মতামত

বাসযোগ্য নগরীর প্রত্যাশায়

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

রেজাউল করিম খোকন
ama ami

বর্তমান বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার শীর্ষে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। ঢাকার অবস্থান দামেস্কের এক ধাপ ওপরেই। আর আফ্রিকার দরিদ্র দেশ নাইজেরিয়ার লাগোসের অবস্থান ঢাকার পর। দামেস্ক আর লাগোসের কাতারে থাকা ঢাকা শহরের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রায় সবকিছুরই অবনতি ঘটছে। যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী ইকোনমিস্টের মালিক প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা ইউনিট ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদনে বসবাসের সূচকে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি তারা তালিকাটি প্রকাশ করেছে। বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। গত বছরের সূচকের চেয়েও ঢাকা দুই ধাপ পিছিয়েছে। পাঁচ ধরনের বিষয় বিবেচনায় রেখে বিশে^র ১৪০টি শহরের বাসযোগ্যতা নিয়ে এবারের সূচক তৈরি করা হয়। বিষয় পাঁচটি হলো অবকাঠামো, স্থিতিশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশ। এ তালিকায় ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৯তম। গত বছর এ অবস্থান ছিল ১৩৭তম। বসবাসযোগ্যতার নিরিখে গত সাত বছরে ঢাকা শহরের কোনো উন্নতি হয়নি। ২০১২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত প্রতিবারই বসবাসের অযোগ্য ১০ শহরের তালিকায় শেষের দিকে ছিল ঢাকা। অনেকেই ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা ইউনিট ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের গবেষণা রিপোর্টের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ঢাকার পরিবহন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা খাতসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক অবনতি হয়েছে। ঢাকার জনসংখ্যা যে হারে বাড়ে, সে হারে পৃথিবীর কম শহরে জনসংখ্যা বাড়ে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নতিও হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতির কারণে গাড়ি বাড়ছে শহরে, কিন্তু সে তুলনায় রাস্তা বাড়ছে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেটাকে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের নগর মহানগরগুলো অপরিকল্পিত, অপরিচ্ছন্ন ও নানা অনিয়মে পরিপূর্ণ। গণপরিবহনের বেহাল দশা, অপরিকল্পিত, অপরিচ্ছন্ন ও নানা অনিয়মে পরিপূর্ণ। যাবতীয় অনিয়মে পূর্ণ আমাদের অপরিকল্পিত নগরীগুলোর এই বেহাল দশার জন্য দায়ী কে? এই দুর্বিষহ নাগরিক জীবন, অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টির জন্য শুধু রাজনৈতিক শাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করা যায় না বরং এ জন্য নাগরিক ব্যর্থতাও কমবেশি দায়ী। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ চায় নগরবাসী। আর এ জন্য দেশে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা না করে নাগরিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব। এ জন্য নাগরিক সচেতনতা প্রয়োজন। সচেতন নাগরিকরাই পরিবর্তনের তাগিদে আরো সক্রিয় হবেন এবং বিভিন্ন ধরনের সংগঠন গড়ে তুলবেন।

বাংলাদেশে নগরায়ণ সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুশৃঙ্খলভাবে না হওয়ায় এলোমেলো, বিক্ষিপ্তভাবে চলছে পুরো ব্যাপারটি। এ কথা না মেনে উপায় নেই যে, নগরায়ণের ফলে আমাদের সমাজব্যবস্থায় অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামীণ আবহ থেকে বেরিয়ে উন্নত জীবনযাপন প্রক্রিয়ার মধ্যে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে নগরায়ণ। নগরায়ণের ফলে অনেক সুযোগের সৃষ্টি হলেও তা বহু সমস্যার সৃষ্টি করেছে। পরিবেশ দূষণ, নাগরিক সেবার অনুপস্থিতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং অপরাধের বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। নগরায়ণের ফলে যে সুযোগগুলো সৃষ্টি হয়েছে, তা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক চর্চাসহ অন্য অনেক নাগরিক সুবিধা। নগরায়ণ না হলে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত আমাদের সমাজব্যবস্থা। উন্নত এবং আধুনিক সময়ের উপযোগী সামাজিক কাঠামো গড়তে নগরায়ণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও আমাদের এখানে এর মন্দ প্রভাবগুলো নানাভাবে পীড়া দিচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ক্ষেত্র বিশেষে নগরীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে দিনে দিনে। দেশের প্রত্যেকটি নগরের এবং শহরের যথাযথ বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য সেখানকার পরিবেশ, জনসংখ্যা, বসবাসকারীদের রুচি, পছন্দ, জীবনাচরণ ইত্যাদির আলোকে সঠিক এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনা, উন্নত আধুনিক ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং নগর ব্যবস্থাপনা নীতিগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।

নগরজীবনে প্রাত্যহিক অনেক সমস্যার মধ্যে অসহনীয় যানজট, গণপরিবহন সংকট দিনে দিনে আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। প্রতিদিন ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামার পর পরিবহন সংকটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। বাস, রিকশা, সিএনজির জন্য অস্থিরভাবে ছোটাছুটি করেন অফিসগামী নারী-পুরুষ যাত্রী। একটি বাস এলে তাতে চড়তে একসঙ্গে অনেকেই প্রতিযোগিতায় নামেন। যারা প্রতিযোগিতা করে জিততে পারেন তারাই বাসে চড়ার সুযোগ পান। নারী যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রা আরো বেশি। তারা পুরুষদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির লড়াইয়ে পেরে উঠেন না প্রায় সময়ে।

নগরজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা প্রয়োজনীয় সংখ্যক গণশৌচাগারের অভাব। এই সমস্যাটি নাগরিকদের প্রতিদিনই চরম অস্বস্তিতে ফেলছে। জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিশে^র সবচেয়ে দ্রুততম জনবহুল শহর। বন্দর নগরী চট্টগ্রামও এই সময়ে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানাবিধ প্রয়োজনে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় এক কোটি মানুষ বাসা থেকে বের হয়। অধিকাংশ মানুষেরই মলমূত্র ত্যাগের জন্য শৌচাগার প্রয়োজন। কিন্তু এখানে চাহিদার তুলনায় শৌচাগারের সংখ্যা খুবই কম। যেগুলো রয়েছে সেগুলোর অবস্থাও খুব খারাপ। অধিকাংশই ব্যবহার অনুপযোগী। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলোর বেহাল অবস্থা তুলে ধরতে একটি ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানে ফুটে উঠেছে ঢাকার গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেটের বেহাল দশা। ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ গণশৌচাগার ব্যবহারের কথা চিন্তা করতে পারেন না। শহরের বিভিন্ন ব্যস্ততম স্পট, শপিংমল, মার্কেট, বিভিন্ন অফিসপাড়া, বিনোদন স্পট, আদালত এলাকা, স্টেডিয়াম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাস ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহন টার্মিনালগুলোতে আবশ্যিকভাবে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট বা গণশৌচাগারের ব্যবস্থা করতে হবে। এবং এগুলো পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কোনো রকম ত্রুটি, বিচ্যুতি, গাফিলতি, অযতœ অবহেলা দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না।

বড় বড় শহরগুলো নানা স্বপ্নের হাতছানি দেয়। আর সেই হাতছানিতে ভিড় করে লক্ষ লক্ষ মানুষ। শহরে সুস্থ সুন্দর এবং নিরাপদে জীবনযাপন করাটা এখন রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে উঠেছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের খেসারত দিতে হচ্ছে সবাইকে। ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। একজন নাগরিক হিসেবে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা, উন্নত আধুনিক জীবনযাপনের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন, আনন্দ বিনোদন, নিরাপত্তা প্রভৃতি সবাই যার যার অবস্থান থেকে আশা করে। এই আশা করাটা অন্যায় আবদারও নয়। এটা সবার নাগরিক অধিকার। বেশির ভাগ মানুষ এই নগরে নানা অভাব অভিযোগ আর সমস্যা সংকটকে সঙ্গী করে বেঁচে আছে। জলাবদ্ধতার কারণে বর্ষাকালে ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে মাঝে মাঝে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। একইভাবে ওয়াসার পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা অভিযোগ। গ্যাস সংকট যেন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার, পথে ঘাটে ময়লা আবর্জনার স্তূপ, অপরিকল্পিত বাড়ি ঘর নির্মাণের কারণে আলো বাতাসের অপর্যাপ্ততা নিয়ে অস্বস্তিকর দমবন্ধ হওয়া পরিবেশে জীবনযাপন ইত্যাদি দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে রেখেছে অধিকাংশ নগরবাসীকে।

এমন নগরজীবন কেউ প্রত্যাশা করে না কোনো সময়ে। অপরিকল্পিত নগরায়নের শিকার সাধারণ নগরবাসী আর কতদিন দুর্ভোগের শিকার হতে থাকবেনÑ এটাই হলো প্রশ্ন। নিজেদের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করে তোলার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে সমস্যা, সংকটের পাহাড় দিনে দিনে বেড়ে পর্বতে পরিণত হবে। তখন আমাদের নগরগুলো আর বসবাসযোগ্য থাকবে না, একসময়ে পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হবে।

লেখক : ব্যাংকার

"