পরিবেশ

অতিথি পাখির প্রতি মানবিক হন

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

সাধন সরকার

বাংলাদেশের নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিল, মোহনা-চরাঞ্চল-দ্বীপ, পুকুর-জলাশয় এখন অতিথি পাখির বিচরণে পরিপূর্ণ। প্রতি বছর শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে অতিথি বা পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। শীতপ্রধান দেশের তুষারপাত থেকে বাঁচতে, অস্তিত্ব রক্ষার্থে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশের মতো কম শীতপ্রধান দেশে অতিথি পাখির আগমন ঘটে। পৃথিবীতে ১০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার প্রজাতির পাখি পরিযায়ী। এরা নিজ দেশের তীব্র্র শীত থেকে বাঁচতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আসা-যাওয়া করে থাকে। সাইবেরিয়া অঞ্চল, ইউরোপ, এশিয়া, হিমালয় থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আমাদের দেশে আসে। শীতটা শেষ হলে আবার ওরা পাড়ি জমায় নিজ দেশে। যেসব অতিথি পাখি শীতের সময় আমাদের দেশে আসে তাদের মধ্যে রয়েছে- লালবুবা, বক, পানকৌড়ি, শামুককনা, গাঙ, কবুতর, থাম, পাইজ, জলপিপি, পেরিহাঁস, পাতিবাটান, পাতিকুট, গিরিয়া, পাতারি ইত্যাদি।

শীত আর অতিথি পাখি যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশে অতিথি পাখির বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত বহু স্থান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়, সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপ, টাঙ্গুয়ার হাওর, বাইক্কা বিল, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, নিঝুম দ্বীপ, ঢাকার আশেপাশের বিভিন্ন জলাশয়, বিভিন্ন চর-দ্বীপ ইত্যাদি। বছরের পর বছর ধরে শীত মৌসুমে বাংলাদেশে অতিথি পাখি আসলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কারণে অতিথি পাখি আসাটা কমে যাচ্ছে! এ বছর খুব কম সংখ্যক অতিথি পাখি বাংলাদেশে এসেছে। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। অনাবাসিক অতিথি পাখির নিরাপদ জীবনযাপন ও পরিবেশ দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। অনেকে শখ মেটাতে শীত মৌসুমে অতিথি পাখি শিকারে বের হন। অনেকে আবার এ মৌসুমটাতে পাখি শিকারকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। পাখি শিকারিরা গুলি করে (বিশেষ করে এয়ারগান দিয়ে), বিষটোপ ব্যবহার করে, জাল পেতে অতিথি পাখি হত্যায় মেতে ওঠেন। শীত মৌসুমে বাজারে সবার সামনে অতিথি পাখি বিক্রিও করতে দেখা যায়! অনেকে আবার রসনা তৃপ্তিতে বাড়িতে পরিযায়ী তথা অতিথি পাখি কিনে আনেন। পাখি শিকার করা মানে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার পরিচয় দেওয়া। যে পাখিরা শুধু জীবন ও খাদ্যের সন্ধানে আমাদের মতো দেশে আসে; নিজেদের অসচেতনতা ও লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু লোক সেই অতিথি পাখিরই জীবন বিনষ্ট করছে বা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে। মানবিক মানুষের এমন অমানবিক আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অতিথি পাখি প্রকৃতি-পরিবেশের বন্ধু। অতিথি পাখি শুধু জলাশয়ের অপরূপ সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, আমাদের উপকারও করে। ফসলের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে অতিথি পাখি কৃষককে সহায়তা করে। মানুষের মনের খোরাক বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অতিথি পাখির অবদান রয়েছে। যে দেশে পাখি বেশি, সে দেশে পর্যটকের সংখ্যাও বেশি। এ বছর অতিথি পাখি কম আসার পেছনে মূলত মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডই দায়ী। জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে পাখিরা বিষে আক্রান্ত মৃত কীটপতঙ্গ খেয়ে মারা যাচ্ছে। প্রকৃতি-পরিবেশ উজাড় হয়ে যাচ্ছে। জলাশয়ের দূষণ বাড়ছে, ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আবার অতিরিক্ত দর্শণার্থীর কোলাহল অতিথি পাখির স্বাভাবিক জীবনাচরণ বিনষ্ট করছে। তাই প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষায় মানুষের মানবিকতা ও সচেতনতাই অতিথি পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম। বিশে^র প্রতিটি দেশকেই অতিথি পাখি রক্ষার্থে এগিয়ে আসতে হবে। অতিথি পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বন্যপ্রাণী আইন-২০১২ অনুযায়ী, অতিথি পাখি হত্যার দায়ে একজন অপরাধীকে সর্ব্বোচ এক বছরের কারাদ- অথবা সর্ব্বোচ ১ লাখ টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া পরিযায়ী (অতিথি পাখি) পাখির মাংস, দেহের কোনো অংশ ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি কাজে কেউ জড়িত থাকলে তার জন্য শাস্তির যথাযথ বিধানও রয়েছে। দুঃখের বিষয়, আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ নেই। অতিথি পাখি হত্যার সঙ্গে জড়িত অমানবিক মানুষগুলোর কিছুই হচ্ছে না। যা হোক, পাখি শিকারিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যেকটি সচেতন নাগরিককে অতিথি পাখি রক্ষায় একযোগে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অতিথিসহ সব পাখি প্রকৃতির অলঙ্কার, সম্পদ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই প্রকৃতি-পরিবেশ পরিবর্তন হচ্ছে। এতে করে পাখি প্রজাতির প্রতি হুমকি তৈরি হচ্ছে। তাই, পাখি রক্ষার্থে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। অতিথি পাখিরা আমাদের দেশে আসুক। কলকাকলিতে ভরে উঠুক জলাশয়ের চারপাশ। বাড়–ক সৌন্দর্য, ভালো থাকুক পরিবেশ। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই অতিথি পাখির প্রতি মানবিক হওয়া জরুরি।

লেখক : কলামিস্ট

[email protected]

"