নিবন্ধ

পেশার সম্মান দায়িত্বে অন্যত্র নয়

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

অলোক আচার্য
ama ami

একটি পত্রিকায় দেখলাম দেশের বড় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের কক্ষের দরজায় সাদা কাগজে ডাক্তারদের স্যার-ম্যাডাম ডাকার কথা লিখে রেখেছেন এবং ডাক্তার সাহেবদের প্রত্যাশিত ডাক না শোনায় রোগী ও তার স্বজনদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। এ ঘটনা দেখে আমার গত বছরের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। বছর দুয়েক আগে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এক ইন্টার্ন চিকিৎসককে ২৫ বছর বয়সী কোনো এক রোগীর আত্মীয় আপা সম্বোধন করায় তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা অপর পুরুষ ইন্টার্ন চিকিৎসকের আত্মাভিমানে লাগে এবং সেই ডাক দেওয়া আত্মীয়ের কলার চেপে ধরে। ঘটনার সূত্রপাত এখান থেকেই। তারপর রীতিমতো লঙ্কাকান্ড ঘটে গেছে। সেই ভর্তিকৃত রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথের মধ্যেই মারা গেছে। এক আপা ডাকের এত মহিমা কে জানত। জানলে কি আর বেচারা আপা ডাকতে যায়! সে কি আদৌ জানত সেই ইন্টার্ন চিকিৎসকে স্যার বা ম্যাডাম ডাকতে হবে। আমার মনে হয় জানত না। আবার ইন্টার্ন চিকিৎসকও যে মনে মনে আপা ডাক শোনার জন্য একেবারেই অপ্রস্তুত ছিলেন, তাইবা কীভাবে রোগীর আত্মীয় জানবেন। ডাক্তার দেখাতে যারা আসেন তাদের মধ্যে অনেকেই কাকে স্যার বা ম্যাডাম ডাকতে হবে, সেটিও জানেন না। তবে ভালোবাসাটা নিশ্চয়ই জানেন। একটু ভালো ব্যবহার করলে নিশ্চয়ই মনে থেকে আশীর্বাদ করেন। কিন্তু সেই মেডিকেল কলেজে রীতিমতো কাগজে লিখে স্যার-ম্যাডাম ডাকার আদেশ প্রদান একটু আশ্চর্যই বটে। যেখানে কোনো মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন; সেখানে ডাকাডাকি, সম্পর্ক মেইনটেইন করাটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এমনিতেই দেখা যায়, আমাদের দেশের অধিকাংশ ডাক্তারকেই ডাক্তার সাহেব বলেই ডাকে। এত সুন্দর একটা সম্বোধন কেন ভালো লাগবে না। যদি মুখ ফসকে ভাই বলেই ফেলে তাহলে কি মহা অপরাধ হয়ে যাবে? এই পেশা এতটাই মানবিক যে, এটি সব ডাকাডাকির ঊর্ধ্বে। এমনিতে দেশে ডাক্তারদের নিয়ে নানা নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তারপর এ ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্ম দেওয়াটা কতটা যুক্তিসংগত, তা ভেবে দেখা দরকার। সৃষ্টিকর্তার পরই মানুষ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য ভরসা করে সে ডাক্তার। তাই সে অন্য সব পেশা থেকে অনেক ওপরে।

গত বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজে এক ডাক্তারকে মারাত্মকভাবে আহত করে তার হাত ভেঙে দিয়েছিল রোগীর আত্মীয়স্বজন। বেচারা ডাক্তার অত্যন্ত মনোকষ্টে আছেন। তার ভাষ্যমতে, রোগী যখন ভর্তি হয়, তখনই লাস্ট স্টেপে ছিল। আমরা এ বিষয়ে আগেই রোগীর স্বজনদের বলেছিলাম। তার পরও রোগী মারা গেলে তারা আমার ওপর হামলা করে এবং এতে আমার হাত ভেঙে যায়। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুঃখজনক। ডাক্তার এবং রোগীর সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বপূর্ণ। আজকাল ঘন ঘন দেশের বিভিন্ন মেডিকেল হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে প্রায়ই ডাক্তার, ইন্টার্ন ডাক্তার এবং স্টাফদের কথা কাটাকাটি এমনকি হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের সবার মধ্যে থেকেই ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতা উঠে যাচ্ছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারি না। কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। ডাক্তার যেমন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে, অপরদিকে রোগীর স্বজনদের ধৈর্য নেই। তাই পান থেকে চুন খসলেই ডাক্তারকে ধর। তারপর হাসপাতালে ভাঙচুর চালানো হয়। এটা একটা নোংরা মানসিকতা। একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস এসব ঘটনার পেছনের মূল কারণ। কারণ গুটিকতক ভালো মনের ডাক্তার ছাড়া আমাদের দেশে ডাক্তারবাবুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। চিকিৎসা ফি, টেস্ট ফি মিলিয়ে পকেটের মোটা টাকা খরচ হয়ে যায় ডাক্তারের কাছে গেলে। ভারতের বিখ্যাত গায়ক ‘নচিকেতার গান ও ডাক্তার তুমি কত শত পাস করে এসেছ বিলেত ঘুরে, তোমার এমবিবিএস, এফআরসিএস ঝোলাতে’ মোটামুটি ছোট-বড় সবাই শুনেছে। সেখানে ডাক্তারদের সেবার বিপরীত মুখকে স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। তবে সবাই সমান নয়। ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে অতিরিক্ত সুসম্পর্ক সবারই জানা। তাদের দেখানো ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয়। এত কিছুর পরও রোগী বিশ্বাস রাখে যে, ডাক্তারবাবু হয়তো তাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্তই নিচ্ছেন। রোগীর সঙ্গে আত্মীয়ের ব্যবহার করতে হবে। দেশে মুক্তামণির হাতে অপারেশন আর আবুল বাজনাদারের হাত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়ে সেই ডাক্তারা প্রশংসা কুড়িয়েছেন। আমরা ডাক্তারদের এই রূপটাই দেখতে চাই। সেবার আরেক নাম। আপা ডাক কি খুব খারাপ কিছু? বাংলায় এ ডাক অত্যন্ত শ্রুতিমধুর এবং আন্তরিক। বাস্তবিক অর্থে কোনো কর্মকর্তাকে যদি ভাই বা আপা বলে ডাকা হয়, তাহলে সেটা খুব বেশি প্রেস্টিজ ইস্যু হওয়ার কথা নয়। ভালোবাসার মিশ্রণ থাকে এই ডাকে। একজন ইন্টার্ন চিকিৎসককে যদি আপা ডেকেই থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার কথা নয়।সঙ্গে

এ ঘটনা এখানেই প্রথম নয়। সিরাজগঞ্জেও প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সেখানেও রোগীর মৃত্যু হয়েছিল এবং আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সেখান থেকেও ঘটনার পেছনে রোগীর স্বজনদের ইভটিজিং করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। গত বছরের মাঝে মাঝেই দেখা যায়, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিভিন্ন দাবিতে ধর্মঘট ডাকছেন। সব সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে তারা সেই ধর্মঘট সফল করে তুলছেন। তাছাড়া রোগীর সঙ্গে বাকবিতন্ডা এমনকি হাতাহাতির ঘটনা একেবারেই নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাক্তার একটা মহান পেশা। এ পেশায় জড়িতদের মানুষ সব সময় সুপারম্যান হিসেবে দেখে। কারণ এ ডাক্তার মানুষের শেষ সময়ের আশার আলো দেখাতে পারে। কিন্তু আমাদের এসব ইন্টার্ন চিকিৎসক যারা আর কয়েকদিন পরই পূর্ণাঙ্গ ডাক্তার হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেবা করতে যাবেন, তাদের এ অসহিষ্ণুতা দেখানো মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। ডাক্তার একটি সেবামূলক পেশা। সেবামূলক পেশায় থেকে ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই আসতে হবে। রোগীর সঙ্গে বা তার সঙ্গে আসা লোকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং হাতাশাজনক। ২৫ বয়সী এক তরুণের মুখে আপা ডাক শোনার পরই যদি ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তাকে আক্রমণ করে বসে; তাহলে ভবিষ্যতে এ পেশায় না আসাই উত্তম। কারণ আমাদের দেশের গ্রামেগঞ্জে খেটে খাওয়া মানুষ ঠিক সব সময় স্যার বলাটা রপ্ত করতে পারেনি। তারা সব সময় হুজুর হুজুর করতে শেখেনি। তারা বিশ্বাস করতে শিখেছে। তাই তাদের অন্তরের ডাক শুনতে হবে। আপা বা ভাই ডাক শুনেই রেগে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে স্যার বা ম্যাডাম নয় বরং আপা বা ভাই ডাকতেই অভ্যস্ত। আমাদের হবু ডাক্তারবাবুদের এসব ডাক শুনতে অভ্যাস করতে হবে। আমি নিজেও অনেক ডাক্তারকে ভাই ডাকি। এখন এতে যদি সেই ডাক্তার রেগে যান বা অপমানিত বোধ করতে শুরু করেন; তাহলে হয়তো স্যার ডাকা শুরু করব। তবে আমি আগেই বলেছি ডাক্তার শব্দটিই একটি নির্ভরতার। মরণাপন্ন রোগীর কাছে ডাক্তার একটি ভরসার নাম। সেই রোগীকে নতুন করে জীবন দেওয়ার মতো আনন্দ আর কিছুতেই নেই। তা ছাড়া দেশের জনগণ সবার ওপরে। জনগণই সব ক্ষমতার উৎস- যদি এ কথাটি আমরা মেনে চলি, তাহলে তাদের আবেগপূর্ণ কোনো সম্বোধনে এত বিড়ম্বনার কিছু নেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

"