মতামত

চাকরির পরীক্ষায় আবেদন ‘ফি’

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

যেকোনো চাকরির পরীক্ষায় আবেদন প্রক্রিয়ার শুরুতেই আসে আবেদন ফির কথা। বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় সব ধরনের চাকরি বিশেষ করে সরকারি চাকরি হলো সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও লোভনীয়। এ কথা সত্যি যে, ছাত্রজীবনে প্রায় সব শিক্ষার্থীকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অনেক কষ্ট সহ্য করে পড়ালেখা শেষ করতে হয়। তারপর বেকারত্বের তকমা মাথায় নিয়ে হন্যে হয়ে চাকরির খোঁজে ঘুরতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন চাকরির ফি মানেই বেকার চাকরিপ্রার্থীর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে বেকার চাকরিপ্রার্থীকে মোটা অঙ্কের ‘ফি’ দিতে হয়। প্রায় সব প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির আবেদন ফি প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। আবার কোনো কোনো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রথম শ্রেণির চাকরিতে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নিয়ে থাকে। এই মোটা অঙ্কের ফি লক্ষ লক্ষ বেকার চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত ? তবে এ ক্ষেত্রে বেকার চাকরিপ্রার্থীদের আশার আলো দেখিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সালের শেষের দিকে ব্যাংকগুলোতে সব ধরনের চাকরির পরীক্ষার আবেদনে কোনো ফি না নিতে নির্দেশনা জারি করে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয় ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। বর্তমান সময়ে ব্যাংকগুলোতে আবেদন করতে এখন আর কোনো ফি লাগে না।

বাংলাদেশে এমনিতেই বেকারের সংখ্যা বেশি। কিন্তু শূন্যপদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। বিভিন্ন পদে লক্ষ লক্ষ প্রার্থী আবেদন করলেও শেষমেশ চাকরি হয় অল্পসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর। কিন্তু আবেদনের শুরুতে সব চাকরিপ্রার্থীকে মোটা অঙ্কের ফি পরিশোধ করতে হয়। চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে নিয়োগ পরীক্ষার ব্যয়বাবদ টাকা নেওয়া কতটা যৌক্তিক? নিয়োগ পরীক্ষার খরচ কেন বেকার চাকরিপ্রার্থীদের বহন করতে হবে? একাডেমিক পড়ালেখা শেষে এমনিতেই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপে বেকার চাকরিপ্রার্থীরা অত্যন্ত কষ্টকরভাবে দিন পার করে থাকেন। শিক্ষিত বেকাররা যখন চাকরির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার চেষ্টা করেন তখন রাষ্ট্রের উচিত তাদের জন্য এগিয়ে আসা। এটা সরকারের দায়িত্বের শিক্ষিত বেকার চাকরিপ্রার্থীর দিকে চেয়ে থাকেন, কখন সন্তান চাকরি পেয়ে পরিবারের দুঃখ ঘোচাবে। এ সময় সদ্য পড়ালেখা শেষ করা বেকারকে কত কষ্ট ও চাপের মধ্যে থাকতে হয়, তা শুধু ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউই জানেন না। আর ঠিক এ মুহূর্তে চাকরির জন্য একটার পর একটা আবেদনের টাকা জোগাড় যেন ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’। আবার অনেক সময় চাকরির আবেদন ফি দিয়েও পাওয়া যায় না পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ! তখন আর দুঃখের অন্ত থাকে না।

উন্নত দেশে বেকারদের কর্মসংস্থান হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকার বেকার ভাতা দিয়ে থাকে। আমাদের দেশে বেকার ভাতা না হোক, বেকার চাকরিপ্রার্থীরা যাতে অন্তত বিনা ফিতে পরীক্ষা দিতে পারেন, এ ব্যবস্থা করা উচিত। অবিলম্বে চাকরির ফির নামে এভাবে বেকারদের ওপর শোষণ বন্ধ হোক। দেখা যায় যে, সরকারি প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কারণে প্রতি বছর অর্থ উদ্বৃত্ত থাকে। তাই সামান্য নিয়োগ পরীক্ষার ব্যয় বহন করা নিয়োগ প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু একজন বেকার চাকরিপ্রার্থীর জন্য সামান্য ফি মানে অনেক কিছু।

লাখ লাখ টাকা খরচ করে সরকার কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে মেধাবী শিক্ষিত তরুণদের দেশ গড়ার কাজে গড়ে তুলছে। এ তরুণরাই তো এক দিন দেশের হাল ধরবেন। আর তাদের সামান্য চাকরির পরীক্ষার ফি থেকে মুক্তি দেওয়া যাবে না? শিক্ষিত বেকাররা এ দেশের সম্পদ। তবে কেন তাদের ওপর চাকরির পরীক্ষার আবেদন ফি নামের অত্যাচারের স্টিম রোলার চলতে থাকবে? লাখ লাখ বেকার তরুণ জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে সব ধরনের চাকরিতে আবেদন ফি দেশের নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

 

"