পর্যটন

ভ্রমণ বিলাসের প্রবণতা ইতিবাচক

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

এস এম মুকুল

বাংলাদেশের পর্যটন স্থান বললেই কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, সুন্দরবন আর পার্বত্য চট্টগ্রামসহ হাতেগোনা কয়েকটি স্থানের কথাই শোনা যায়। অথচ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়াখ্যাত বাংলাদেশের ৬৪ জেলা, ৪৯১ উপজেলার মধ্যে প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায়ই ঘুরে দেখার মতো অনেক স্থান রয়েছে। এগুলো পর্যটন স্থানে পরিণত করতে প্রয়োজন প্রচার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। ডব্লিউটিটিসির গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন খাতে সম্পৃক্ত। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে এ খাতে শুধু প্রত্যক্ষভাবেই ১২ লাখ ৫৭ হাজার লোক কাজ করবে। সংস্থাটির মতে, বিশ্বের ১৮৪টি পর্যটনসমৃদ্ধ দেশের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬০ নম্বরে। দশ বছর পর বাংলাদেশ ১৮তম অবস্থানে চলে আসবে। ফলে জাতীয় আয়ে বড় অবদান রাখবে উদীয়মান এ শিল্প। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি এগিয়ে নিতে ন্যাশনাল ট্যুরিজম কাউন্সিল একটি ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান (টিএমপি) তৈরি করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫ বছরের স্বল্পমেয়াদি, ১০ বছরের মধ্যমেয়াদি এবং ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ধাপে মনোরম এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নসহ বহুমাত্রিক কাজ শুরু হবে। ২০১৮ সালের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আনুমানিক ১০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১০ শতাংশ এই খাত থেকে আয় করা সম্ভব। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, ২০১৩ সালে পর্যটন খাতে ১৩ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই খাতে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পর্যটন খাতের অবদান দাঁড়াবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের অভিমত, এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ ও অনুকূল সুবিধা সৃষ্টি করতে পারলেই বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার থেকে বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করা সম্ভব।

আশার খবর হচ্ছে, দেশ ঘুরে দেখার আগ্রহ বাড়ছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। পড়াশোনা ও কাজের ফাঁকে এখন গ্রুপভিত্তিক তরুণ-তরুণীরা দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, পর্যটনে বাড়ছে নারীদের আগ্রহ। বাংলাদেশে নারীরা এখন একাই বেরিয়ে পড়ছে। আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, বিগত ১০ বছরে ঈদকে কেন্দ্র করে নাগরিকদের মধ্যে ভ্রমণ প্রবণতা নতুন আশাবাদ জাগাচ্ছে। ঈদ পর্যটনে বাংলাদেশের সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলেছে। কারণ ব্যস্ত কর্মজীবনে ঈদের ছুটিকে মানুষ এখন গ্রামের বাড়ি বেড়ানোর পাশাপাশি নিজ এলাকা ও অন্যান্য স্থানেও ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। বিশ্বের বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ঈদ পর্যটনকে কেন্দ্র করে। তাই আমাদের দেশেও ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পও জড়িত হতে পারে। পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রতি ঈদে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করে কক্সবাজার, যেখানে সারা বছর কক্সবাজার ভ্রমণে যায় ১৫ থেকে ২০ লাখ পর্যটক। ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষ পর্যটন স্থানগুলো ছাড়াও জেলা পর্যায়ে ভ্রমণে বিশেষ প্যাকেজ থাকলে ঈদ পর্যটনের আয় ও জনপ্রিয়তা আরো বাড়বে।

পর্যটন শিল্প বিকাশের অবারিত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। আশার খবর হচ্ছে, এখন ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ ঘুরতে যায়। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩০ লাখ। ২০০০ সালের দিকে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ থেকে ৫ লাখ। বিদেশি পর্যটক নির্ভরতা ছাড়াও দেশীয় পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ সুবিধা, আকর্ষণীয় অফার এবং পর্যটন ব্যয় সীমার মধ্যে থাকলে দেশের মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। আর দেশের মানুষকে দেশ দেখানো- স্লোগানে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এক হিসেবে বলা হয়, ১৬ কোটির বেশি মানুষের বাংলাদেশ গড়ে প্রতিবছরে ১০ ভাগও যদি দেশ ঘুরে দেখে তাহলে বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক তৎপরতা সৃষ্টি হবে। মনে রাখা দরকার পর্যটন বিকাশে অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং জিনিসপত্রের মান ও দামের সামঞ্জস্যতা এই তিনটি বিষয়ের খুব গুরুত¦ পূর্ণ। পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকার সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অধিদপ্তর ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি নীতিমালা গ্রহণ করলে খুব দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। কারণ দেশের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সৌখিনতা ও ভ্রমণবিলাশের প্রবণতা বাড়ছে। এটি খুবই ইতিবাচক একটি দিক। কারণ এখন দেশের মধ্যবিত্ত এমনকি নি¤œবিত্তরাও সময়-সুযোগ পেলেই পরিবার পরিজন নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে পর্যটনের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ক্ষেত্রে ফেসবুক, ই্উটিউবসহ সহ সামাজিক মাধ্যমগুলো বিরাট ভূমিকা রাখছে। বিশেষত ফেসবুকের কল্যাণে ভ্রমণপিপাসু মানুষের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর ছবি ও ভিডিও ক্লিপগুলো সর্বসাধারণকে ভ্রমণে উৎসাহী করে তুলছে। এছাড়া পর্যটন নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখালেখি হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে নতুন নতুন পর্যটন কেন্দ্র্রের আবিষ্কার এবং ভ্রমণে এসব স্থান ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত। পরোক্ষভাবে এই খাতে প্রায় ৮০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বিশ্বব্যাপী পর্যটকরা ভ্রমণ খাতে ব্যয় করে ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ৮৩টি দেশের অর্থনীতির প্রধান ৫টি খাতের মধ্যে পর্যটন শিল্প একটি।

দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন ঘটছে পর্যটন শিল্প বিকাশের ফলে। বর্তমানে এ শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। কারণ একজন পর্যটক এলে ৪ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। সেই হিসাবে যদি আমাদের দেশে ১ লাখ পর্যটক আসে তাহলে ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ গত আট বছরে ছয় হাজার ৬৯৯ দশমিক ১৬ কোটি টাকা পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে আয় হয়েছে। ২০১৬ সালে পর্যটন খাত থেকে ৮০৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে এক হাজার ১৩৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে এক হাজার ২২৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ৯৪৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ৮২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ২০১১ সালে ৬২০ কোটি ১৬ লাখ টাকা, ২০১০ সালে ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং ২০০৯ সালে ৫৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা আয় হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৪১ শতাংশ বা প্রায় সাড়ে ৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটন খাতে। এই শিল্পের মাধ্যমে দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ বা মূল্য সংযোজন হচ্ছে ১৬ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। বিভিন্ন পরিসংখ্যানের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা গেছে, পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হোটেল ব্যবসা, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পরিবহনসহ বিনোদন খাত থেকে এ আয় হচ্ছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে ২০২০ সাল নাগাদ পর্যটন থেকে প্রতিবছর ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৫১টি দেশের পর্যটক আমাদের দেশে আসবে। তখন পর্যটন খাতের অবস্থা কী হবে, এ বিষয়ে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই।

দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার ও উদ্যোগ। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও শুধু প্রকৃতির দানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে প্রয়োজনÑ পর্যটনকে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সুযোগ-সুবিধা দিলে পর্যটকরা অধিক হারে আকৃষ্ট হতে পারে। দেশের আনাচে-কানাচে অরক্ষিত ঐতিহ্যম-িত দর্শনীয় স্থানগুলোকে সুরক্ষিত করা হলে স্থানীয়ভাবে বহু লোকের নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ট্যুরিস্ট পুলিশ বাড়ানো দরকার। পর্যটন শিল্প নিয়ে লেখালেখি ও ওয়ার্কশপ, সেমিনার, প্রদর্শনী বাড়ানো দরকার। পর্যটনবিষয়ক লেখালেখিকে উৎসাহিত করতে পর্যটন করপোরেশন পুরস্কার প্রবর্তন করতে পারে। মোটকথা সার্বিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া পর্যটনের প্রসার ঘটানো কঠিন হবে। বিশ্বের কয়েকটি দেশ একমাত্র পর্যটনকে অবলম্ব^ন করেই সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করছে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই বাংলাদেশে। আমাদের দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঠিকমতো ও পরিকল্পিতভাবে করতে পারলে সুইজারল্যান্ড, পাতায়া, ব্যাংককের মতো ট্যুরিজম এখানেও গড়ে উঠতে পারে।

লেখক : কৃষি-অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

"