আন্তর্জাতিক

ব্রেক্সিটকে ঘিরে ইউরোপের রাজনীতি

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাথার মুকুট ভারতীয় উপমহাদেশের ওপর নিজেদের শাসন হারানোর মুখে বিশ্বযুদ্ধে দীর্ণ ব্রিটেন তখন ধনে-মানে বেশ বেকায়দায়। দীর্ঘ দুই বছরের নানা নাটকীয়তা ও বিতর্কের পর এবার বিচ্ছেদ ঘটানোর পালা। ইইউর সদস্য ২৭টি দেশের মধ্যে ২০টি দেশ সমর্থন দিলেই বিচ্ছেদ চুক্তি অনুমোদিত হবে। তবে সর্বসম্মতিক্রমে চুক্তিটি পাস করাতে চান ইইউ নেতারা। যে কারণে স্পেন ও ফ্রান্সের আপত্তি নিরসনে শেষ মুহূর্তে আপ্রাণ চেষ্টা তাদের। কিন্তু এই চুক্তি নিয়ে ঘোর মতবিরোধ আছে যুক্তরাজ্যে। অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে এসে স্পেন ও ফ্রান্স চুক্তির কিছু বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। এর ফলে বিরোধ নিরসনে চূড়ান্ত চেষ্টায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন উভয় পক্ষের নেতারা। স্বাক্ষরিত চুক্তি যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট এবং ইইউ সদস্য দেশগুলোর অনুমোদন পেলে তবেই কার্যকর হবে। ইইউর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের এই বিচ্ছেদ ব্রেক্সিট নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল ও ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের অনেক এমপি ব্রেক্সিট চুক্তির বিরোধিতা করে আসছেন। চুক্তির বিরোধিতা করে যুক্তরাজ্যের সদ্য পদত্যাগী ব্রেক্সিট বিষয়কমন্ত্রী ডোমিনিক রাব সম্প্রতি বলেন, এমন বিচ্ছেদের চেয়ে ইইউর সঙ্গে থেকে যাওয়াই উত্তম। বরিস জনসন, ইয়ান ডানকান স্মিথসহ প্রভাবশালী ব্রেক্সিটপন্থিরাও শেষ মুহূর্তে চুক্তি পরিবর্তনের জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছেন। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখার কিছু বিষয়ে আপত্তি তুলেছে স্পেন ও ফ্রান্স। স্পেনের ইইউবিষয়ক সেক্রেটারি মার্কো অ্যাগুইরিয়ানো অভিযোগ করে বলেন, স্পেনকে অন্ধকারে রেখে এই রূপরেখা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, স্পেনের ভূখ-বেষ্টিত ব্রিটিশ উপনিবেশ জিব্রালটারে বিচ্ছেদ-পরবর্তী সম্পর্ক কী হবে, তা স্পেনের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

অন্যদিকে, বিচ্ছেদের পর যুক্তরাজ্যের সমুদ্রসৈকতে মাছ ধরার অধিকার অক্ষুণœ রাখতে এ বিষয়ে আলাদা ঘোষণা দাবি করেছে ফ্রান্স। ব্রেক্সিটকে ঘিরে ব্রিটেনের রাজনীতিকরা খুবই অস্বস্তি ও অস্থিরতার মধ্যে আছেন। ইতোমধ্যে একজন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিয়েছেন। আচমকা নির্বাচনের ডাক দিয়ে বাজিমাত করতে গিয়ে মুখ থুবড়ে কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন থেরেসা মে। এখন তাকে ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি বা ডিইউপির মতো একটি আঞ্চলিক দলের সাহায্য নিয়ে সরকার চালাতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ষাটোর্ধ্ব প্রধানমন্ত্রীর যখন এমন নাজেহাল অবস্থা, তখন বিরোধী লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিনও কিন্তু স্বস্তিতে নেই। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গলা চড়িয়ে আক্রমণের অভিমুখ ধারালো করলেও মনে মনে করবিনও জানেন তার অবস্থাও তথৈবচ। লেবার দলের অবস্থান এখন অনেকটা হাঁসজারুর মতো। ইইউ ছাড়তে তারা বদ্ধপরিকর কিন্তু একই সঙ্গে ২৭টি দেশের এই সংগঠনের সঙ্গে এমন একটি অলীক সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী যাতে ব্রিটেন এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যে কোনো শুল্ক না থাকে এবং ইইউর নীতিনির্ধারণে ব্রিটিশ সরকারের একটা ভূমিকাও থাকে। তর্কের খাতিরে করবিন কর্মসংস্থানের সুযোগ যাতে না কমে, তার অজুহাত দিলেও তিনি ভালোই জানেন, ইইউর হয়ে যে সমঝোতাকারী দল আলোচনা চালাচ্ছেন, তারা এমন অর্ধকুম্ভ ব্যবস্থায় কিছুতেই রাজি হবেন না। ইউরোপের রাজনীতিতে ব্রেক্সিটকে ঘিরে বছর শেষে পারদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

বস্তুত একটা সময় এমনও শোনা যাচ্ছিল, ব্রিটেনকে অনুসরণ করে ফ্রান্সও বোধহয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে। অথবা ব্রিটেনের অভিজ্ঞতার নিরিখে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর নতুন দর-কষাকষির চাপ তৈরি করলে অর্থনৈতিক ইউনিয়ন থেকে রাজনৈতিক একই ভবনের দিকে যাত্রার যে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন, তা হয়তো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক সমাজে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, যার বার্তা হলো ইনক্লুসিভ, নন-পার্টিজান এবং সবাইকে শান্তি, সুস্থিতি, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুবিচারের জন্য শামিল করা। আপাত মনে হতেই পারে, ব্রেক্সিট হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বিদায়; বেশ কয়েক দশক একসঙ্গে কাটানোর পর যেন হঠাৎ ডিভোর্সের শামিল, যা একান্তভাবে স্বার্থপরতার পরিচায়ক বা নিজেরটা নিজে বুঝে নেওয়ার সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। কিন্তু অনেকের মতে, এর পেছনে রয়েছে এক নতুন সমাজ গঠনের দর্শন তথা আত্মবিশ্বাস, যে কারণে ১৯৭০-এর মাঝামাঝি থেকে ২০১৬-এর জুন এই সময়সীমার যে ম্যারেজ তার থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে গণভোটে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ব্রেক্সিটাররা ব্রিটেনের স্বতন্ত্র অবস্থান খুঁজে নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। ডেভিড ক্যামেরনের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই থেরেসা মে জোর গলায় দাবি করেছিলেন, তিনি জনগণের রায়ের মর্মার্থ অনুধাবন করতে পেরেছেন, তাই যথার্থ ব্রেক্সিটই তিনি কার্যকর করবেন, যাতে মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।

যুগ যুগ ধরে রাখা সুবৃহৎ সা¤্রাজ্যের আভিজাত্য এবং ঔপনিবেশিকতার অহংবোধই সম্ভবত ব্রিটেনের বাস্তবোচিত পদক্ষেপ নেওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বরং নিজেদের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঐতিহ্যের জোরে ব্রিটেন পেরেছিল ইউরোপের প্রবেশদ্বার হয়েও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে। তা নিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ব্রিটেনের যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, তার ফলও সুদূরপ্রসারী হয়। অন্যদিকে ব্রেক্সিট সেন্টিমেন্ট হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি সন্দিগ্ধ মনোভাব। কারণ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধজনিত অতিরিক্ত শরণার্থী সমস্যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন সর্বদাই ব্যতিব্যস্ত থেকেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরো জোন-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং বিশ্বায়ন ও করপোরেট পুঁজির প্রতি পক্ষপাতিত্ব। তা ছাড়া বাইরে থেকে মার্কিন ও চীনের চাপ তো রয়েছে। এখন দেখার বিষয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে তা সামলায়। ইতোমধ্যে আর্থিক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়াকড়ি জাতীয় অর্থনীতিগুলোর বাজেট ঘাটতিতে রাশ টানার বিষয়টি বুমেরাংয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশের বাজেটে সমাজকল্যাণ খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধির যেমন কোনো অবকাশ নেই, তেমনই মাসাধিককালব্যাপী ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ ও ইয়েলো-ভেস্ট প্রতিবাদের বর্শামুখ হলো শহুরে উচ্চবিত্ত ও গ্রামিণ খেটে খাওয়া জনসমাজের মধ্যে বাড়তে থাকা আর্থিক ফারাকের দিকে মোড় ঘোরানো। এক কথায় যার বার্তা হলো সরকারের অভীষ্ট প্রো-বিজনেস হতে পারে না। ইতোমধ্যে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বেশ কিছু সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও কেবল আগুন নেভানোর জন্য জ্বালানির দামে লাগাম টানলেই চলবে না। সামাজিক বঞ্চনাকে বুঝতে হবে, যা সাধারণভাবে ব্রিটিশ ও ইউরোপীয়দের মনে রাজনীতিবিদদের প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে।

তাই এ কথা বলাই যায়, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেমন যথেষ্ট কঠিন (২০২২ সালের নির্বাচন থেকে তিনি সরে দাঁড়াবেন ইতোমধ্যে এমন বার্তাও দিয়েছেন), তেমনি ব্রিটেনকে বাড়তি ছাড় দিলে ঘরোয়া পরিস্থিতি যে আরো প্রতিকূল হবে তা মোক্ষম জানেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল বা নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রুট। তাই ব্রিটেন যতটা সহজে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরোতে পারবে ভেবেছিল তা হয়নি এবং হচ্ছে না। যদিও ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সংসদে আস্থাভোটে জিতে তিনি আপাতত উতরে গিয়েছেন বলা যায়। তবুও কেন মে ব্রিটিশ গণভোটের রায়কে দ্রুত বাস্তবায়িত করতে পারছেন না বা যদি শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটিশ সংসদের সহমতের ভিত্তিতে ব্রেক্সিট না হয় তাহলে পরিস্থিতি কী হবে বা উত্তর আয়ারল্যান্ডের সীমানা-সংক্রান্ত ব্যাকস্টপ চুক্তির রফাসূত্র কী দাঁড়াবে, এমন কোনো প্রাসঙ্গিক প্রশ্নেরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত এখন অবধি দেওয়া সম্ভবপর নয়। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণ সময়সীমার নিকটবর্তিতা। অর্থাৎ ২০১৯-এর ২৯ মে’র মধ্যে ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। কারণ সুষ্ঠু ব্রেক্সিট বন্দোবস্ত না হলে বহির্বাণিজ্য থমকে যেতে পারে। এমনকি বিমান পরিবহন থেকে ব্রিটেনে খাদ্য আমদানির মতো আশু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে সন্দেহ নেই। বস্তুত এই পথে যে রিস্ক রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও ব্রেক্সিটের জন্য কেন এত আবেগ? তা কি নেহাত ছেলেমানুষি খেয়াল? মনে হয় না। একদিকে মুক্তবাজার ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের ফলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি; অন্যদিকে মুক্ত শ্রমের অবাধ চলাফেরার কারণে মজুরি হ্রাস, এমনকি ওভারটাইম রোজগারে সরকার আরোপিত করের বোঝা। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস গ্যালব্রিথ থেকে ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েমো ফিটচার তাই বলতে পারেন ব্রিটেনের কঠিন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কথা, যার ফলে ২০১০-এর পর থেকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমাজকল্যাণের ওপর ঝোঁক ক্রমেই ফিকে হতে থাকে।

ইতোমধ্যে ব্রেক্সিট নিয়ে লেখালেখির অন্ত নেই। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের রাজনীতি ও যোগাযোগবিষয়ক ডিরেক্টর ক্রেগ অলিভারের আনলিশিং ডেমোন্স : দ্য ইনসাইড স্টোরি অব ব্রেক্সিট অক্টোবর, ২০১৬ এবং টিম শিপম্যানের অল আউট ওয়ার। দুটোই বেস্ট সেলার; তবে এই লেখাগুলোর মধ্যে সরকারের প্রতি সমর্থনমূলক এলিট দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকাশ পেয়েছে। জনগণের মেঠো দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো লেখা হয়নি। বস্তুত ব্রেক্সিটের পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ মননে ক্রমাগত জমতে থাকা অর্থনৈতিক ক্ষোভ-অভিযোগ। এমতাবস্থায় গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ব্রেক্সিট হয়ে উঠেছে ইউরোপের নতুন যন্ত্রণার কারণ, যেখানে আশার তুলনায় অনিশ্চয়তার পরিমাণটাই বেশি। চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ রাত ১১টায় বিচ্ছেদ কার্যকর হবে। অর্থাৎ ওই সময় থেকে যুক্তরাজ্য আর ইইউর সদস্য থাকবে না। তবে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে বর্তমান সম্পর্ক বজায় থাকবে। এই অন্তর্র্বর্তী সময়ে তারা ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ও অন্যান্য আদান-প্রদানের সম্পর্ক নির্ধারণ করবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক

raihan567@yahoo.com

"