পর্যালোচনা

প্রবাসীর মৃত্যু ও কর্মী নির্যাতন

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

আবু আফজাল মোহা. সালেহ
ama ami

এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন মাধ্যমে। বিদেশে আমাদের দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুসংখ্যা চমকে উঠার মতো। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৭৮৪টি লাশ। লাশ আসার ক্ষেত্রে সৌদি আরব এগিয়ে। উল্লিখিত সময়ে ১০০৮টি লাশ এসেছে। বলে রাখা ভালো, এ দেশটি নারী শ্রমিক নির্যাতনের ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া কুয়েত থেকে ২০১, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২২৮, বাহরাইন থেকে ৮৭, ওমান থেকে ২৭৬, জর্ডান থেকে ২৬, কাতার থেকে ১১০, লেবানন থেকে ৪০ সহ মোট তিন হাজার ৫৭ জনের লাশ দেশে ফিরেছে। এবার বিগত বছরের প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেই (যা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কসূত্রে জানা যায়)- ২০০৯ সালে দুই হাজার ৩১৫ জন, ২০১০ সালে দুই হাজার ২৯৯ জন, ২০১১ সালে দুই হাজার ২৩৫ জন, ২০১২ সালে দুই হাজার ৩৮৩ জন, ২০১৩ সালে দুই হাজার ৫৪২ জন, ২০১৪ সালে দুই হাজার ৮৭২ জন, ২০১৫ সালে দুই হাজার ৮৩১ জন, ২০১৬ সালে দুই হাজার ৯৮৫ জন, ২০১৭ সালে দুই হাজার ৯১৯ জন এবং ২০১৮ সালে তিন হাজার ৫৭ জনের মরদেহ দেশে ফিরেছে।

প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে বড় একটা অংশ হচ্ছে নারী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮৯ জন বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসীর মধ্যে ৭ লাখ ২৭৮ জন নারী রয়েছেন। বিভিন্ন পত্রিকাসূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নারী শ্রম অভিবাসী ১ লাখ ২১ হাজার ৯৮৫ জন। বর্তমানে ২ লাখ ৪ হাজার ৭২৯ জন নারী রয়েছেন সৌদি আরবে- এদের মধ্যে ৮৩ হাজার আছেন শ্রমিক। এরপর ১ লাখ ২৯ হাজার ৮০২ জন নারী শ্রমিক রয়েছেন জর্দানে। ১ লাখ ২৬ হাজার ১ জন রয়েছেন আরব আমিরাতে। এছাড়া লেবাননে ১ লাখ ৪ হাজার ২০৭ জন। ওমানে ৬৪ হাজার ৬০২ জন। এসব নারী অভিবাসীরা উল্লিখিত দেশগুলোতে গৃহকর্মী, হাসপাতাল, পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত। পুরুষ কর্মীদের বিদেশে যাওয়া তাদের পরিবার ও সমাজ ভালোভাবে গ্রহণ করলেও নারীরা নানাভাবে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সমস্যার মধ্যে বিদেশে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছেন। কিন্তু পুরুষ কর্মীর তুলনায় উপার্জিত অর্থ নারীরা বেশি দেশে প্রেরণ করছেন। যেখানে বেশির ভাগ পুরুষ শ্রমিক গড়ে ৫০ ভাগ টাকা প্রেরণ করে সেখানে গড়ে নারী শ্রমিকরা ৯০ ভাগ টাকা দেশে প্রেরণ করছেন বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায় বলে জানা যায়, এটা হাস্যকর যুক্তি। আসলে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ না হয়ে কে মারা যায়? আসল কারণ বের করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কারণ বের করে সরকারকে জানানো দরকার। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা ও নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতে গিয়ে এসব শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন বলে দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। ইতোমধ্যে স্ট্রোকে বেশির ভাগ প্রবাসী মারা গেছেন বলে এক হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। তবে, আসল কারণ অনেকক্ষেত্রে অজানাই থেকে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপর নির্যাতন, খুন বা ধর্ষণের তথ্য মিডিয়াতে আসে না। প্রবাসে বাংলাদেশিদের মৃতের পরিসংখ্যানের তালিকায় প্রথমে আছে সৌদি আরব। দ্বিতীয় অবস্থানেই মালয়েশিয়ার অবস্থান বলে জানিয়েছে দূতাবাস সূত্র। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে আরব আমিরাত, ওমান ও কুয়েতের অবস্থান। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে এমন বেশ কয়েকটি সংগঠন জানায়, গত চার বছরে যত প্রবাসীর লাশ এসেছে, তাদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যু হয়েছে আকস্মিকভাবে। আসল কারণ অজানা থাকে। সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে সঠিক তথ্য পাওয়া নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। মানসিক চাপ কমাতে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা তৈরি করার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। মৃত্যুর কারণ হিসেবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও সড়ক দুর্ঘটনাও রয়েছে। লাশ দাফনের জন্য মৃত ব্যক্তিদের পরিবার বিমানবন্দরে আর্থিক অনুদান পায় বলে জানা যায়। যে অবৈধ প্রবাসী কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেন তাদের বেলায় কো¤পানির মালিকের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ আদায়ে দূতাবাস সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকে বলে জানা যায়। তবে বৈধ কাগজপত্র অনেকক্ষেত্রে দেখানো সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে অনেক কো¤পানি কাগজপত্র রেখে দেন। আবার বিদেশে লোক পাঠানোর সময় এদেশের এজেন্সিগুলোর অনেকে প্রতারণার আশ্রয় নেয়। চুক্তির সঙ্গে কাজ বা কো¤পানির কোনো মিল থাকে না অনেক সময়। অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসা দেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রবাসী বাংলাদেশিরা লুকিয়ে থেকে চুক্তির বাইরে কাজ করেন। ফলে, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় বা কাগজপত্রের গরমিল থাকায় সরকারি সংস্থাগুলো/দুতাবাস আইনগত সুবিধা পায় না বা পেতে সমস্যা হয়। এ বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে গিয়ে তদারকি বাড়াতে পারে। মানবস¤পদ পাঠানো এসেন্সিগুলোকে শক্তহাতে এ অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারী প্রবাসী শ্রমিকের গুরুত্ব বেড়েছে। সরকারি হিসাবে, গত ৪০ বছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই অর্থ পাঠিয়েছেন ১৬১টি দেশে থাকা প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ প্রবাসী। যার মধ্যে বিপুল পরিমাণ প্রবাসী নারী শ্রমিকও রয়েছেন। মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করেই শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমানোর সুযোগ পাওয়ায় বর্তমানে দ্রুতগতিতে প্রবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। অভিবাসী নারী শ্রমিকরা বিদেশের মাটিতে অধিক বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে পরবর্তী সময়ে কম বেতন দেওয়া, ঠিকমতো বেতন না দেওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে না দেওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের সুযোগ না দেওয়া, ওয়ার্ক পারমিট আটকে রাখা, দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা এবং দেশে ফিরে আসতে চাইলে স্বজনদের কাছে রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালালদের মুক্তিপণ দাবিসহ নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক দেশে যেখানে লেবার অ্যাটাচি নেই সেখানে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের বিপদে পড়তে হচ্ছে। তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েও এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে পারছেন না। অন্যদিকে লেবার উইংগুলোতে নারী কর্মকর্তা কম থাকায় নারীরা তাদের সমস্যার কথা ঠিকভাবে বলতেও পারেন না।

ভরত. নেপাল ও শ্রীলংকার মতো দেশগুলো প্রবাসী গৃহ-শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যাপারে অধিক কঠোর। চুক্তিপত্রে যথেষ্ট কঠোরতা দেখানো হয়। সাম্প্রতিক বছরগুরোতে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারী শ্রমিক পাঠানোর হার বেড়ে গেছে। অতএব চুক্তিপত্র ভালোভাবে করতে হবে। সরকার এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাজার ছাড়াও নারী কর্মীদের জন্য নতুন বাজার খুঁজছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজের চাপ খুব বেশি। সেখানে এক একটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এক একজন গৃহকর্মীকে রাত-দিনে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এদিকে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতিত নারীদের অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়েও দেশে ফিরছেন। জানা যায়, প্রবাসী নারীরা এসব বিষয়ে নানা অভিযোগ করলেও এগুলোর নি®পত্তির সংখ্যা হতাশাজনক।

বিদেশের মাটিতে বিপুল পরিমাণে নারী কর্মী কাজ করলেও তাদের সমস্যা এবং সহযোগিতার জন্য নেই তেমন কোনো শেল্টার হোম, দ্রুত সহযোগিতা পাওয়ার জন্য নেই হটলাইন। অনেক দেশেই নারীকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে সহযোগিতা চাইলেও পাচ্ছেন না। নারী কর্মীদের তাৎক্ষণিক সহযোগিতার জন্য দ্রুত হটলাইন এবং শেল্টার হোম খোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কারণ, বিদেশে নারী কর্মীর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, সেই সঙ্গে প্রবাসে নারীকর্মীর সমস্যাও বাড়ছে। অনেক নারী যৌন হেনস্তা বা নির্যাতনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ করতে বা প্রতিকার পেতে লজ্জাবোধ করেন। তাই বলা যায়, পত্রপত্রিকায় যা প্রকাশ হচ্ছে বাস্তবে নারী নিগ্রহ বা নারী নির্যাতনের হার অনেক বেশি! এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ভাষা সমস্যা। কর্মী সংশ্লিষ্ট দেশের বা ইংরেজি ভাষা না জানার কারণে মালিক-কর্মী ভুল বোঝাবুঝি বেশি হচ্ছে।

কয়েকটা পদক্ষেপ নিলে বিদেশে আমাদের কর্মীদের নির্যাতনের হার কমে যাবে বলে মনে করি। জনশক্তি প্রেরণের সময় ঠিকঠাক চুক্তি করতে হবে। কোনো ফাঁকফোকর রাখা যাবে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এগুলো কঠোরভাবে দেখভাল করতে পারে। ভাষা সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী প্রেরণের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের এবং ইংরেজি ভাষা স¤পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করা যেতে পারে। চুক্তিতে উল্লিখিত কাজের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রদান করে কর্মী প্রেরণ করতে হবে। অদক্ষ কর্মী প্রেরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর হার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। যেখানে নারী শ্রমিক নির্দ্বিধায় ও খোলাখুলি সমস্যার কথা বলতে পারে। এতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে সরকারের সুবিধা হবে। সমস্যার সংশ্লিষ্ট নারী কর্মীর পরিচয় গোপনীয় রাখতে হবে। যাতে নির্যাতিত অন্য নারী কর্মীরা পরবর্তীতে নিঃসংকোচে তাদের সমস্যার কথা শেয়ার করতে পারেন।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

abuafzalsaleh@gmail.com

"