মুক্তমত

নারীর অগ্রযাত্রায় বাধা নয়

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

বিগত ১০০ বছরের অধিক সময়ে বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করলেও বিশ্বের নারী সমাজের মতো বাংলাদেশের নারীরা আজও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার। ফতোয়া, পাচার, যৌতুক, ধর্ষণ ও অ্যাসিড সন্ত্রাসের নির্মম বলি হচ্ছেন দেশের অসংখ্য নারী। দেশের অনেক নারী বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। অসহায়ত্বের বোঝা সইতে না পেরে নিজ সন্তানদের বিষ খাইয়ে বা গায়ে আগুন লাগিয়ে মেরে ফেলে নিজেও আত্মাহুতি দিচ্ছেন দেশের নারীরা। পথে-ঘাটে, কর্মস্থলে কোথাও নারী নিরাপদ বোধ করেন না। নারীর প্রতি এ ধরনের বহুমাত্রিক সহিংসতার মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির নিশ্চয়তা বিধান করা যায়নি।

এত প্রতিকূলতার মাঝেও সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীদের অভূতপূর্ব সাফল্য লক্ষ করা গেছে। শিক্ষা-দীক্ষায় নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। নারী সমাজ আজ পরিবার ও সমাজের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে অংশ নিচ্ছে প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকান্ডে। পুরুষের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশে লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়নও ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। অতীতের তুলনায় রাজনীতিতে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের নারী সমাজ। রাষ্ট্রদূত, জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসন চালাচ্ছেন নারীরা। লেজার মেডিকেলের ৯০ শতাংশই নারী কর্মী। করপোরেটে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে আশাতীতভাবে। সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিতে নারীর সংখ্যা যত বাড়ছে, দ্রুত কমে আসছে নারীর কর্মে অংশগ্রহণের বাধা। ক্রীড়াঙ্গনের সুবাদে নারীর জীবনেও যোগ হচ্ছে ভিন্নমাত্রা। তৃণমূলেও নারীর কোমল স্পর্শে উজ্জীবিত হচ্ছে ক্রমেই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির অন্যতম গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিকদের বেশির ভাগই নারী। নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান আর্থসামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত। আইনের চোখে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান মর্যাদা ও মানবাধিকার প্রাপ্তি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নারী উন্নয়নেও অঙ্গীকারবদ্ধ।

নারী-পুরুষ সমতায় এগিয়ে যাওয়ার বিবেচনায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৭ সালের গ্লোবাল ডেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী বিশে^র ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭ আর এশিয়া মহাদেশে প্রথম। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ এগিয়েছে। তার পরও নারীকে সমাজে উপযুক্ত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের এগোতে হবে অনেক পথ। নারীর প্রতি সব ধরনের অমানবিক আচরণ প্রতিরোধে প্রতিটি সচেতন মানুষ, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা অনস্বীকার্য। তাই গৃহকর্মেও নারীর উপযুক্ত মূল্যায়ন জরুরি। যদি গ্রামগঞ্জে নারীরা উৎপাদনশীল সম্পদে পুরুষের সমান সুযোগ পেত তবে কৃষি উৎপাদন আরো ৪ ভাগ বেড়ে যেতে পারত। নিশ্চিত হতে পারত মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা। তাই নারীর উপার্জন করা সম্পত্তি রক্ষা, নারী শিক্ষা এগিয়ে নেওয়া ও মাতৃমৃত্যু হার কমিয়ে আনাসহ নানা বিষয় রেখে নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ বাস্তবায়ন জরুরি। ২০২১ সাল নাগাদ নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক একটি সমৃদ্ধিশীল জাতি গঠনে সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। তাই নারী নির্যাতন ও নারীর ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে এগিয়ে আসতে হবে নারী-পুরুষ বৈষম্যহীন এক সমাজ প্রতিষ্ঠায়। নারী নির্যাতন বন্ধের পাশাপাশি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, নারীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সাফল্যের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

 

"