পর্যবেক্ষণ

যত্নেই সুস্বাদু আম

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম। ২০১৬Ñ১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে ১২ লাখ ৮৮ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়। স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিতে অন্য ফলের সঙ্গে আমের কোনো তুলনা হয় না। তাই আমকে ফলের রাজা বলা হয়। সম্প্রতি ক্ষীরশাপাতি আম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ফলে দেশ-বিদেশে এ আমের ব্যাপক চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। মাঘের শেষে সারা দেশে আমগাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমের মুকুলের মিষ্টি গন্ধে সুবাসিত হয়ে উঠবে বাংলাদেশ। আমরা অনেকেই শখ করে আমগাছ রোপণ করি ফলের আশায়। কিন্তু সময়মতো সামান্য যতেœর অভাবে এবং পোকা ও রোগের আক্রমণের কারণে আমাদের সেই আশা পূরণ হয় না; আমের মুকুল ও গুটি ঝড়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় শাঁস। খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়ে আম। সময়মতো একটু যতœ নিলেই আমরা পেতে পারি সুস্বাদু আমের স্বাদ।

সার প্রয়োগ : আমগাছে বর্ষার আগে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে একবার এবং বর্ষার পর আশ্বিন-কার্তিক মাসে আর একবার সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের নিচে যতটুকু স্থানে গাছের ছায়া পড়ে, ততটুকু স্থানের মাটি কুপিয়ে এ সার প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পরপরই হালকা সেচ দিতে হবে। গাছের বয়স ১ থেকে ৪ বছর হলে গোবর ১৫ কেজি, ইউরিয়া ২৫০ গ্রাম, টিএসপি ২৫০ গ্রাম, এমওপি ১০০ গ্রাম, জিপসাম ১০০ গ্রাম, জিংক সালফেট ১০ গ্রাম ও বরিক এসিড ২০ গ্রাম দুই ভাগ করে বর্ষার আগে ও পরে প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স ৮ থেকে ১০ বছর হলে গোবর ২৫ কেজি, ইউরিয়া ৭৫০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ২৫০ গ্রাম, জিপসাম ২৫০ গ্রাম, জিংক সালফেট ১৫ গ্রাম ও বরিক এসিড ৩০ গ্রাম এবং গাছের বয়স ১১ থেকে ১৫ বছর হলে গোবর ৩০ কেজি, ইউরিয়া ১০০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ৪০০ গ্রাম, জিপসাম ৩৫০ গ্রাম, জিংক সালফেট ১৫ গ্রাম ও বরিক এসিড ৩০ গ্রাম একই নিয়মে প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া গাছের বয়স ১৬ থেকে ২০ বছর হলে গোবর ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১৫০০ গ্রাম, টিএসপি ৭৫০ গ্রাম, এমওপি ৫০০ গ্রাম, জিপসাম ৪০০ গ্রাম জিংক সালফেট ২০ গ্রাম ও বরিক এসিড ৪০ গ্রাম বছরে দুবারে প্রয়োগ করতে হবে।

পানি সেচ : আমের মুকুল ফোটার শেষ পর্যায়ে একবার এবং আম মটর দানার মতো হলে আর একবার বেসিন পদ্ধতিতে সেচ প্রয়োগ করতে হবে।

পোকা দমন : ফুল আসার সময় শোষক পোকা আমের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। এরা কচি ডগা ও মুকুল থেকে রস চুষে খায়। ফলে মুকুল শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে ঝরে যায়। এ ছাড়া এ পোকার নিম্ফগুলো রস চোষার সময় আঠা মধুরস নিঃসরণ করে, যা মুকুলে আটকে গিয়ে পরাগায়ন ব্যাহক করে এবং মুকুলে কাল ছত্রাকের জন্ম দেয়। এ পোকা দমনের জন্য আমগাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে একবার এবং আম মটর দানার মতো হলে আর একবার প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি ল্যাম্বডা সাইহ্যালোথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (রিভা ২.৫ ইসি অথবা ক্যারাটে ২.৫ ইসি) মিশিয়ে আমগাছের ডাল, পাতা ও মুকুলে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। আমের মাছি পোকা দমনের জন্য প্রতি গাছে একটি করে ব্যাকটোডি নামের ফেরোমন ফাঁদ লাগানো যেতে পারে। আমের ফল ছিদ্রকারী পোকার কিড়া শাঁস খেয়ে আমের ক্ষতি করে। এ পোকা দমনের জন্য আমের গুটি মার্বেল আকার ধারণ করলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি ফলিথিয়ন, ৫০ ইসি মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর দুবার স্প্রে করতে হবে।

রোগ দমন : অ্যানথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউ রোগের কারণে আমগাছের মুকুল ঝরে যেতে পারে। তাই এ রোগ দমনের জন্য মুকুল আসার ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে একবার এবং আম মটর দানার মতো হলে আর একবার প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি টিল্ট ২৫০ ইসি অথবা ২ গ্রাম অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউডিজি মিশিয়ে গাছের ডালপালা ও মুকুলে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া আমের মুকুল ও ফলঝরা রোধে প্রতি লিটার পানিতে এক মিলি মিরাকুলান মিশিয়ে ফুল ফোটার ঠিক আগে একবার এবং আম মটর দানার আকৃতি ধারণ করলে আর একবার স্প্রে করা যেতে পারে।

ফল ফেটে যাওয়া রোধ : আমের বৃদ্ধি পর্যায়ে নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে। বর্ষার শেষে গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম হারে বরিক এসিড অথবা ১০০ গ্রাম হারে বোরাস্ক সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের গোড়ার মাটিতে বোরণ প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে আমের মুকুল আসার আগে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম সলোবর মিশিয়ে গাছে স্প্রে করলেও সুফল পাওয়া যাবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লি., নাটোর

[email protected]

"