আন্তর্জাতিক

বৈষম্যজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ব

প্রকাশ | ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

বর্তমান সময়ের বিশ্ব পরিস্থিতি একেবারেই এক রকম নয়। তিন সময়ে তিন ধরনের, আমূল পরিবর্তন হয়েছে বিশ্ব পরিস্থিতির। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রভৃতি সব দিক থেকে এমন পরিবর্তন হয়েছে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। বিশ্ব মানচিত্র ও ভারসাম্যের যেমন পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সম্পর্ক ও প্রভাব বলয়েরও পরিবর্তন ঘটে চলেছে। চিন্তা- চেতনা, মনমানসিকতা, নীতিনৈতিকতা, জনমনস্তত্ত্ব প্রভৃতিরও পরিবর্তন হয়েছে। অনেক সময়েই মনে হয়, কেউ যদি সত্তরের দশক থেকে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে এখন হঠাৎই জেগে ওঠে, তবে তিনি পৃথিবীকে চিনবে না, অনেক কিছুই বুঝবে না। মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করা প্রতিটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলেও অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দিক দিয়ে দুর্বল ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো তার নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো সর্বদাই বৃহৎ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর দ্বারা নিরাপত্তা হুমকিতে থাকে এবং নতুন বছরেও একই ধারা অব্যাহত থাকবে। পৃথিবীতে সংকট বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সংকট যত বাড়ছে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ততই হুমকির মধ্যে পড়ছে। দিকে দিকে যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, অস্ত্রের ঝনঝনানি। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অসমতার কারণে মানুষের মধ্যে অসমতা ও বৈষম্য বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে, বিশ্বায়ন আর মুক্তবাজার অর্থনীতি সংকট মোচনের পরিবর্তে বিশ্বব্যাপী অসাম্য-বৈষম্য অনেক গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে ধনী-দরিদ্রের তারতম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীতে গরিব মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সম্পদের বৃহদাংশ গুটিকয়েক সংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

অনেকগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বুকের ওপর অগণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন দৃঢ় হতে দেখা যাচ্ছে। ফলে মানুষের ভোটাধিকারসহ মৌলিক মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। এসব কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়, উন্নয়ন, নিরস্ত্রীকরণ, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার, এ চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার ঝুঁকিতে আছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, গোটা বিশ্বব্যবস্থা নিম্নবর্ণিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ঝুঁকিতে আছে এবং নতুন বছরেও বিশ্ববাসীকে এসব হুমকি মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। বিশ্ববাসীর সামনে গুরুতর হুমকি বা সংকটগুলো হলো অনেক তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বলা চলে : অর্থনৈতিক ও সামাজিক হুমকি, যার মধ্যে আছে দারিদ্র্য, মারাত্মক ধরনের জীবন সংহারী সংক্রামক রোগ-ব্যাধি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট। এ ছাড়া আন্তরাষ্ট্র সংঘাত। অন্তরাষ্ট্র তথা অভ্যন্তরীণ সংঘাত, গৃহযুদ্ধ, গণহত্যাসহ ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংঘাত, নিষ্ঠুর ও নৃশংস অমানবিক কর্মকান্ড, মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসমূহের অবদমন। সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এবং আন্তরাষ্ট্র সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের ব্যাপকতা ও সক্রিয়তা। পারমাণবিক, রেডিওলজিক্যাল, কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল এবং অন্য মারাণাস্ত্র উৎপাদন মজুত ও বিপণনের জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক তীব্র প্রতিযোগিতা এবং এমনকি, রাষ্ট্রবহির্ভূত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর এসব মারাত্মক মরণঘাতী অস্ত্র সংগ্রহের প্রচেষ্টা, গোটা বিশ্বব্যবস্থার শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপরোক্ত সামগ্রিক বিষয়গুলো ২০১৯ সালের বিশ্বব্যবস্থার শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে অব্যাহত থাকবে এবং এমনকি, নতুন বছরে বিশ্বব্যবস্থা বড় ধরনের যুদ্ধের হুমকিতে পড়ারও শঙ্কা রয়েছে। তবে এটা অস্বীকার করা যায় না যে, শত সমস্যা, সংকট ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পৃথিবী এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে চলছে। এ সময়কালে বিশ্বে বেশ কিছু ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে এবং চলতি বছরেও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন : যোগাযোগ, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক মাধ্যমসমূহের বিস্তার ও বিস্তৃতি, দৃশ্যমান সামাজিক আন্দোলনের সক্রিয়তা, আন্তআঞ্চলিক সহযোগিতার প্রসার, দৃশ্যমান নারী উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীদের অংশ গ্রহণের বিস্তৃতি এবং সর্বোপরি বিভিন্ন মহাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, যা অব্যাহত থাকবে এই নতুন বছরেও। যদি এসবের প্রসারতা বৃদ্ধি পেলে বা অব্যাহত থাকলে মানব নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায় মানব সম্প্রদায়ের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ, যুদ্ধভীতি দূর করা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা পরিহার করা এবং সেই সাথে মানুষের নিরাপত্তা বিধান ও মৌলিক মানবাধিকারসমূহ নিশ্চিত করে একটি শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে বরে প্রতীয়মান ও দৃশ্যমান হচ্ছে এবং সেটি বর্তমান বছরে আরো গতিশীল হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

তা সত্ত্বেও এটি দৃশ্যমান ও বাস্তবতা যে, সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার সামনে রয়েছে কঠিন সংকট, সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ-২০১৯ সালের বছর জুড়েই বিশ্বব্যবস্থাকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চলতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে। যেমন : দেশে দেশে, অঞ্চলে-অঞ্চলে হানাহানি, সংঘাত, সংঘর্ষ, অস্ত্র উন্নয়নের প্রতিযোগিতা চলতেই থাকবে, ক্ষমতালোভীদের কারণে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অবদমিত হবে ইত্যাদি কারণে মানব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও জীবন ধারণের নিশ্চয়তা বিধান করা দুঃসাধ্য হতে পারে নতুন বছরে। নতুন বছরে মানব সম্প্রদায় নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পতিত হতে পারে এবং বঞ্চিত হতে পারে মৌলিক মানবাধিকার থেকে। তাই নতুন বছরের পৃথিবীর অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো মানব নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার ঝুঁকি এবং সে সাথে রয়েছে যুদ্ধের ঝুঁকি, এ সকল সংকট থেকে বিশ্বব্যবস্থাকে বের করে নিয়ে আসাটা বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করা হচ্ছে। চলতি সালেও বিশ্বব্যাপী অস্ত্র প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

অপরদিকে নতুন নতুন উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো পারমাণবিক অস্ত্র লাভের চেষ্টায় আরো সক্রিয় ও তৎপর হবে। অনেক ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রও আধুনিক সমরাস্ত্র সংগ্রহ করে শক্তি অর্জন করতে গিয়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় শামিল হয়ে পড়বে। আর অস্ত্র উৎপাদন ও রফতানিকারক রাষ্ট্রগুলোও অধিক মুনাফার জন্য এসব দুর্বল ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে অস্ত্র ক্রয়ে উৎসাহিত করবে। এভাবেই চলিত সালে অস্ত্র প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে। ফলে চলমান বিশ্বব্যবস্থা ও মানব সম্প্রদায়ের জন্য কঠিন সময়কাল অপেক্ষা করছে চলিত এই নতুন বছরে।

নতুন বছর তাই চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠবে বিশ্বব্যবস্থার জন্য। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডও নতুন বছরের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। ঝিমিয়ে পড়া সংগঠনগুলো আবারো সক্রিয় হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে পারে। এছাড়াও এসব সংগঠনের হাতে থাকা অস্ত্রগুলোও বিশ্বব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকবে। এসব কিছুই নতুন বছরের জন্য চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করার ওপরই নির্ভর করছে নতুন বছরের বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে বা কোন দিকে পরিচালিত হবে বিশ্বব্যবস্থা। সম্পদের সুষম বন্টন এবং অর্থনীতিতে সমতার নীতি বাস্তবায়ন করে পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা তথা বেঁচে থাকার সকল মৌলিক অধিকার নিয়ে জীবন ধারন করার জন্য যে নিরাপত্তা দরকার, তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা, এটিই বর্তমান পৃথিবীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ও হুমকি এবং সত্যি বলতে কি বর্তমান বছরেও সে চ্যালেঞ্জ অব্যাহত থাকবে। ক্ষেত্র বিশেষে সংকট আরো গভীরতর হতে পারে। মূলত; নানামুখি সংকট, সমস্যা ও বিপদজনক ঝুঁকির মধ্য দিয়েই পৃথিবীবাসীকে চলতে হবে নতুন বছরেও। কিন্তু বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব ও সংকট অব্যাহত থাকবে জাতিতে জাতিতে। থাকবে ক্ষমতা, আধিপত্য ও প্রতিপত্তি অর্জনের প্রতিযোগিতা। এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার ফলে নতুন বছরেও পৃথিবীতে যুদ্ধের হুমকি অব্যাহত থাকবে এবং এমনকি, সীমিত পরিসরে পারমাণবিক যুদ্ধেরও শংকা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

এছাড?াও নতুন বছরের শুভক্ষণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের হাজারো প্রত্যাশার অন্যতম প্রধান আকাংখাই হলো একটি নিরাপদ পৃথিবী, যেখানে মানুষজন নিরাপত্তার সাথে নিজেদের অধিকার নিয়ে নিরাপদে জীবন নির্বাহ করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ নিরাপত্তার সাথে ন্যূনতম অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার প্রত্যাশাটাই মানুষের মধ্যে প্রবল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্ব বিবেকের এই প্রচেষ্টা থাকলেও যদি আমরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেই তবে দেখা যাবে যে, ওই দিনগুলোতে বিশ্ব ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে তেমন কোনো বিবেক জাগ্রত হয়নি। বরং দেশে দেশে বুদ্ধিজীবীরা সাধারণভাবে স্ব-স্ব দেশের যুদ্ধবাজ শাসক ও শোষণকারীদের পক্ষে দাঁড়ায়। জ্যাতাভিমান ও শ্রেষ্ঠত্ব তখন বিবেককে নাড়া দিতে সক্ষম হয়নি। অন্ধত্ব ও গোঁড়ামি মানবসমাজকে পদানত করে রাখতে তখন সক্ষম হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাপর বিশ্ব ও বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে মনে হবে, মানবজাতি শান্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও প্রগতির দিকে ধাবমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক অবস্থার পতন, সদ্য স্বাধীন দেশসমূহ তথা তৃতীয় বিশ্বের উদ্ভব, দেশে দেশে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার জয়গান অনেক আশা ও স্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল মানবজাতির মনে। বিশ্ব ও উপমহদেশীয় পরিস্থিতি কোনো পর্যায়ে গিয়ে কী রূপ নিবে, তা এখনই বলে ওঠা কঠিন। এই অবস্থায়ও দেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন ও উন্নয়নের জন্য প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করা একান্ত প্রয়োজন। পরিস্থিতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে যেমন দেশ জাতি ও জনগণের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে, উল্টোদিকে পরিস্থিতির শিকার হওয়া চলবে না। শোকের মাস শেষের এটাই জনগণের একান্ত কামনা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক

[email protected]

"