পর্যবেক্ষণ

সময়কে গুরুত্ব দেওয়াই শ্রেয়

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

মাহফুজ আল মাদানী
ama ami

প্রতিটি কাজ যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য সময়কে কাজে লাগানোই হলো সময়ানুবর্তিতা। মোটকথা, সময়ানুবর্তিতা বলতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পাদনের উদ্যোগকে বোঝায়। সম্পদের চেয়ে সময়ের মূল্য অনেক বেশি। কেননা, সময়ের সদ্ব্যবহার করে সম্পদ অর্জন করা যায়। কিন্তু সম্পদ দিয়ে সময় কেনা যায় না। ফ্রাঙ্কলিন বলেন, জীবনকে তুমি যদি ভালোবাস তবে সময়ের অপচয় করো না। কারণ, সময় হচ্ছে জীবনের সমষ্টি মাত্র। প্রবাদে রয়েছে, ‘সময় এবং নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না’। সময় মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি মুহূর্তের সমন্বয়ে মানুষের জীবন। তাই প্রতিটি মুহূর্ত অতীব গুরুত্ববহ। সময়কে যারা গুরুত্ব দিয়েছেন, কাজে লাগিয়েছেন তারাই আজ সফল।

মানুষের জীবনে সময়কে যারা প্রকৃতভাবে কাজে লাগিয়েছেন, চাই সেটা ইহকালের কোনো কাজে বা পরকালের নাজাতের জন্য কোনো কাজে ব্যয় করে; তাহলে তারা অনেক বিপদাপদ এবং অনেক মন্দ কাজ হতে বেঁচে থাকতে পেরেছেন। সম্মানিত ধর্ম ইসলাম মানুষকে সময়ের গুরুত্ব দেওয়া এবং সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা দেয়। এ জন্য প্রতিটি ইবাদাতের জন্য সময়কে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। নামাজকে দিনে ও রাতে পাঁচবার আদায় করার হুকুম দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে তা আদায় করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা মুমিনদের জন্য আবশ্যক।’ (সুরা আন নিসা : ১০৩)। এতে আমরা সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা পাই। তেমনিভাবে রোজা, হজ ও জাকাতের সময় নির্ধারিত রয়েছে। পবিত্র রামজান মাস ছাড়া রোজা ফরজ হয় না। আবার হজের মাসসমূহ ছাড়া হজ আদায় করা সম্ভব নয়। নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত না হলে জাকাত ফরজ হয় না। যার মাধ্যমে এটা সুস্পষ্ট হয় যে, ইসলাম ধর্ম তার ইবাদাত-বন্দেগির মাধ্যমে সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা দেয়।

সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। নয়তো এ সময়ের জন্য আফসোস করতে হবে। তাই তো প্রবাদে বলা হয়ে থাকে, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়’। কাজেই জীবনের এক একটি মুহূর্ত মুক্তার চেয়েও দামি। কিয়ামতের দিন সময়কালকে কোথায় ব্যয় করা হয়েছে তা জানতে চাওয়া হবে। প্রতিটি মুহূর্তের হিাসাব প্রদান করতে হবে। হাদিসের ভাষায়, ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, পাঁঁটি বিষয়ে প্রশ্ন না করা পর্যন্ত কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের পদদ্বয় নড়বে না। (তন্মধ্যে দুটি হলো) তার বয়স সম্পর্কে এবং কীভাবে তা ক্ষয় হয়েছে। তার যৌবন সম্পর্কে এবং কীভাবে তা অতিবাহিত করা হয়েছে’ (তিরমিজি, মিশকাতুল মাসাবিহ-৫১৯৭, বায়হাকি-১৬৪৮)। আর মানুষের বয়স ও যৌবন উভয়টি সময়ের সমন্বয়।

সময়কে কাজে লাগানোর জন্য হাদিস শরিফে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তকে গণিমত হিসবে মনে করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে; যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপদেশ বাণী হতে সুস্পষ্ট পাওয়া যায়। হাদিসের বাণী, ‘হজরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন, পাঁচটি বস্তুকে পাঁচটির পূর্বে গণিমত জেনে মূল্যায়ন করো। বার্ধক্যের পূর্বে তোমার যৌবন কে, অসুস্থতার পূর্বে তোমার সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের পূর্বে তোমার ধনবত্তাকে, ব্যস্ততার পূর্বে তোমার অবসরকে এবং মরণের পূর্বে তোমার জীবনকে (বায়হাকি-৮০৯, শরহে সুন্নাহ-৪০২১, মিশকাতুল মাসাবিহ-৫১৭৪, আত তারগিব ওয়াত তারহিব- ৩৩৫৫)। উক্ত হাদিসের মাধ্যমে অবসর সময়কে কাজে লাগানোর জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্য হাদিসে সময়কে মানুষ অবহেলা করে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যয় করছে এবং গুরুত্ব প্রদান না করে অবসর থাকছে তার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে বলা হয়েছে, ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, দুটি এমন নিয়ামত রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে অনেক মানুষই উদাসীন। তা হলো সুস্থতা ও অবসর সময়’ (বোখারি-৬৪১২, তিরমিজি-২৩০৪, ইবনে মাজাহ-৪১৭০, মিশকাতুল মাসাবিহ-৫১৫৫)।

আমাদের সমাজে সময়কে গুরুত্ব প্রদানকারী লোকের সংখ্যা কেমন রয়েছে, তা আমাদের নিজেদের প্রতি লক্ষ করলেই সহজে অনুমেয় হবে। আমরা সময়কে কাজে লাগালে জীবনে নিজের জন্য এবং সমাজের জন্য আরো অনেক কিছু করতে পারতাম। কিন্তু আমরা অবহেলায় আর অনাদরে সময়কে এমনভাবে কাটাচ্ছি যাতে মনে হয় এ সময়ের কোনো মূল্যই নেই। অথচ এ সময়ই জীবন। আসুন সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজের এবং সমাজের জন্য কিছু করি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

mahfujnb@yahoo.com

"