পর্যালোচনা

আমার গ্রাম আমার শহর

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

আবু আফজাল মোহা. সালেহ
ama ami

আমার গ্রাম ‘আমার শহর’ হবে। তার মানে গ্রামগুলো শহরে রূপান্তরিত হবে না রাতারাতি। শহরের নাগরিক যেসব সুযোগ-সুবিধা পান, সেসব সুযোগ-সুবিধা গ্রাম থেকেই পাবেন গ্রামীণ নাগরিক। বলা যায়, শহর আর গ্রামের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্যগত পার্থক্য রয়েছে; যা পৃথিবীর আর কোনো দেশে খুব কমই আছে। এখানে গ্রাম থেকে মফস্বল শহরের সুযোগ-সুবিধা বেশি, মফস্বল শহর থেকে জেলার থেকে সুযোগ-সুবিধা বেশি। এভাবে বিভাগীয় শহর থেকে রাজধানী শহর সুযোগ-সুবিধা ক্রমান্বয়ে বেশি হওয়ায় বৈষম্য চলে এসেছে নাগরিক অধিকার প্রাপ্যতায়। সরকার এসব বিষয়ে সজাগ রয়েছে। ফলে সরকারের ১নং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই প্রমাণ করে আন্তরিকতা। এখন সরকারের ঘোষণা আমরা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। এ ক্ষেত্রে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে দেশের জন্যই মঙ্গল হবে।

আমাদের সংবিধানের ১৬নং অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমান্বয়ে দূর করার কথা বলা আছে। এ উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাকরণ, কুটির শিল্প বা অন্যান্য শিল্পের মাধ্যমে শিল্পের বিকাশের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল পরিবর্তনের কথা বলা আছে। মূলত পবিত্র সংবিধানের এ অনুচ্ছেদের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথমেই এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সেøাগানটিও সবার মনে ধরেছে, ‘আমার গ্রাম আমার শহর’। সরকারের সুচিন্তিত পরিকল্পনা আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে বাস্তবায়ন করতে সদা তৎপর। দরকার বেসরকারি খাতের সহযোগিতাও। আর যাদের জন্য বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেসব সর্বস্তরের নাগরিকের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা। তাহলেই এগিয়ে যাবে গ্রাম, ইটপাথরের শহরের পরিবর্তে সবুজ গ্রামাঞ্চলে নাগরিকরা পাবেন শহরের সুযোগ-সুবিধা।

সরকারের এ ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সব সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে পল্লী উন্নয়ন নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা নিতে হবে। পল্লী উন্নয়নে সরকারের একটি প্রাচীন সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)। এ ছাড়া পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীনে সমবায় অধিদফতর ও একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পসহ বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে। আমি যেহেতু বিআরডিবি পরিবারের সদস্য, তাই এ বিভাগের জন্য একটু বেশিই আবদার করছি। তবে আগের আইআরডিবি কৃষিক্ষেত্রে যে ব্যাপক সাফল্য এনে দিয়েছে, সে কথা বিবেচনা করলে আমার পক্ষপাতিত্বের কথা কেউ বলতে পারবেন না!

কিছুদিন আগে সিলেটের এক কর্মশালায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিবসহ অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত থেকে ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। আমরা বিআরডিবির কর্মকর্তারা যথেষ্ট অনুপ্রাণিত হয়েছি। বিশেষ করে সচিবের এ নিয়ে ব্যাপক চিন্তাভাবনা আমাদের তাতিয়ে দিয়েছেন। সচিবের চিন্তাভাবনা আমরা এগিয়ে নিতে পারেলে ব্যাপকভাবে সফলতা আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। আমরা বৈষম্যের নির্দেশকগুলো ধরে এগিয়ে যেতে পারি। যোগাযোগ ব্যবস্থার শহর-গ্রামের বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণা সফল হওয়ায় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে শহর-গ্রামে অনেক পার্থক্য কমে গেছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন পরিকল্পনা করে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।

জাপান বা ভিয়েতনামে সরাসরি কৃষি খাতের অবদান কমছে। কিন্তু কৃষিসংশ্লিষ্ট খাতে অর্থনীতিতে অবদান ক্রমেই বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি ভারতেও একই অবস্থা। অনেক উন্নত দেশেও এ অবস্থা বিরাজ করছে। আশার কথা হচ্ছে যে, বৈচিত্র্য ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের অগ্রসরমান গ্রামীণ অর্থনীতিতে। শহরের পাশাপাশি এখন গ্রামেও বাড়ছে বিনিয়োগ। কৃষিজ ও অকৃষিজ কর্মকান্ড বহু গুণ এবং বহুমুখী সম্প্রসারণ হয়েছে ও এ ধারা চলমান রয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রামীণ পরিবহন ও যোগাযোগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার পাওয়ায় গ্রামীণ জনপদে বিনিয়োগ বেড়েই চলছে। গ্রামীণ পরিবারসমূহের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে অকৃষি খাতের অবদানও বাড়াছে। আমাদেরও কুটির শিল্প বা কৃষিসংশ্লিষ্ট উৎপাদনে জোর দিতে হবে। এজন্য পরিকল্পিত লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

গ্রাম পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র সেবা কেন্দ্র, ওয়ার্কশপ স্থাপন করে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীণ যান্ত্রিকায়ন সেবা সম্প্রসারণ করতে হলে গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ছোট ছোট কৃষি যন্ত্রপাতি দিয়ে সহায়তা করা যেতে পারে। বিআরডিবি পল্লী উন্নয়নে সরকারের বড় ও পরীক্ষিত সংস্থা। আশির দশকের কৃষি বিপ্লবে এ সংস্থার ভূমিকা সর্বজনগ্রাহ্য। কিন্তু এখন প্রতিকূল অবস্থায় আছে। জনবল সংকট আর বিভিন্ন প্রকল্পের জনবলের চাকরির অস্থায়িত্ব দুর্বল করছে। সচিব আন্তরিক। প্রধানমন্ত্রীও যথেষ্ট আন্তরিক। সবার প্রচেষ্টায় বিআরডিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি করলে সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ দ্রুত বাস্তবায়ন হবে বলে মনে করি। প্রকল্পের অনেক কর্মচারী এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আশায় কালাতিপাত করছেন। বিএডিসিসহ বা পল্লী উন্নয়ন বিভাগের অন্যান্য সংস্থা বা প্রকল্পেরও সক্ষমতা বৃদ্ধি সরকার করছে এবং আরো করবে বলে আশা করি। এসব সংস্থাগুলোকে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া যেতে পারে। তাহলে সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত শীর্ষ ইশতেহারটি তাড়াতাড়ি ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়ন হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজির অন্যতম লক্ষ্য মানসম্মত বা কোয়ালিটি উন্নয়ন। অর্থাৎ উন্নয়ন-পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কোয়ালিটি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। এজন্য বিশেষ পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে গ্রাম অনেক পিছিয়ে। এখানে আমাদের বেশি কাজ করতে হবে। সরকারের জেলায় জেলায় বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন মফস্বল শহরের শিক্ষা সুবিধা বেড়েছে। আরো বাড়াতে হবে। সরকার এ ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক আর ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। এ বৈষম্যগত পার্থক্য ঘুচিয়ে ফেলতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। গ্রামের কৃষি, কুটির শিল্প রক্ষার পাশাপাশি বৃক্ষ নিধন ও জলাশয় ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ বর্জন করতে হবে। কৃষিজমি রক্ষায় আবাসিক ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা গ্রহণে কর উদ্যোগ প্রয়োজন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য বা উন্নত জাতি গঠনে বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। এ ক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে গেছি। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সরকার যথেষ্ট আন্তরিক।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক কিছু দুর্যোগে বিপর্যস্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরায় শস্যহানি ও প্রাণহানি এবং নদীভাঙন বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোনোভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিনিয়ত শহরমুখী হচ্ছে। ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত থেকে শহরের ফুটপাত, রেলস্টেশনসহ খোলা জায়গায় বস্তি গড়ে তুলে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করেছে তারা। এ ক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানরা খুব একটা এগিয়ে আসছেন না! সরকারই এগিয়ে আসছে। এখন শিল্পপতি বা বিত্তবানদের এগিয়ে এসে সরকারকে সহযোগিতা করার সময় এসেছে। তারা এগিয়ে এলে এ ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সরকারকে খুব একটা বেগ পেতে হবে না! তাদের কাছ থেকে আন্তরিকতা আশা করতে পারি আমরা।

পরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ে তুলতে হবে। উন্নত রাস্তাঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা, মানস¤পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, ক¤িপউটার ও দ্রুতগতিস¤পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরের সব সুবিধাদি দিতে হবে। গ্রামের বৈশিষ্ট্যগুলো বজায় রেখে গ্রামের নাগরিকগণকে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থা, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও ঘনত্ব, যোগাযোগ সুবিধা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে।

নদী-খালগুলো গ্রামের প্রাণ। সুষ্ঠু পানিপ্রবাহের জন্য এবং গাছপালা ফসলাদির বেঁচে থাকার জন্য এই খাল ও নালাগুলো বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। এ ব্যাপারে বিশেষ পরিকল্পনা দরকার। ইতোমধ্যে নদী কমিশন কাজ শুরু করে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই খেলার মাঠ হারিয়ে গেছে স্থানীয় ভূমিদস্যুদের লোভের কবলে। মাঠগুলো উদ্ধারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় খেলাধুলার জায়গা সংকটে গ্রামের ছেলেমেয়েরাও মাদকাসক্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের পূর্বশর্তই হচ্ছে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান, তফাৎ ও বৈষম্য নির্মূল করা। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ সেøাগান বা ইশতেহার বাস্তবায়ন করা গেলে শহর-গ্রামের পার্থক্যের ব্যবধান কমে আসবে। যদি এই লক্ষ্য অর্জিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ হবে এমন একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র, যেখানে গ্রামে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ পাবে শহুরে জীবনের নানা সুযোগ-সুবিধা। গ্রামের চিকিৎসা কেন্দ্রেই পাওয়া যাবে প্রয়োজনীয় সাধারণ চিকিৎসাসেবা।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

abuafzalsaleh@gmail.com

"