি বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না উপকূলীয় অঞ্চলের অসহায় লবণচাষিরা। লবণের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা। অনেকে উৎপাদন বন্ধ রেখেছেন। দুই বছর ধরে ক্রমাগত লোকসানের কারণে লবণচাষিদের মেরুদন্ড ভেঙে গেছে। পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের সময় এ দেশে একবার লবণের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছিল। টাকা দিয়েও সেসময় পণ্যটি পাওয়া যেত না। একশ্রেণির ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় লবণ মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছিলেন। মানুষ কচুপাতায় লবণ কিনে বাড়িতে নিয়ে আসত। এখনো মানুষ নূরুল আমিনকে লবণচোরা বলে অভিহিত করে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুঠিরশিল্প সংস্থার মতে, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া ও টেকনাফ উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলে দেশের সিংহভাগ লবণ উৎপাদন হয়। চলতি মৌসুমে দেশে এসব এলাকা থেকে বিসিকের লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৮ লাখ টন। আর পুরো বছরের জন্য পণ্যটির চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টন। এর মধ্যে ৯ মার্চ পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ৫ লাখ টন। জানা যায়, মাঠপর্যায়ে এক মাস ধরে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৭০-১৮০ টাকা। অথচ প্রতি মণ (৫০ কেজি) উৎপাদনে চাষিদের খরচ হয়েছে ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা। দুর্ভাগ্য বর্তমানে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে চাষিদের পণ্যটি বিক্রি করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ লবণচাষি সমিতির তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ সালে দেশে লবণের ঘাটতি ছিল ৮০ হাজার টন। ২০১৭-১৮ সালেও ১ লাখ ১ হাজার টন ঘাটতি ছিল। গত দুই অর্থবছরে পণ্যটির মোট ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৮১ হাজার টন। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে ৩ লাখ টন। এ হিসেবে দেশে বর্তমানে লবণ উদ্বৃত্ত আছে ১ লাখ ১৯ হাজার টন। বিসিকের তথ্যমতে, গত মৌসুমে ৫৯ হাজার ৫৬৪ একর জমিতে ১৪ লাখ ৯৩ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। গত বছর লবণের চাহিদা ছিল ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার টন বেশি লবণ উৎপাদন হয় গত বছর। বাঁশখালী উপজেলার একজন লবণচাষি দুঃখ করে বলেন, ৩৮-৪০ হাজার টাকা দিয়ে লবণ চাষের জন্য এক কানি (৪০ শতক) জমি ইজারা নিতে হয়। মাঠ তৈরি করতে খরচ করতে হয় ৬ হাজার টাকা। সেচ দিতে খরচ হয় ৪ হাজার টাকা। প্রতি কানি জমিতে লবণ তৈরিতে শ্রমিক খরচ লাগে ২০ হাজার টাকা। পলিথিন বিছাতে খরচ হয় আরো ৪ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে প্রতি কানি জমিতে লবণ উৎপাদনে খরচ হয় ৭২-৭৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে প্রতি কানি জমিতে লবণ উৎপাদন হয় ২০০ মণ। ভালো মানের প্রতি মণ লবণের বর্তমান বিক্রয় মূল্য ১৭০-১৮০ টাকা। সে হিসেবে এক কানি জমির উৎপাদিত লবণ থেকে চাষিদের আয় ৩৪ ৩৬ হাজার টাকা। তাই প্রতি কানি জমিতে লবণ উৎপাদন করে চাষিকে লোকসান দিতে হচ্ছে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা। দিন-রাত হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে চাষিরা লবণের উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না; এ দুঃখের কথা কৃষক বলবেন কার কাছে? উপকূলের হাজার হাজার লবণচাষির কথা, গরিব চাষিদের বাঁচাতে সরকারকে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি সীমিত করতে হবে। অন্যথায় চাষিদের লবণ উৎপাদণ বন্ধ করে অন্য পেশা গ্রহণ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। এ প্রসঙ্গে বাঁশখালী লবণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির ভাষ্য হলো, আমদানিকৃত লবণের মজুদ থাকায় ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকে লবণ কিনছেন কম। কৃষকদের মাঠপর্যায়ে লবণ সংরক্ষণের কোনো সুযোগ না থাকায় উৎপাদন মৌসুমেই চাষিরা পানির দামে পণ্যটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বড় কোম্পানিগুলো চাষিদের ঠকিয়ে মাঠ থেকে কম দামে লবণ কেনার এক অশুভ ফাঁদ তৈরি করেছেন। এ কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপকূলের লবণচাষিরা। চট্টগ্রামের কোহিনূর সল্টের মালিকের কথা, লবণশিল্প বাঁচাতে হলে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এ লবণের ওপর উপকূলের হাজার হাজার লবণচাষি ও তাদের পরিবার-পরিজনের জীবন-জীবিকা জড়িত। পুরো মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লাভের অর্থ দিয়ে চাষিদের সারা বছর সংসার চলত। আর এখন লাভ তো দূরের কথা এটি বিক্রি করে চাষিরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। লবণচাষিরা লবণের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে পথে বসলেও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মৌসুমের সময় কম দামে পণ্যটি কিনে ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি দামে বিক্রি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন।

উপকূল অঞ্চলের চাষি পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি কেজি অপরিশোধিত লবণ ৩ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৬০ পয়সা দামে বিক্রি হলেও সারা দেশের হাট-বাজারে প্যাকেটজাত লবণ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩৫ টাকা কেজিতে। সম্প্রতি ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, পূবালী, তীর ও এসিআই কোম্পানির প্রতি কেজি লবণ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ২০, ৩০ ও ৩৫ টাকা দামে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, উপকূলীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত লবণ চট্টগ্রামের মাঝির ঘাট, চাক্তাই ও পটিয়ায় মিলগুলোতে নিয়ে আসা হয় পরিশোধনের জন্য। বর্তমানে এসব এলাকায় বস্তাপ্রতি (৭৪ কেজি) অপরিশোধিত লবণ বিক্রি হচ্ছে ৬২০-৬৪০ টাকা। যার কেজিপ্রতি মূল্য দাঁড়ায় ৮-৯ টাকা। ক্রাশিং শেষে মিল থেকে বেরিয়ে এ লবণ বিক্রি হচ্ছে প্রতি বস্তা ৭২০-৭৫০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি কেজি ১০ টাকা দামে। আর সেই লবণই প্যাকেটজাত করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩৫ টাকা। অথচ লবণচাষিরা যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পণ্যটি উৎপাদন করছেন, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছেন, তারা উৎপাদনের আসল খরচটাও তুলতে পারছেন না; এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে?

দেশের লবণ পরিশোধন কোম্পানিগুলোর কথা, শিল্পের নামে খাওয়ার লবণ আমদানি করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এ লবণ আসছে সরাসরি পরিশোধিত অবস্থায়। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী আয়োডিন না মিশিয়েই পরিশোধন ছাড়াই শিল্প-কারখানার নামে লবণ এনে প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করছেন। এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে; অন্যদিকে লবণচাষিরাও বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্যমূল্য থেকে। লবণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্প খাতে আমদানিকারকরা লবণের একটি বড় অংশ খাওয়ার লবণ, যা শিল্প লবণ নামে আমদানি করে খাওয়ার হিসেবে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। জানা যায়, শিল্প খাতে লবণ আমদানিতে মোট করভার ৩৭ শতাংশের মতো। অন্যদিকে খাওয়ার লবণ আমদানির মোট করভার ৮৯ শতাংশ। ফলে শিল্প লবণ আমদানিকরাটাই বেশি লাভজনক। একটি কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী পরিশোধিত অবস্থায় এক কেজি শিল্প লবণ আমদানির খরচ হয় ১২ টাকা। স্থানীয় পরিশোধিত লবণের দাম পড়ে ২০ টাকার মতো।

দেশের প্রায় ৪৫ হাজার চাষি লবণ উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া লবণ উৎপাদন, বিপণন, পরিশোধন এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ লাখ লোকের জীবন-জীবিকা জড়িত। লবণশিল্প একটি কৃষিভিত্তিক শিল্প। উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে ২০১১ সালে জাতীয় লবণনীতি প্রণয়ন করা হয়। লবণচাষিদের আশা ছিল, জাতীয় লবণনীতি প্রণয়ণের ফলে চাষিরা লবণের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্র থেকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলের জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ফলে লবণ উৎপাদন এলাকায় কর্মচাঞ্চলের সৃষ্টি হবে। বেকার জনগণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে। একই সঙ্গে এ নীতির ফলে উপকূলীয় জনজীবনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। জাতীয় লবণনীতির উদ্দেশ্য হলোÑ দেশে বছরভিত্তিক লবণের চাহিদা নিরূপণ এবং চাহিদা মোতাবেক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও কৌশল নির্ধারণ। এ ছাড়া চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং একরপ্রতি লবণের উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ। কালো লবণ উৎপাদনে চাষিদের নিরুৎসাতি করে সাদা লবণ উৎপাদনে উদ্বুদ্ধকরণ ও বিসিক উদ্ভাবিত পলিথিন পদ্ধতির প্রচার ও প্রসার। মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে লবণ চাষে ব্যবহৃত প্রকৃত জমির পরিমাণ, চাষির সংখ্যা ও মিল মালিকের সংখ্যা নির্ধারণ করে সিঙ্গেল ডিজিট হার সুদে লবণচাষি ও মিল মালিকদের পর্যাপ্ত ঋণসহায়তা প্রদান। লবণচাষিদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান এবং আপৎকালীন সময়ের জন্য বাফার স্টকের ব্যবস্থাকরণ। বিশেষ পরিস্থিতিতে চাহিদা অনুযায়ী দেশের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী লবণ আমদানি। স্বাস্থ্যসম্মত, ভেজালমুক্ত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন নিশ্চিতকরণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা প্রদান। উৎপাদিত লবণ সংরক্ষণ, সরবরাহ এবং বাজারজাতকরণের অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান।

২০১১ সালে জাতীয় লবণনীতি প্রণয়নের পর দীর্ঘ ৮ বছর কেটে গেলেও তার সুফল দৃশ্যমান হচ্ছে না দরিদ্র লবণচাষিদের মধ্যে। জাতীয় লবণনীতির সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে চাষিদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হলে পণ্যটি আমদানি সীমিতকরণসহ শিল্পের নামে আমদানিকৃত লবণ খাওয়ার কাজে ব্যবহার বন্ধের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করেন লবণ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

লেখক : সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি., নাটোর

netairoy18@yahoo.com

 

"