পর্যালোচনা

‘... আমি জাহালম আমি নির্দোষ’

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়
ama ami

বিনা বিচার কিংবা বিনা অপরাধে কারাবাস। দুঃখজনক এ সংবাদ সচেতন মানুষকে বেশ আহত করেছে। সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় ‘ভুল আসামি’ হিসেবে তিন বছর জেল খেটে অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন নির্দোষ জাহালম মিয়া। তিন বছরের কারান্তরীণ যন্ত্রণা-দুর্ভোগ এবং আর্থিক ক্ষতিসহ মূল্যবান সময় বিনষ্টের এ দায়ভার কে নেবে?

কেনইবা বিনা দোষে জেল খাটতে হবে নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে। এর আগে সিলেটে ফজলু মিয়ার ২২ বছর এবং ঢাকায় শিপনের ১৬ বছর বিনা বিচারে কারাভোগ রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করে ছিল। রাষ্ট্রের এমন হযবরল বাস্তবতা বিলুপ্ত জমিদার প্রথায় ঘটে যাওয়া একটি কাল্পনিক গল্প দিয়ে শুরু করা যায়। কেমন ছিল তৎকালীন জমিদার বাহাদুরদের কর্মকান্ড। সেই সময়কার দুর্বলের প্রতি সবলের বাহাদুরী আর বর্তমান সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে সৃষ্ট মানবতাবিরোধী করুণ কাহিনিগুলো শত বছর আগের অমানবিক ইতিহাসকেই সামনে নিয়ে আসছে।

এটি একটি কাল্পনিক গল্প মাত্র। বর্তমান সময়ের বাস্তবতা নিরিখে এর ব্যবহার বৈকি। জমিদার পরগনার কোনো এক অংশে হাফিজ মিয়ার বাস। স্ত্রী ও সন্তানের ছোট্ট পরিবারে উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি তিনি। খাজনার বিনিময়ে প্রাপ্ত জমি চাষাবাদ আর অন্যের বাড়িতে দিনমজুরে চলে যার সংসার। অভাব-অনটনের সঙ্গে নিত্য সংগ্রাম করা ক্লান্ত মানুষটির জীবনে হঠাৎ নেমে আসবে অশুভ ছায়া, তা কখনো অনুমান করতে পারেননি ঘরে থাকা স্ত্রী ময়মুনা বেগম। যিনি প্রতিদিনের মতো সেদিন কর্মের উদ্দেশ্যে বিদায় জানালেন স্বামীকে। প্রিয়তম স্ত্রী ও স্নেহের সন্তান ঘরে ফেলে কর্মপ্রিয় হাফিজ পা বাড়ালেন কর্ম গন্তব্যে। কিন্তু কোথায় গিয়ে ঠেকল সেই যাত্রা। অবশেষে জমিদারের কারাগারই হলো হাফিজের শেষ ঠিকানা। কী অপরাধে এমন পরিণতি বরণ করতে হলো, তাও জানেননি নিরপরাধ হাফিজ।

জিঘাংসাবশত জমিদার পক্ষের কেউ হয়তো ক্ষেপিয়ে তুলেছেন রাজা মহাশয়কে। হ্যাঁ, সত্যি তা-ই। জমিদারবাড়ির কুকুরও যে জমিদার হয় সেটা তো নিরীহ হাফিজের জানা ছিল না। চাটুকারের কথামতো কাজ না করাটাই ছিল যার বড় অপরাধ। অনৈতিক চাওয়ার সঠিক বাস্তবায়ন ঘটাতে ব্যর্থ ক্ষিপ্ত মানুষটি নিরপরাধ হাফিজের বিরুদ্ধে মিথ্যায় ঠাসা বিষবাষ্প প্রবেশ করায় জমিদার কানে। সত্য-মিথ্যার কোনো পরোয়া না করে জমিদার অধিপতি হুকুম করলেন অতি দ্রুত ধরে আনতে। যেই কথা সেই কাজ। জমিদারের কথামতো নিরীহ হাফিজকে ধরে আনল তার লাঠিয়াল বাহিনী। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে প্রেরণ করা হলো কারা প্রকোষ্ঠের অন্ধকার ঘরে। ভাগ্য বিড়ম্বিত হাফিজ মেনে নিতে বাধ্য হলেন করুণ বাস্তবতা। নিজেকে বাক্সবন্দি রেখে বাইরের জীবন পরিচালনায় হিমশিম খাওয়া স্ত্রী-সন্তানের কষ্টসংবলিত কঠিন সত্যকে কীভাবে মেনে নেবেন অসহায় মানুষটি। সেটা ভেবে ভেবে মাথা টুকতে থাকেন নির্বাক দেয়ালে।

বাড়িতে অপেক্ষারত স্ত্রী ময়মুনা বেগম তখনো জানেননি স্বামী কোথায় আছেন। প্রিয়জনের খোঁজে চারপাশে দৌড়ঝাঁপ করে ক্লান্ত ময়মুনা ভাবতে থাকেন ভাগ্য নিয়ে। কষ্টের তীব্রতায় পীড়িত অবলা পরদিন জানতে পারেন জমিদারের দলবল কর্তৃক আটক নিরপরাধ স্বামীর কথা। পাগলের মতো ছুটে গেলেন জমিদার প্রাঙ্গণে। অনেক কাকুতি-মিনতি ও কান্নাকাটি; কোনো আকুতিই জাগাতে পারেনি জমিদারের অমানবিক বিবেকবোধকে।

ন্যায়-অন্যায়ের পরিমাপবিহীন রাজরাজত্বে মিথ্যার কাছে সত্যের পরাজয় আর অমানবিকতার স্পর্শে মানবিক অস্তিত্বকে নির্বাসনে পাঠানো যেখানে নিত্য নিয়ম; সেখানে অসহায়ত্বের চোখের পানি পায়ে পিষা শিশিরের ক্ষুদ্র বিন্দুকণা বৈকি। অজানা অপরাধে কারাবন্দি হাফিজ মিয়া দিনের পর দিন বিনা বিচারে ভোগ করতে থাকেন অনৈতিক দন্ড। রাজ সিংহাসনে বসা মানুষটি একবারের জন্যও ভাবেননি বন্দি আসলে কতটুকু অপরাধী। এমনকি অভিযোগকারীর ভ্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেননি। নিজের পোষা পেয়াদার কথাই সঠিক বলে ধরে নিয়ে ধ্বংস করে দিলেন একটি নিরীহ মানুষের জীবন ও একটি সাজানো সংসার।

বিচারের ন্যায্যপ্রাপ্তি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে দাঁড়ানো হাফিজ মিয়া দীর্ঘ কারাভোগের একপর্যায়ে ছাড়া পেলেন। তত দিনে পাল্টে গেছে তার জীবনের সব হিসাবনিকাশ। টগবগে যুবক থেকে বনে গেলেন দাড়িপাকা শেষ বয়সি বৃদ্ধ। মুক্ত হাফিজ অচেতন হাঁটতে থাকেন পরিবার-পরিজনের খোঁজে। কিন্তু এতগুলো বছর আপনজন বিচ্ছিন্ন মানুষটি পাবেন তো তার চিরচেনা মানুষকে। সেই চিন্তায় ব্যথিত ভীতসন্ত্রস্ত হাফিজ অবশেষে কিছুই পাননি ফিরে।

স্বামীর কারাবাসের কষ্ট মাথায় নিয়ে অনাহারী-অর্ধাহারী স্ত্রী চলে গেলেন পরপারে। বাড়িতে রেখে যাওয়া সেই ছোট্ট সন্তানটি কোথায় আছে, কেমন আছে, তাও অজানা। শেষ পর্যন্ত কোনো অবশিষ্টাংশই রইল না হাফিজ মিয়ার জন্য। জমিদার পরগনায় বসবাস করা ভূস্বামীর একতরফা কঠিন সিদ্ধান্ত ধ্বংস করে দিল একজন নিরীহ মানুষের স্বপ্ন-সাধ সব চাওয়া-পাওয়া। বিচারহীনতার এ রাজত্ব প্রমাণ করল শান্ত নিস্পৃহ হাফিজরা সর্বদাই পরাভূত আর অশান্ত অপরাধীরা যুগে যুগে পরাক্রমশালী। এভাবেই চলছে আমাদের সার্বিক সমাজ সংস্কৃতি। যেখানে বিচারের বাণী কেঁদে অস্থির অহর্নিশি।

জমিদারের অবিচারী বলি হাফিজ আর বর্তমান বঙ্গমুল্লুকে জাহালম, ফজলু ও মো. শিপনের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে কোনো ব্যবধান আছে বলে মনে হয় না। সংবাদপত্রের খবর ও দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ-এ উল্লিখিত সম্পাদকীয় বর্ণনায় বলা হয়, ‘পাঁচ বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে জাহালমের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় জাহালমকে দুদকে হাজির হতে বলা হয়। জাহালম সেসময় নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে কর্মরত ছিলেন। যথাসময়ে দুদকে হাজিরা দিয়ে জাহালম আবার তার নরসিংদীর জুট মিলের কর্মস্থলে ফিরে যান। এর দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের ওই জুট মিল থেকে জাহালমকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের ৩৩টি মামলায় জাহালমের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় দুদক। এদিকে ওই সময় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জাহালম বলেছিলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’ কিন্তু জুট শ্রমিক জাহালমের কোনো কথাই সেসময় পুলিশ কিংবা দুদক শোনেনি। এর ফলে আসল আসামি সালেকের পরিবর্তে জাহালমকেই কারাগারে যেতে হয়। যার ফলে বিনা দোষে তিন বছর কারাভোগের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে ৩ ফেব্রুয়ারি রোববার রাতে মুক্তি পান নির্দোষ জাহালম।

এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ আমরা কোন সমাজ বা রাষ্ট্রে বসবাস করছি। যেখানে প্রকৃত দোষীরা মুক্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়ায় আর নিরপরাধ নিরীহ মানুষ দিনের পর দিন কারাবরণ করেন। এটা কি কোনো সভ্য সমাজ সমর্থন করতে পারে। না, কখনো না! এর আগে মো. শিপন রাজধানী সূত্রাপুরের একটি হত্যা মামলায় ২০০০ সালের ৭ নভেম্বর থেকে কারাবরণ করে আসছিলেন। পরে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল শিপনের পক্ষে সংবাদ প্রচার করলে তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ বছর বিনা বিচারে কারাবরণের পর তাকে জামিন দেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া গত কয়েক বছর আগে সিলেটে দীর্ঘ ২২ বছর কারাবাসের পর মুক্তি পান ফজলু মিয়া নামের আরেক হতভাগা। জীবনের পাতা থেকে এতগুলো বছর হারিয়ে যাওয়ার কৈফিয়ত কে দেবে? (তথ্যসূত্র : জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক)

গুরুজনদের কাছে শিক্ষনীয় অনেক কথাই শুনে আসছি, যেমনÑ অতীত নিয়ে ভেবো না, বর্তমান নিয়ে ভাবো; যা গত হয়েছে তা ভেবে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। বরং বর্তমানকে মূল্যায়ন করো কিংবা ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই জ্ঞানীর কাজ। শিক্ষনীয় এ কথাগুলো আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, আগামীর পথচলায় প্রেরণা জুগায়। কিন্তু উপদেশমূলক এ বার্তাগুলো আমার আপনার সবার জন্যই মঙ্গলজনক বটে। তবে শিপনের ১৬, ফজলু মিয়ার ২২ এবং জাহালমের ৩ বছর ফিরিয়ে দেওয়া কি সম্ভব? জীবন থেকে খসে পড়া মূল্যবান প্রতিটি বছর এ দুজনকে যন্ত্রণা দেবে মৃত্যু অবধি। বারবার পিছু ডাকবে অতীতের এ ক্ষতচিহ্নগুলো। ইচ্ছে করলেও অতীতের এ নরক যন্ত্রণা থেকে তিনজনার একজনকেও সরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কারা প্রকোষ্ঠের এ অন্ধকার দিনগুলো তাদের জীবনকে অনেকটা অসারে পরিণত করেছে। এদের একজন জীবন সায়াহ্নে আরেকজন মধ্যবর্তী বয়সে হাবুডুবু খাচ্ছেন ভাবনার অথৈ সাগরে। বিনা বিচারে জীবনের যে মূল্যবান সময়টুকু অতীত হয়েছে, তা কি ফিরিয়ে দিতে পারবে রাষ্ট্র ও সমাজ?

একজন নিরপরাধ ব্যক্তি কেন বিনা দোষে জেলে পুড়ে অঙ্গার হবেন? এ অসহায় মানুষটির জীবনের কি কোনো মূল্য নেই? রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষমতাধর কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় ওই শিপন, রমজান ও জাহালমের কথা; তাহলে উত্তরটা কতটুকু তৃপ্তিদায়ক হবে জানি না। তবে এটা সত্য তিনজন নিরীহ মানুষের জীবন থেকে মূল্যবান সময় কেড়ে নিয়ে যন্ত্রণার গভীর তলানিতে নিক্ষেপ করা হয়েছে তাদের। যেখান থেকে উত্তরণের কোনো পথ খোলা নেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

bishwa85@gmail.com

"