বিশ্লেষণ

ব্যাংক খাতে সংকট উত্তরণে কিছু প্রস্তাবনা

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

রেজাউল করিম খোকন

সম্প্রতি তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন অনুমোদন পাওয়া তিনটি ব্যাংক হলোÑ বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, সিটিজেন ব্যাংক ও পিপলস ব্যাংক। সিদ্ধান্ত আগেরই, বাকি ছিল শুধু ঘোষণা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সম্প্রতি নতুন তিন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়ে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এসব ব্যাংককে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে হবে। অনুমোদন পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন ৪০০ কোটি টাকা করে। ২০০৯ থেকে মহাজোট সরকারের তিন মেয়াদে এখন পর্যন্ত ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের অনুমোদন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ নতুন তিনটি ব্যাংকের আগে নতুন ব্যাংক পেয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ পুলিশও। সেই ব্যাংকগুলো হলোÑ সীমান্ত ব্যাংক ও কমিউনিটি ব্যাংক। নতুন তিন ব্যাংকের অনুমোদনের ফলে দেশে মোট তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২টিতে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ব্যাংক নাজুক অবস্থায় রয়েছে, এ কথা সবাই জানেন। প্রয়োজন আছে বলেই বেঙ্গল কমার্শিয়াল, পিপলস ও সিটিজেন ব্যাংক নামে তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ‘প্রয়োজনেই নতুন ব্যাংক অনুমোদন পাচ্ছে। প্রয়োজন না থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিতভাবে এ কাজ করত না। তাদের (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের) হয়তো বিশ্লেষণ আছে, প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে, তাই অনুমোদন দিয়েছে।’ একসময় এ নতুন নতুন ব্যাংকগুলো অনুমোদন দেওয়ার আগে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চাওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন বলেছিল, আপাতত নতুন ব্যাংক হওয়ার বাস্তবতা নেই দেশে। তার পরও নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছিলেন, রাজনৈতিক কারণে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিতে হয়েছিল। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব শেষ হওয়ার কয়েকদিন আগেও তিনি বলেছিলেন, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। তৎকালীন এরশাদ সরকারের মেয়াদে (১৯৮২-৯০) ৯টি ব্যাংক অনুমোদন পায়। ১৯৯১-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে নতুন ৮টি ব্যাংক অনুমোদন পায়। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে অনুমোদন পায় ১৩টি ব্যাংক। আর ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত তিন মেয়াদে ১৪টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

একটা বিষয় সবাইকে মানতে হবে, পেশাদারদের দিয়ে ব্যাংক না চালালে, তা দেশের অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে না। অতীতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেচনায় ব্যাংক হয়েছে। তা কিন্তু ভালো হয়নি, মানুষ এ ব্যাংকগুলোকে আস্থায় নিতে পারেনি। এর ফলে আর্থিক খাতও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদি নতুন ও অভিনব ধারণা নিয়ে পেশাদারদের যুক্ত করে ব্যাংক পরিচালিত হয়, তাহলে হয়তো কিছু ভালো ফল আসতে পারে।

ব্যাংক খাতে সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংক কমিশন গঠনের দাবি অনেক দিনের। সবার প্রত্যাশা ও ধারণা ছিল, খুব শিগগিরই হয়তো ব্যাংক কমিশন গঠিত হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাংক কমিশন বা ব্যাংক খাত সংস্কার কমিশন হচ্ছে না। হচ্ছে না এ বিষয়ে কোনো টাস্কফোর্সও। তার বদলে একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ পর্যালোচনা কমিটি শীর্ষক এ কমিটির সদস্য হবে আপাতত পাঁচজন, পরে বাড়তেও পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালকে প্রধান করে গঠিত কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা থাকবেন। বাকি দুজন থাকবেন রাষ্ট্রমালিকানাধীন দুই ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ব্যবস্থাপনা পরিচালক)। এই খেলাপি ঋণ আদায়ের কৌশল নির্ধারণ, খেলাপি ঋণ আর না বাড়ার উপায় অনুসন্ধান এবং বিপুল পরিমাণের ঋণ অবলোপনের কারণ খতিয়ে দেখবে। পরে কমিটি এসব বিষয়ে তাদের মতামত প্রতিবেদন আকারে অর্থমন্ত্রীর কাছে দাখিল করবে।

খেলাপি ঋণ নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের (বিএবি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের মূল চিন্তা খেলাপি ঋণ কমানো। এটা নিয়ে জাতির উৎকণ্ঠা, আমার নিজেরও উৎকণ্ঠা। তবে এক টাকাও খেলাপি ঋণ আর বাড়তে পারবে না।’

খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাত তথা গোটা অর্থনীতিতে একটি বড় সমস্যা সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা, প্রভিশন ঘাটতি, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, সুশাসনের ঘাটতিÑ এসব সমস্যাও রয়েছে। ব্যাংক কমিশন বা ব্যাংক খাত সংস্কার কমিশন গঠিত হলে এগুলো সমাধানে গভীর এবং ভালো কিছু পরামর্শ পাওয়া যেত।

ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র জানতে বিশেষ পরিদর্শন শুরু করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারই অংশ হিসেবে নমুনা ভিত্তিতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন, বেসরকারি ও ইসলামী ধারার একটি করে মোট তিনটি ব্যাংক পরিদর্শন করা হবে। পরিদর্শনে প্রাপ্ত তথ্যাদি পাঠানো হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এর ভিত্তিতে ব্যাংক খাত নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক, বেসরকারি খাতে এবি ব্যাংক ও ইসলামী ধারার আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংককে বিশেষ পরিদর্শনের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশেষ এ পরিদর্শনে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে কারা বড় অঙ্কের ঋণ পেয়েছেন। তার যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি নাÑ এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে।

সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে বলা যায়, আমাদের ব্যাংক খাত এখন ভালো সংকটের সময় পার করছে। বর্তমান সময়ে যেভাবে চলছে তা যদি অব্যাহত থাকে অদূর ভবিষ্যতে সংকট আরো বাড়বে। বড় আকারের খেলাপি ঋণ তো আছেই। হস্তক্ষেপ করে এবং বাস্তবতার বাইরে গিয়ে যেভাবে সুদের হারকে নয় ও ছয় শতাংশ করা হলো, সত্যিই তা নয় ছয় হয়েছে। ব্যাংক খাত কি আদৌ এর জন্য প্রস্তুত? যদি না হয়, খাতটিকে আরো খারাপ দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। ওদিকে আছে ১ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। অবলোপন আছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। পুনঃতফসিলের পরিমাণটা অবশ্য বলা নেই। তবে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বাড়ে আর ডিসেম্বরে তা কমে। পুনঃতফসিল হলো অ্যাডহক, দীর্ঘমেয়াদে সমাধান নয়, এককালীন জমা দিয়ে দুবার, তিনবার পুনঃতফসিল করা যায়। আসলে যেসব গ্রাহক পুনঃতফসিল করতে আসেন, তারাই আসল এখানে। একদল আছে যারা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে। আবার কেউ বলেন, পুনঃতফসিল না করলে আমি দিতে পারছি না। ব্যাংকের তখন আর কী করণীয় থাকে? পুনঃতফসিল না করলে খেলাপি করতে হয় বা অবলোপন করতে হয়। তখন আবার ব্যাংককে এর বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। প্রভিশন রাখতে গেলে আবার ঋণ দেওয়া বা মুনাফা অর্জনের সক্ষমতাও কমে যায়। ব্যাংকের উদ্যোক্তাদেরও ভালো মুনাফা দেওয়া যায় না।

অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায় ক্রটিপূর্ণ ব্যাংকিং খাতের জন্য। আমাদের এগিয়ে চলা অর্থনীতির সব অর্জন ম্লান হয়ে যায় ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে। আমরা কোনোভাবেই আমাদের অর্থনীতির অবক্ষয়, বিপর্যয় প্রত্যাশা করি না। ব্যাংক খাতকে যত দ্রুত সম্ভব খেলাপি ঋণের বোঝামুক্ত করে সুশাসন শুদ্ধাচার নিশ্চিত করে সুস্থ, সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে। আর এজন্য দরকার অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, আমানতকারী, নীতিনির্ধারকসহ সব পক্ষকে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে বাস্তবমুখী কার্যকর জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ।

লেখক : ব্যাংকার

 

"