বিশ্লেষণ

ইসলামের আলোকে বন্ধুত্ব

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

জাহাঙ্গীর আলম জাবির

সামাজিক জীবনে চলতে গিয়ে কারো না কারো সাথে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। সৃষ্টি হয় বন্ধুত্বের। মানবজীবনও অনেকাংশে বন্ধুত্বের ডোরে গাঁথা। জীবনে সফলতা ও ব্যর্থতা উভয় ক্ষেত্রেই একজন বন্ধুর থাকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। একজন বন্ধুই পারে জীবনকে এগিয়ে নিতে উন্নতির সোপানে, পারে ব্যর্থতার আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে। বর্তমান আমাদের এই সমাজে নির্দিষ্ট কিছু জাতি-গোষ্ঠী বা ধর্ম-বর্ণের লোকই বাস করে না, বাস করে বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ, পেশা ও শ্রেণির মানুষ। এর মধ্যে ভালো-মন্দ দুই ধরনের লোকই থাকে। কিন্তু সামাজিক জীবনে সবার সাথেই সমতা বজায় রেখে চলতে হয়। করতে হয় সুন্দর আচরণ। কিন্তু বন্ধু হিসেবে সবাইকে গ্রহণ করা যায় না। তাই জীবন চলার মরু পথে কাকে গ্রহণ করব বন্ধুরূপে, তা বিবেচনা করতে হবে ইসলামের আলোকে। দেখতে হবে এ ব্যাপারে কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা কী। একজন ভালো বন্ধুর গুণ, বৈশিষ্ট্য, পরিচয় কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। আমাদের বন্ধু সে আলোকেই গ্রহণ করতে হবে। যেমন : আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ইমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সৎলোকদের সাহচর্য অবলম্বন করো। (সুরা তাওবা ১১৯)। আরেক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ , তাঁর রাসুল (সা.) এবং মুমিনগণ। যারা নামাজ কায়েম করে ও জাকাত দেয় এবং বিন¤্র। তারাই বিজয়ী। (সুরা মায়িদা ৫৫)। বন্ধুগ্রহণ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে অনেক হাদিস। এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ভালো বন্ধুর তুলনা সুগন্ধি বিক্রেতার মতো। সে তোমাকে দিক বা না দিক তুমি তার সুঘ্রাণ পাবেই। আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মানুষ তার বন্ধুর মতো ও পথের অনুগামী হয়ে থাকে। সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে দেখে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে। আরেক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে, দুনিয়াতে যার সাথে যার মোহাব্বত সৃষ্টি হবে পরকালেও তার সাথে তার হাসর হবে।

বন্ধু সম্পর্কে মনীষীদের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। হজরত আলী (রা.) বলেন, যে দীর্ঘ সফরে বের হয়, তার প্রয়োজন একজন সৎবন্ধু। আল্লামা যারনুজী (রহ.) অসৎসঙ্গকে বিষধর সাপের চেয়ে ভয়ংকর বলেছেন। অসৎসঙ্গ বিষাক্ত সাপের চেয়ে ক্ষতিকর। সৎ বন্ধু তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। আর অসৎ বন্ধু তোমাকে জাহান্নামে পৌঁছে দেবে। ইব্রাহীম তাইমী (রহ.) বলেন, হিতাকাঙ্খী বন্ধু ব্যতীত মানুষের অবস্থা এমন, যেমন ডান হাত ছাড়া বাম হাত দুর্বল। ডেমোক্রিটাস বলেন, একজন সৎবন্ধু যার নেই তার জীবন দুঃসহ। ইংরেজ কবি চার্লস কিংসলে বলেন, বন্ধুহীন জীবনে কোনো মাধুর্যতা নেই। এইচ জে ভেন বলেন, একজন বিশ্বাসী বন্ধু হচ্ছে সারা জীবনের মহৌষধ। হেনরি অ্যাডামস বলেন, সমস্ত জীবনের একজন প্রকৃত বন্ধুই যথেষ্ট। আর কথায় আছে সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা এটাই বোঝা যায়, মানব জীবনে একজন ভালো বন্ধুর প্রয়োজন অপরিহার্য। অনেক বড় ব্যক্তির জীবনেও বন্ধু ছিল। হুজুর (সা.) ও আবুবকর (রা.)-কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা ছিলেন পরস্পরে নিবেদিতপ্রাণ, অন্তরঙ্গ বন্ধু। হয়তো তাদের মতো বন্ধুত্বের ডোর অন্য কারো এত মজবুত হবে না। তবে একজন ভালো বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার মতো না। যিনি হবেন সৎ, তাকওয়া, খোদাভীতি, ন্যায়পরায়ণ, বিশ্বস্ত, আমানতদারি ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত। আর ভালো বন্ধুর সংস্পর্শেই পাল্টে দেওয়া যায় চলমান জীবনের গতি। খোঁজে পাওয়া যায় সত্য সুন্দর আলোর পথ। নিজেকে আলোকিত করা যায়। করা যায় প্রতিষ্ঠিতও। তাই জীবন চলার পথে একজন ভালো বন্ধু হোক আমাদের সার্বক্ষণিক রাহবার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"