পর্যালোচনা

ভালোবাসার বন্ধন এবং আমরা

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

মো. কায়ছার আলী
ama ami

প্রেমের সার্থকতা বা পরিপূর্ণতা বিরহে (ত্যাগে), না মিলনে (প্রাপ্তিতে)। অন্যত্র বলা হয়েছে ‘ভালোবাসা বিবাহের সূর্যোদয় কিন্তু বিবাহ ভালোবাসার সূর্যাস্ত।’ এর শেষ উত্তর বা সমাধান জটিল। অতীত থেকে আজ পর্যন্ত বা ভবিষ্যতেও লেখা, গান, সাহিত্য, নাটক, কাব্যে এর পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। অদেখা বা অচেনা এ ভাইরাসকে নিয়ে পারস্যের কবি হাফিজ তার কবিতায় তার প্রিয়ার গালের একটি তিলের অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা করেছেন। তৈমুরের রাজধানী ছিল সমরখন্দ (জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, কবি, চিত্রশিল্পী, লেখক আর স্থাপত্যশিল্পীদের মিলনকেন্দ্র)। পাশেই ছিল জ্ঞানের আরেক পিঠস্থান বোখারা শহর। কবি হাফিজ আবেগময় কবিতায় প্রিয়ার গালের একটি তিলের জন্য বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন এই দুই বিখ্যাত শহর। লোকের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে কথাটি গেল তৈমুরের কাছে। তৈমুর কবিকে ডেকে বললেন, ‘এই দুই শহরকে আমার জয় করতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি, অপরিমেয় সোনা-দানা খরচ হয়েছে। আর তুমি কি না আমার রাজ্য দুটোকে তুচ্ছ মনে করলে।’ পরে মৌখিক ভয় দেখিয়ে বললেন, ‘এত বড় সাহস তোমার হলো কেমন করে?’ আসলে তার কবিতায় অভিভূত হয়েছিলেন তৈমুর। তিনি খতিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তার প্রতিভা। কবি বললেন, ‘আমি তো এক সামান্য কবি, দিনে ভিক্ষা করে তনু রক্ষা করি। ফকিরের কী আসে যায় মুখের কথায়। সারাটি দুনিয়া বিলিয়ে দেওয়া কি আমার পক্ষে সম্ভব? আমার মতো একজন সামান্য লোক বিশ্বজয়ী রাজার কষ্ট কেমন করে বুঝবে? রাজ্যের দামইবা কেমন করে পরীক্ষা করবে সর্বহারা এক ফকির। তাই আবেগতাড়িত হয়ে বিলাতে চেয়েছিলাম আমি আপনার প্রিয় দুই শহর।’ আরো বললেন, ‘হে মান্যবর, আবেগ তো আবেগই।’ কবি হাফিজের বাক্চাতুর্যে খুশি হলেন তৈমুর। বিদায়ের সময় এক তোড়া স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে পুরস্কৃত করলেন কবিকে আর হেসে হেসে বললেন, ‘অত বড় দরাজ দিল আর হয়ো না কবি। তাহলে তো গোটা সাম্রাজ্যই আমার পানির দামে বিক্রি হয়ে যাবে।’ কবি হাফিজ এবং তৈমুর কেউই বেঁচে নেই। কিন্তু তাদের কাহিনিটি আজও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। পৃথিবীর মানুষরা তাদের ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে আকাশ, চাঁদ, সমুদ্র, সূর্য, পর্বত, হীরা, সোনা আর মূল্যবান সম্পদ বা সৌন্দর্যের সঙ্গে উপমা দিয়ে বর্ণনা দেয়।

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। পৃথিবীতে এর চেয়ে জনপ্রিয় দিবস আর নেই। সারা বিশ্বে এটি ভ্যালেন্টাইন ডে নামে সর্বাধিক পরিচিত। প্রাচীন রোমে বিয়েকে ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হতো। রোমের কুমারী রমণীরা কাগজে ভালোবাসার কাব্য-কথা লিখে মাটির হাঁড়িতে জমা করত। যুবকরা হাঁড়ি হতে তুলে নিত কাগজের টুকরা। যুবকের হাতে যে রমণীর লেখা উঠত, সে রমণীই হতো ওই যুবকের স্ত্রী। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিয়ের এ দৈবচয়ন অনুষ্ঠিত হতো। তাই বহুকাল হতে ১৪ ফেব্রুয়ারি অনানুষ্ঠানিক ভালোবাসা দিবস পালিত হয়ে আসছিল। খ্রিস্টান চার্চের প্রাথমিক যুগে দুজন খ্যাতিমান সেন্ট ছিলেন। রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস মনে করলেন যে, অবিবাহিত যুবকদের মাধ্যমে সর্বোত্তম সেনাবাহিনী গঠন করা যায়। তিনি ২০০ খ্রিস্টাব্দে রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের যুবকদের বিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেন। এ অপরাধে সম্রাট এই দিনে যাজক ভ্যালেন্টাইনের শিরোñেদ করেন এবং তার বিবাহিতা স্ত্রীকে জোর করে বিয়ে করে ফেলেন। একই দিন অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি যুবতী আত্মহত্যা করেন। ঘটনাটি এত করুণ ও হৃদয়বিদারক ছিল যে, রোম সাম্রাজ্যের সবার মনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে সেকালে এ নিয়ে আন্দোলন করার মতো কোনো সুযোগ ছিল না। কথিত হয়, ভ্যালেন্টাইন দম্পতির ভালোবাসা ও ত্যাগের স্মরণার্থে এই দিনে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালন করা হয়। অন্য প্রবাদ মতে, ভ্যালেন্টাইন ছিলেন খ্রিস্টধর্ম প্রচারের প্রাথমিক যুগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারী একজন ধার্মিক। শিশুদের প্রতি ছিল তার অনুপম ভালোবাসা ও গভীর মমতা। তৎকালীন রোম সাম্রাজ্যের প্রচলিত ধর্মীয় দেবতাদের পুজো করতে অস্বীকার করায় তাকে কারাগারে একটি প্রকোষ্ঠে বন্দি করে রাখা হয়। হাজার হাজার শিশু ও ভক্ত সেলের জানালা দিয়ে ভ্যালেন্টাইনের প্রতি ফুলের তোড়া নিক্ষেপ করেন। কথিত হয়, ভালোবাসার ছোঁয়ায় ভ্যালেন্টাইন জেলারের অন্ধ কন্যার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ জেলির্সিয়াস ভ্যালেন্টাইনের হত্যার দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধ হতে ইংল্যান্ডে ভ্যালেন্টাইন ডে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, জনৈক ফ্রেন্সম্যান অরল্যান্সের ডিউক চার্লস ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে এপিনকোর্টর যুদ্ধে ইংরেজদের নিকট পরাজিত ও ধৃত হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। ভ্যালেন্টাইন দিবসে তিনি কারাগারে তার সেল হতে তার স্ত্রী-পুত্রদের উদ্দেশ গভীর ভালোবাসায় পূর্ণ একটি কবিতা লিখে লন্ডন টাওয়ারে প্রেরণ করেন। সে হতে ইংল্যান্ডে ভ্যালেন্টাইন ডে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ষোড়শ শতক হতে আধুনিক ভ্যালেন্টাইন দিবসের যাত্রা শুরু হয়।

পৃথিবীতে এর চেয়ে আর কোনো গভীর ক্রন্দন আছে কি না জানি না। বৃদ্ধ সম্রাট শাহজাহান জীবনের শেষ আট বছর পুত্র আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দি অবস্থায় কাটান। শুধু একটি দয়া তিনি পিতাকে করেছিলেন। যে আগ্রা দুর্গে পিতাকে বন্দি রেখেছিলেন, সেখানে একটা গবাক্ষ রাখলেন, যেখান থেকে যমুনা নদীর পাড়ে শুভ্র সমুজ্জ্বল তাজমহলকে দেখা যেত, যার পাষাণ বেদির তলায় চিরশায়িত ছিলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ জাহান। নজরুল লিখেছেন, ‘যমুনার তীরে শাহজাহান স্বপ্ন শতদল/তাজমহল।’ ইংল্যান্ডের দুর্ধর্ষ রাজা চন্ড স্বভাবের অষ্টম হেনরি প্রেমে পড়লেন অ্যান বলিন নামের এক প্রটেস্ট্যান্ট রমণীর। রমণীর মন গলাতে তিনি ঘোড় সওয়ারের দ্বারা দীর্ঘ দীর্ঘ প্রেমপত্র পাঠাতে লাগলেন। ওই চিঠিগুলো রমণীর মন গলাল, কিন্তু বাদ সাধলেন রোম থেকে পোপ। ইংল্যান্ড তখনো ক্যাথলিক রাজ্য। রোমের পোপ হচ্ছে এর ধর্মীয় গুরু। কিন্তু রাজা হেনরি পোপের কথা শুনবেন কেন? ইংল্যান্ডকে তিনি প্রটেস্ট্যান্ট দেশ করলেন। বললেন, ইংল্যান্ড একটি স্বাধীন দেশ, কাজেই এর চার্চও স্বাধীন। আসল কারণ প্রটেস্ট্যান্ট রমণী অ্যান বলিনকে তিনি বিয়ে করবেনই। বিয়ের কারণে রাষ্ট্রের ধর্ম বদল হয়ে গেল। সহসা অ্যান এলিজাবেথের জন্ম দিলেন। এলিজাবেথ পরে ১৫৫৮ সালে ইংল্যান্ডের রানি হন, কিন্তু তার বহু আগেই তার পিতা রাজা হেনরি তার মাকে দুশ্চরিত্র রমণী অভিধা দিয়ে গিলোটিনে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এককালের প্রেমিকা এবং পরে রানি অ্যান বলিন তার স্বামীর কাছে ব্যভিচারিনী আখ্যা পেয়ে নিহত হলেন। ভালোবাসা কারে কয়? সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা দিনে ২০-৩০ জন করে বার্তাবাহক পাঠাচ্ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়া থেকে রোমে তার প্রেমিক এন্টনি কী করছে তার সংবাদ নেওয়ার জন্য। পারিষদ অ্যালেক্সাস রানিকে বললেন, রানি মাতা এত সংবাদবাহক পাঠানোর দরকার কী? ক্লিওপেট্্রার জবাব, ‘দরকার হলে পুরো মিসর জনশূন্য করে দেব, আর যেদিন বার্তাবাহক পাঠাতে পারব না, সেদিন যেন নীল নদের মাছ আমাকে ভক্ষন করে, কিন্তু আমার এন্টনির খবর চাই-ই।’ তাদের প্রেমের শেষ পরিণতি ট্র্যাজেডিতে পূর্ণ। একেই কি বলে ভালোবাসা?

‘শিল্পী’ নামক চলচ্চিত্রে সুচিত্রা সেন তার ধনী পিতা বিকাশ রায়কে বলছেন, আমি রায় বংশের মেয়ে অঞ্জনা রায় নই। আমি শিল্পী, ধীমান পালের (উত্তম কুমারের) স্ত্রী অঞ্জনা পাল। শেক্সপিয়ারের রোমিও আর জুলিয়েটের কথায় আসি জুলিয়েট জানে না যে, রোমিও চুপিসারে এসে তার ব্যালকোনির তলায় দাঁড়িয়ে তার কথা শুনছে। জুলিয়েট রোমিও রোমিও করে জান দিয়ে দিচ্ছে। আর রেলিংয়ে ভর দিয়ে চিবুকে হাত রেখে রাত্রির উদ্দেশ্য তার ভাবনাগুলো ছুড়ে দিচ্ছে। তখন রোমিও নিচে থেকে বলছে, ইশ! আমি যদি তার হাতের দস্তানা হতাম, তাহলে তো আমি তার চিবুক ছুতে পারতাম। রোমিও তখন জানান দেয় যে, সে এতক্ষণ নিচে দাঁড়িয়ে জুলিয়েটের প্রেম স্ফুরিত শ্লোক শুনছিল। জুলিয়েট জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাকে এখানে কে পথ দেখাল?’ রোমিওর উত্তর, ‘আমার ভালোবাসা।’ পরবর্তী প্রশ্ন, ‘এত সুউচ্চ প্রাচীর টপকালে কীভাবে?’ আবার উত্তর, ‘আমার প্রেমের কাছে পাথুরে বাধা কোনো বাধা নয়।’ পুনরায় জুলিয়েটের প্রশ্ন, ‘প্রহরীরা দেখলে তোমাকে মেরে ফেলবে।’ এবার উত্তর, ‘তোমার চোখে যদি দেখি আমাকে প্রত্যাখ্যান করার আলো, সেটাই আমাকে মেরে ফেলবে, অন্যথায় কুড়িজন প্রহরীও তাদের নাঙ্গা তলোয়ার দিয়ে আমার কিছু করতে পারবে না।’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

kaisardinajpur@yahoo.com

"