স্মরণ

শহীদ আসাদ ও ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

রেজাউল করিম খান

আজ ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদের ৫০তম শাহাদাতবার্ষিকী। ৬৯-এর গণঅভুত্থানে শহীদ ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি শহীদ আসাদ নামে পরিচিত। কোনো কোনো মৃত্যু ইতিহাস হয়ে যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জনস্রোতের উদ্বেল জোয়ার আনে। আসাদের মৃত্যু তেমনি এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে। তার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বেগবান হয়েছিল তৎকালীন স্বৈরাচার আইয়ুববিরোধী আন্দোলন। আসাদের রক্তাক্ত শার্ট হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণের পতাকা। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আইয়ুব শাহীর পতনের দাবিতে গণআন্দোলনে পথিকৃৎ পুলিশের গুলিতে নিহত হন আসাদ। ওই সময় আরো দুজন শহীদ হন। শহীদ রুস্তম ও শহীদ মতিউর। বাম গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আসাদ শুধু ছাত্র নন, কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যেও রাজনৈতিক কাজ শুরু করেন। ২০ জানুয়ারি দুপুরে ছাত্রদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে চাঁনখাঁরপুল এলাকায় মিছিল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন আসাদুজ্জামান। পুলিশ তাদের চাঁনখাঁর ব্রিজে বাধা দেয় ও চলে যেতে বলে। কিন্তু বিক্ষোভকারী ছাত্ররা সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান নেন এবং আসাদ ও তার সহযোগীরা স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। ওই অবস্থায় খুব কাছ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে গুলি করেন এক পুলিশ অফিসার। তৎক্ষণাৎ গুরুতর আহত অবস্থায় আসাদকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার ধানুয়া গ্রামে জন্ম হয় আসাদের। পিতা আলহাজ মোহাম্মদ আবু তাহের বিএবিটি এবং মাতা মতি জাহান খাদিজা খাতুন। ছয় ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আসাদ ছিলেন চতুর্থ। আসাদের পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারে। তারপর পাঠশালা ও প্রাইমারি। শৈশবকাল থেকেই আসাদ লেখাপড়ায় মনোযোগী ছিলেন। পাশাপাশি খেলাধুলা, কবিতা আবৃতি, মাছ ধরা ও বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়া বেশ পছন্দ করতেন। প্রাইমারি শেষে ১৯৫৪ সালে তার বাবা মোহাম্মদ আবু তাহের তাকে শিবপুর হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন। শিবপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৬১ সালে মেট্রিক পাসের পর ওই বছর সিলেটের এমসি কলেজে আইএ ভর্তি হন। কলেজজীবনে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি যাবতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬২ সালের মহান শিক্ষা আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ওই কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ওই বছর আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপে যুক্ত হয়ে সার্বক্ষণিকভাবে সমাজ বদলের রাজনীতি শুরু করেন। এ সময় পড়াশোনা, ছাত্র আন্দোলন আর মেহনতি মানুষের মুক্তির লড়াই ছাড়া তার কাছে অন্য কিছু ভাবার অবকাশ ছিল না। অল্প দিনের মধ্যে সাংগঠনিক দক্ষতা ও কাজের আন্তরিকতার কারণে তিনি রাজনৈতিক মহলে বেশ পরিচিতি অর্জন করেন। যার ফলে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের ঢাকা মহানগর সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন ঢাকা হল শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স এবং ১৯৬৭ সালে একই বিভাগে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এমএ ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ওই বছর সিটি ল’ কলেজে আইনে ভর্তি হন। কিছুদিন পর তিনি মাওলানা ভাসানীর নির্দেশে মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করার জন্য নিজ গ্রামে চলে যান। নিজের ভবিষ্যতের কথা, পরিবারে কথা না ভেবে কৃষক-শ্রমিক-খেতমজুর-শ্রমজীবী-পেশাজীবীর শোষণ মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এক বছরের মধ্যে শিবপুর, মনোহরদী, রায়পুরা, নরসিংদীতে শক্তিশালী কৃষক সমিতি গড়ে তোলেন।

১৯৬৯ সালের সেই সংগ্রামময় উত্তাল দিনগুলোতে তিনি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় স্বৈরাচারী আইয়ুব শাসনবিরোধী জনমত গড়ে তুলতে থাকেন। জানুয়ারির প্রতিটি দিনই কেটেছে তার লড়াই-সংগ্রাম আর আন্দোলনে। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি স্বৈরাচারী আইয়ুব শাসনবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে আসাদ শহীদ হন। মৃত্যুকালীন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। হাজারও ছাত্র-জনতা আসাদের মৃত্যুতে একত্রিত হয়ে পুনরায় মিছিল বের করে এবং শহীদ মিনারের পাদদেশে জমায়েত হয়। কেন্দ্রীয় প্রতিরোধ কমিটি তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ২২, ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি সারা দেশে ধর্মঘট আহ্বান করে। ধর্মঘটের শেষ দিনে পুলিশ পুনরায় গুলিবর্ষণ করে। আসাদের মৃত্যুতে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সরকার দুই মাসের জন্য ১৪৪ ধারা আইন প্রয়োগ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। গণঅভ্যুত্থানের মহান জাগরণ এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে এবং ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

১৯৬৮ সালের নভেম্বরে ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শহর এবং গ্রামের শ্রমিক-কৃষক ও নিম্ন আয়ের পেশাজীবীসহ বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের মধ্যে। ৬৮ ছাত্র অসন্তোষ গণআন্দোলনে রূপান্তরিত হয় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঘোষিত গভর্নর হাউস ঘেরাও ও পরবর্তী দিনগুলোর কর্মসূচির মাধ্যমে। ৬ ডিসেম্বর ‘জুলুম প্রতিরোধ দিবস’ পালনের জন্য মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), তোয়াহার নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন এবং আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি যৌথ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পল্টন ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করে। জনসভার পর একটি বিরাট মিছিল গভর্নর হাউস ঘেরাও করে। সেখানে জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সূত্র ধরে মওলানা ভাসানী পরদিন ঢাকা শহরে হরতাল আহ্বান করেন। ১০ ডিসেম্বর ৬ দফাপন্থি আওয়ামী লীগ আহুত ‘নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়। ১৪ ডিসেম্বরে ভাসানী ন্যাপের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় ঘেরাও আন্দোলনের কর্মসূচি। সে অনুযায়ী ২৯ ডিসেম্বর পাবনার ডিসির বাড়ি ঘেরাও করার মাধ্যমে ঘেরাও আন্দোলনের সূচনা ঘটে। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ)-এর নেতৃবৃন্দ ‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে এবং তাদের ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১১ দফার মধ্যে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত ৬ দফার সঙ্গে ছাত্র সমস্যাকেন্দ্রিক দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ-সংক্রান্ত দাবিসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বস্তুত ১১ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে ছাত্র নেতারা যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি আন্দোলনগত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া এ সময় থেকেই শেখ মুজিবের মুক্তি ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদসহ (ডাকসু) ছাত্র সংগ্রাম কমিটির পূর্ব বাংলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ঊনসত্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১১ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হওয়ার পরপরই ৮ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও মোজাফফর ন্যাপসহ আটটি রাজনৈতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটি (ডাক)। তারা ফেডারেল পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার, প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমান, খান আবদুল ওয়ালী খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দাবি করে এবং দাবিগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে গণআন্দোলন জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ‘ডাক’ভুক্ত উগ্র ডানপন্থি কয়েকটি সংগঠন ছাত্র সংগ্রাম কমিটির দেওয়া ১১ দফা কর্মসূচিকে সমর্থন করতে অস্বীকার করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আন্দোলন ক্রমেই দানা বেঁধে ওঠে এবং ১১ দফার চেতনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠন এনএসএফের একটি অংশও তাদের ‘সংগ্রামী ২২ দফা’ কর্মসূচি নিয়ে প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সরকারি নিপীড়নের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রসভা ও প্রতিবাদ মিছিলের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এ মিছিলে পুলিশের গুলিতে মেনন গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম নেতা আসাদউজ্জামান নিহত হলে গণজাগরণ রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানের। ২৪ জানুয়ারি গুলিতে নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর এবং ছুরিকাঘাতে রুস্তম নিহত হলে ঢাকার পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শহরের নিয়ন্ত্রণভার সেনাবাহিনীর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় এবং অনির্দিষ্ট কালের জন্য সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হয়। পরদিন সেনাবাহিনী ও ইপিআরের বেপরোয়া গুলিতে ঢাকার নাখালপাড়ায় আনোয়ারা বেগম ঘরের ভেতর বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে তার প্রতিক্রিয়া হয় তীব্র। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক বন্দি অবস্থায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যু সংবাদে পরিস্থিতি এমন উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, বিকেলে মওলানা ভাসানী লক্ষাধিক লোকের জনসভায় দুই মাসের মধ্যে ১১ দফার বাস্তবায়ন এবং সব রাজবন্দির মুক্তি দেওয়া না হলে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি আরো বলেন যে, প্রয়োজন হলে ফরাসি বিপ্লবের মতো জেলখানা ভেঙে শেখ মুজিবকে ছিনিয়ে আনা হবে। সভাশেষে জনতা মন্ত্রীদের গৃহে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা নিহত হলে ক্রুদ্ধ ও ভাবাবেগে আপ্লুত হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে।

ঊনসত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার বিরোধিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অধ্যাপক আবদুল হাইয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার সংগ্রাম’ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের প্রবল চাপে আইয়ুব খান ঘোষণা করেন যে, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। একই দিন শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তরা এবং নিরাপত্তা আইনে আটক ৩৪ জন নেতা মুক্তি পান। গণতন্ত্রের দাবিতে স্বৈরশাসনবিরোধী এ সংগ্রামে গ্রামগঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষ তখন শুধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণ করেই থেমে থাকেনি, বরং নিজ নিজ ক্ষমতা বলয়ে অধিষ্ঠিত শোষকশ্রেণি বা তাদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে ওঠে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পেশাজীবীরা তাদের দীর্ঘদিনের অপূর্ণ দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছেন এবং রাজপথে নেমে মিছিলে উচ্চকিত হয়েছেন, হাজার হাজার শ্রমিক তাদের ন্যূনতম অধিকার আদায় করার লক্ষ্যে ঘেরাও আন্দোলনকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এমতাবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে আইয়ুব খান আহুত গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের কথা ঘোষণা করেন এবং শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী গোলটেবিল বৈঠক প্রত্যাখ্যান করেন। গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারের মুখে টিকতে না পেরে শেষাবধি ২৫ মার্চ পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হন্তান্তর করেন। সারা দেশে নতুন করে জারি হয় সামরিক শাসন।

তবে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন এবং অচিরে দেশে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা চালু করার দাবি স্বীকৃত হয়। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের ফলে আমলা, পুলিশ ও মিলিটারি সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে আগে যে ভীতি ছিল, তা বহুলাংশে হ্রাস পায়। এ ছাড়া গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শ্রেণি চেতনার উন্মেষ এবং শ্রেণি সংগ্রামের আংশিক বিকাশ সাধিত হয়। পাশাপাশি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষা বৃদ্ধি পায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করার মতো পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে।

লেখক : সাংবাদিক

rezaul.natore@yahoo.com