বিশ্লেষণ

বন্দির জীবনে শান্তির বারতা

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

এস এম মুকুল
ama ami

বদলে যাচ্ছে কয়েদিদের জেলজীবন। কারাগার এখন কেবল বন্দিশালা নয়, বরং সংশোধনাগার হিসেবে তৈরি করার লক্ষ্যে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। ২৭২ বছরের পুরনো নিয়ম বদলে যাচ্ছে। এখন থেকে কারাবন্দিদের দেওয়া হবে উন্নত মানের খাবার। কয়েদিদের দেওয়া হচ্ছে উপার্জনমুখী প্রশিক্ষণ। তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বাহারি রকমের গৃহস্থালি পণ্য। এসব পণ্য বিক্রির লভ্যাংশ থেকে তাদের অংশ জমা হচ্ছে তাদের নামে। এ অর্থ তারা জেলমুক্ত পরবর্তী জীবনে কাজে লাগাতে পারবেন। এর ফলে দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের হাতে তৈরি পণ্য বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কারাগারের বন্দিজীবনের কিছুটা আয়ের সুযোগ ঘটছে। যা তাদের মুক্তজীবনের পাথেয় হিসেবে ভূমিকা রাখবে। আর এসব কিছুই করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে। একই সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে নতুনভাবে জীবন সাজাতে পারবেন। আর এর ফলে বন্দি-পরবর্তী জীবনে তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে বলে মনে করছে করা কর্তৃপক্ষ।

এ কথা সবাই জানেন কারাজীবন মানেই অপরাধের শাস্তি হিসেবে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী বন্দিজীবন কাটানো। কিন্তু এতে করে কোনো মানুষের অপরাধবোধ শেষ হয় না। বরং তার মুক্তজীবনে নতুন করে বাঁচার আশা নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই কারাগার শব্দটির পরিবর্তে সংশোধনাগার করা হয়। কারাজীবন যাতে বেদনাবিধুর না হয়ে পড়ে, এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কারাগারের বন্দিদের পরবর্তী মুক্তজীবনে স্বাভাবিক কাজ করার মানসিকতা তৈরি করার জন্য নেওয়া হয়েছে নানা ধরনের উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কারাবন্দিদের খাবারে নিয়ে আসা হচ্ছে বিরাট পরিবর্তন। তাদের প্রতিদিনের আটার রুটি আর আখের গুড়ের পরিবর্তে সপ্তাহে দুই দিন খিচুরি, এক দিন হালুয়া-রুটি ও চার দিন সবজি-রুটি দেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে পাঠানো এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই ২৭২ বছরের পুরনো ও প্রচলিত নিয়ম ভেঙে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত ডায়েট স্কেল অনুযায়ী চলমান খাবার নিয়ে কারাবন্দিদের চাপা ক্ষোভ ছিল দীর্ঘদিনের। ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ রংপুর জেলা প্রশাসক রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনে কারাবন্দিরা তাদের সকালের নাশতায় রুটি, হালুয়া, খিচুরি ও সবজি দেওয়ার দাবি জানান। কারা কর্মকর্তাদের মতে, অনেক বন্দি পিসির মাধ্যমে বাড়ি থেকে টাকা এনে কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ক্যান্টিন থেকে উন্নত নাশতা খাওয়ার সুযোগ নিলেও সক্ষমতা না থাকায় এ সুযোগ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে সব কারাগারে একযোগে সকালের নাশতার মেন্যু পরিবর্তন হবে।

‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’ সেøাগান বাস্তবায়নে কারা কর্তৃপক্ষ সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সহযোগিতায় হস্তশিল্পসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা হচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন অপরাধে বিভিন্ন মেয়াদে বন্দিদের নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই দেওয়া হচ্ছে বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ। কয়েদি পুরুষ ও মহিলাদের তাঁত, রান্না, সেলাই, ইলেকট্রিক অ্যান্ড হাউস ওয়্যারিং, লন্ড্রি, বেকারি, নার্সারি, বিউটি পার্লার ও কুটির শিল্পের বিভিন্ন কাজ শেখানো হচ্ছে। এ প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েদিরা কাঠ, বেত, বাঁশ, তাঁত, সুতা ও বিভিন্ন ধরনের উপকরণ দিয়ে তৈরি করছে ছোট-বড় মোড়া, চেয়ার, ঝুড়ি, বাঁশের দোলনা, কলমদানি ও বেতের ঝুড়িসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক ব্যবহার সামগ্রী; যার ফলে কয়েদিরা মুক্ত হওয়ার পরও যাতে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। মূলত কয়েদিদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও মানসিক বিকাশে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে বন্দিদের জীবনমান বদলে দেওয়ার জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিফলন হিসেবে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েদিরা নিপুণ কারিগর হয়ে উঠছেন। তৈরি করছেন বাঁশ, বেত ও কাঠের দৃষ্টিনন্দন বাহারি আসবাব ও গৃহসামগ্রী। কারা কর্তৃপক্ষের মতানুযায়ী, এসব প্রশিক্ষিত বন্দি মুক্তি লাভের পর নতুনভাবে নিজেদের কর্মজীবন শুরুর পাশাপাশি দারিদ্র্যবিমোচনসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে।

এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় পুরো একটি প্যাভিলিয়ন সাজানো হয়েছিল কয়েদিদের তৈরি পণ্য সমাহারে। কারাপণ্য নাশে কারা কর্তৃপক্ষের এ আয়োজন ছিল কয়েদিদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা পরিবর্তন করা। কয়েদিরা কেবল অপরাধী নয়, তারা সৃজনশীল কাজও করতে পারেন, তারই বাস্তবচিত্র তুলে ধরা হয়েছিল এবারের বাণিজ্য মেলায়। তাদের উদ্দেশ্যও সার্থক হয়েছে। কয়েদিদের তৈরি পণ্যের পসরা দেখে হতবাক হয়েছেন দর্শনার্থী ও ক্রেতারা। এর মাধ্যমে কয়েদিদের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতির জন্ম নিয়েছে সাধারণ জনগণের মাঝে। ক্রেতা-দর্শনার্থীরা আগ্রহ নিয়ে বেছে বেছে কিনেছেন কয়েদিদের তৈরি নান্দনিক গৃহসামগ্রী। ভিডিও করে, ছবি তুলে ফেসবুকে, ইউটিউবে প্রচার করতে দেখা গেছে। মেলার স্টল থেকে জানা গেছে, দেশের ৬৮ কারাগারের বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কয়েদিদের হাতে তৈরি পণ্য সম্ভারে এই প্রথম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নিয়েছে। কয়েদিদের তৈরি বাহারি পণ্য তালিকায় রয়েছে পুঁতি দানার তৈরি হাতব্যাগ, ফুলদানি, নকশিকাঁথা থেকে শুরু করে বুটিক ও বাটিকের থ্রিপিস। প্রায় ২০০ ধরনের পণ্য দিয়ে সাজানো হয়েছিল কারাপণ্য প্যাভিলিয়ন। এসব পণ্য ক্রেতাদের দারুণ আকৃষ্ট করছে। কারাপণ্যের মধ্যে রাজশাহী জেলা কারাগার থেকে জামদানি, রাজশাহী সিল্ক ছাড়াও ব্লক শাড়ি ও নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে নকশিকাঁথা, চাদর, কার্পেট, বেত ও বাঁশের ফার্নিচার যেমন : মোড়া, ইজি চেয়ার, বুক সেলফ, কাঠের ফার্নিচারের মধ্যে সোফা, আলমারি, ফুড কাভার, ফলের ঝুড়ি, ওয়্যারড্রোবসহ বিভিন্ন ধরনের শোপিস, পুঁথির তৈরি বিভিন্ন খেলনা ও শোপিস, তাঁত ও ব্লকের বেডসিট, লুঙ্গি, টাওয়াল। ময়মনসিংহ জেলা কারাগার থেকে পাটের তৈরি ব্যাগ, পাপোশ ও টেবিল ম্যাট। সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে খাবারসামগ্রীÑ বিস্কুট, কেক, মুড়ি, চানাচুর, বিভিন্ন ধরনের আচার বিক্রির জন্য আনা হয়। উৎপাদিত পণ্যের লাভের শতকরা ৫০ শতাংশ মজুরি বাবদ কারাবন্দির মধ্যে বিতরণ করা হয় আর বাকি ৫০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়। এ ছাড়াও বন্দিদের হাতে তৈরি মুড়ি, খইসহ সুস্বাদু খাদ্যপণ্য কারা কেন্টিনে বিক্রি হয়।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হচ্ছে। এ পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে কারা অন্তরীণ কয়েদিদের জীবনেও। কারাগারের ভেতরে পরিত্যক্ত ভূমিতে বন্দিদের মাধ্যমে সবজি চাষাবাদ করানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে বছরে সরকারের লাখ লাখ টাকা সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি সংশোধন হচ্ছেন কয়েদিরা। মনোনিবেশ করছেন উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল কাজে। কাজের বিনিময়ে পাচ্ছেন সম্মানী। এ কারণে কাজের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে। নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে তাদের সময় কাটছে ভালো। তাদের উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশ পেয়ে কেউ কেউ পরিবারের জন্যও টাকা পাঠাতে পারছেন। সব মিলিয়ে কারাভোগের ভেতর থেকেই তাদের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন জীবন সাজানোর স্বপ্ন। কারাগার মানেই বন্দিদের কারা প্রকোষ্ঠে আটকে রাখার ধারণা পাল্টে দিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। লেখাপড়া না জানা বন্দিদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণশিক্ষা কার্যক্রমও আছে। চিহ্নিত অপরাধী ও মাদকাসক্তদের মানসিক বিকাশে উদ্বুদ্ধকরণ করার ব্যবস্থাও আছে। প্রশিক্ষণ ছাড়া সুস্থ মনোবিকাশের জন্য রয়েছে বিনোদনমূলক সংস্কৃতি ও খেলাধুলার ব্যবস্থাও। এসব বহুমুখী পদক্ষেপের ফলে কয়েদিরা সুস্থ জীবনে ফিরে এসে আলোর পথে পা বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ সেøাগানটি যথাযথই ভূমিকা রাখছে।

শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারটি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার তেঘরিয়া ইউনিয়নের রাজেন্দ্রপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে। রাজধানীর কেরানীগঞ্জে নবনির্মিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় চার হাজার ৫৯০ জন বন্দিকে রাখার জন্য এ কারাগার নির্মাণ করা হয়েছে। কারা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সোয়া ২০০ বছরের ঐতিহ্য ভেঙে ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোড থেকে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে কেন্দ্রীয় কারাগারটি। একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে কারা স্থাপনার লাল রং বা লাল দালানের কথাটি। বর্তমান আধুনিক কারাগারটির দেয়ালের রং সাদা করা হয়েছে। বিশ্বের আধুনিক সব কারাগারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কারাগারটি নির্মাণ করা হয়।

চালু করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে পূর্ণাঙ্গ গার্মেন্ট কারখানা। এটিই দেশের কোনো কারাগারে স্থাপিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গার্মেন্ট কারখানা। সমাজসেবা অধিদফতর ও বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তায় ‘কারা গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি’ নামে এ গার্মেন্ট কারখানা নির্মাণ করা হয়। এখানে দুই শিফটে ৩০০ বন্দি কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রাথমিকভাবে ৫৪টি বিদেশি মেশিন নিয়ে এ গার্মেন্টের যাত্রা হয়। এ কারখানায় কাটিং, প্রিন্টিং ও আয়রনসহ সব সেকশনই রয়েছে। কারখানায় প্রতি শিফটে ১৫০ জন করে দুই শিফটে ৩০০ কয়েদি কাজ করতে পারবেন।

কারা বিভাগ বাংলাদেশের একটি সুপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান। ১৭৮৮ সালে তৎকালীন শাসকদের দ্বারা একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তথা কারা বিভাগের যাত্রা। পরবর্তীতে ১৮১৮ সালে রাজবন্দিদের আটকার্থে বেঙ্গল বিধি জারি করা হয়। ১৮৩৬ সালে জেলা ও তৎকালীন মহকুমা সদর ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লায় কারাগার নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯২৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারকে কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশ জেল বা বিডিজের যাত্রা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৫৫টি জেলা কারাগার রয়েছে।

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

"