জীবন জিজ্ঞাসা

মানুষ প্রেমে পড়ে কেন

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

লিটন সামন্ত

রোমান প্রেমের দেবী হিসেবে ভেনাসকে গণ্য করা হয়। গ্রিকদের কাছে প্রেমের দেবী হিসেবে আফ্রোদিতির নাম উল্লেখ করা হয়। এদিকে অতি সুপ্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার ক্ষেত্রে সেখানকার প্রেমের দেবী ইস্তার নাম সমধিক পরিচিত। তাই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের প্রেমের বিষয়টি দেব-দেবীর রহস্য হিসেবে মনে করা হতো। মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানুষের প্রেমে পড়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অজানা একটি রহস্য।

পৃৃথিবীর ইতিহাসে মধ্যযুগ ছিল দর্শনের যুগ। এই যুগটি ছিল ভাববাদের যুগ। তাই এই যুগেও মানবপ্রেম নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। মধ্যযুগের অন্যতম দার্শনিক সেন্ট আগাস্টিন তার ‘ঞযব ঈরঃু ড়ভ এড়ফ’ গ্রন্থে বলেছেন, ইশ্বর তার প্রেমময় রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। এখানে দর্শনের ভাষায় প্রেমের অর্থ হলো প্রীতি প্রদর্শন করা। অর্থাৎ এই ভাববাদের যুগেও মানুষের প্রেমে পড়ার বিষয়টির কোনো সদুত্তর মেলেনি। মধ্যযুগেও মানুষের প্রেমে পড়ার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ অধরা রহস্য।

আধুনিক যুগ বিজ্ঞানের যুগ। এ যুগে মানুষের প্রেমে পড়ার বিষয়টি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হয়েছে। মানুষ তার প্রিয়জনকে দেখার পর তা চোখের মাধ্যমে মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছায়। তখন মস্তিষ্কের ডোপামিন এক প্রকার উদ্দীপনা সৃষ্টি করে এবং ভালো লাগার অনুভূতি জাগায়। মানুষ যখন কোনো রঙিন ফুল দেখে তখনো মস্তিষ্কের ডোপামিন বা মনোঅ্যামাইন উদ্দীপনার সৃৃষ্টি করে। আবার অনেক মাদকসেবী আছে যারা কোকেন বা তামাক সেবন করে, তাদের মস্তিষ্কেও ডোপামিন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। তাই বলে তারা প্রেমের অনুভূতি পেতে পারে কি? নিশ্চয়ই না! প্রেমের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ডোপামিনই এককভাবে দায়ী তা কিন্তু নয়। মানুষের প্রেমে পড়ার ক্ষেত্রে ডোপামিনের পাশাপাশি এন্ডোরফিন নামের আরো একটি যৌগ প্রেম ভালোবাসার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

মানুষ প্রেমে পড়লে মস্তিষ্কের অনেক অঞ্চল বা অংশ একসঙ্গে সক্রিয় হয় এবং সুখানুভূতি তৈরি হয়। পৃথিবীর যেকোনো প্রাপ্তি থেকে প্রেমে পড়ার অনুভূতি একটু আলাদা ও সুখকর। মানুষ যখন প্রিয়জনের সান্নিধ্যে থাকে, তখন অঙ্গিটোসিনের নিঃসরণ বাড়ে এবং শরীরে ভালোলাগার অনুভূতি জাগায়। মস্তিষ্কের অঙ্গিটোসিনের নিঃসরণ হলে নিঃসঙ্গতা দূর হয়। পাশাপাশি হৃদরোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হয়। এভাবে মূলত প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে থাকলে ভালোলাগার অনুভূতি তৈরি হয়।

মানুষ তার প্রিয়জনকে প্রতি সাত সেকেন্ডে একবার মনে করে। সেক্ষেত্রে দিনের বেশির ভাগ সময় মানুষ তার প্রিয়জনকে নিয়ে ভাবে। মানুষের প্রেমের বন্ধন মূলত নির্ভর করে মস্তিষ্কের ফিনাইল, ইথাইল, অ্যামিন বা পিইএ হরমোনের ওপর। এই পিইএ হরমোনের সক্রিয়তা বছরের পর বছর নির্দিষ্ট একজনের প্রতি সক্রিয় থাকে না। নিউরোসায়েন্স বলে, প্রিয়জনের প্রতি এই ফিনাইল, ইথাইল, অ্যামিন বা পিইএর সক্রিয় নিঃসরণ থাকে চার থেকে ছয় বছর। আর এ হরমোনের অনুপস্থিতির কারণে সম্পর্কের ভাটা পড়ে এবং তৈরি হয় দুজনের দূরত্ব।

অনেক সময় দুজনার দেখা না হলেও প্রেম হতে পারে। কারণ মানুষের দর্শনেন্দ্রীয় অপেক্ষা শ্রবণেন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। কারণ মস্তিষ্কের যে অঞ্চল বা অংশ দেখা ও শোনার কাজ করে তার নাম মেনেস সেফালন। এই অংশ কোনো কিছু শোনা বা শ্রবণের ক্ষেত্রে বেশি সক্রিয়। যার কারণে মোবাইল ফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে মানুষের প্রেম হয়ে থাকে। অনেকেরই ধারণা প্রেমের অনুভূতি হৃদয়ে বা হার্টে। এটা মূলত ভ্রান্ত ধারণা। প্রেমের অনুভূতি তৈরি হয় মনে অর্থাৎ মস্তিষ্কে। মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে ষোল থেকে তেইশ বছর পর্যন্ত। আর এই সময়টাতে মানুষ প্রেমের অনুভূতি উপভোগ করে।

লেখক : তথ্য অফিসার

পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিমিটেড

[email protected]

"