মতামত

বাল্যবিবাহ একটি অভিশাপ

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

বিশ্ব সমাজব্যবস্থায় বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং একটি পবিত্র বন্ধনও বটে। নারী-পুরুষের সুখ-শান্তি প্রেম-প্রীতির মধুরতম বন্ধন সৃষ্টি ছাড়াও মানব বংশের স্থায়িত্ব ও সভ্যতার বিকাশ ঘটায়। তবে বাল্যবিবাহ দেশ ও জাতির জন্য অভিশাপ। সেই কবে কোনো যুগে বাল্যবিবাহ প্রথার সৃষ্টি হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট ইতিহাস না পাওয়া গেলেও আদিযুগের গোত্র ও পরবর্তীকালে সব সাংস্কৃতির গর্ব এ ঘৃণ্য নিন্দিত প্রথার জন্ম দেয়। পরবর্তীকালে এর বিস্তৃতি ঘটে সমাজে-সংসারে।

পৃথিবীর যে কটি দেশ বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুসারে বাল্যবিবাহ বরতে বোঝায় বাল্যকালে বা নাবালক বয়সে ছেলেমেয়ের মধ্যে বিয়ে। এ ছাড়া বর-কনে উভয়েরই বা একজনের বয়স বিয়ের দ্বারা নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সে বিয়ে হলে তা আইনত বাল্যবিবাহ বলে চিহ্নিত হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমাদের দেশে বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১২ থেকে ‘১৮ বয়সের মধ্যে। বিয়ের ১৩ মাসের মধ্যেই ৬৫% মেয়ে সন্তান ধারণ করে। গ্রামের মেয়েদের বেশির ভাগই বিয়ের এক বছরের মধ্যে সন্তান জন্ম দেয়। আর এসব বাল্যবিবাহের অধিকাংশ কারণগুলো হচ্ছেÑ দরিদ্রতা, সচেতনতার অভাব, প্রচলিত প্রথা ও কুসংস্কার, সামাজিক অস্থিরতা, মেয়েশিশুর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তার অভাব, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, যৌতুক প্রথা এবং বাল্যবিবাহ রোধ-সংক্রান্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া। বাল্যবিবাহের কারণে অপরিণত বয়সে সন্তান ধারণ, মাতৃমৃত্যুর হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যহানি, তালাক, পতিতাবৃত্তি, অপরিপক্ব সন্তান প্রসবসহ নানাবিধ জটিলতার শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধকল্পে প্রণীত হয়েছিল বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯। ১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ আইন প্রণয়ন করা হলেও এখনো গ্রামগঞ্জে-মফস্বল এলাকাসহ সারা দেশে বাল্যবিবাহ হচ্ছে অহরহ। এ আইনে বাল্যবিবাহের সংজ্ঞায় ছেলেমেয়ের বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত বয়সের নিচে পক্ষদ্বয়ের যেকোনো একজন হলেই সেটি বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে তিন ধরনের বিয়ে অপরাধ বলে ধরা হয়েছে। ১. প্রাপ্ত বয়স্কের সাথে অপ্রাপ্ত বয়স্কের বিবাহ, ২. অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ের বিবাহ সম্পন্ন। ৩. অপ্রাপ্ত বয়স্কের মাতা-পিতা অভিভাবক কর্তৃক বিবাহ নির্ধারণ অথবা এক রকম বিবাহে সম্মতিদান এবং যারা এসব অপরাধে অপরাধী হবেন, তাদের মধ্যেÑ ১. ছেলেমেয়ের অভিভাবক, ২. স্বয়ং ছেলে (যদি ২১ বছরের নিচে বয়স হয়), ৩. কাজী যিনি বিবাহ রেজিস্ট্রি করাবেন। ৪. মৌলভী যিনি বিবাহ পড়াবেন। তাদের জন্য শাস্তিবিধান ধরা হয়েছেÑ ১. ২১ বছর বয়সের অধিক কোনো ছেলে অথবা ১৮ বছরের অধিক কোনো ছেলে অথবা ১৮ বছরের অধিক কোনো মেয়ে কোনো শিশুর সাথে বিয়ের চুক্তি সম্পাদন করলে এক মাস বিনাশ্রম কারদন্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় প্রকারের শাস্তি হতে পারে। ২. যে ব্যক্তি নাবালকের বিয়ে দেবে, তার এক মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমান বা উভয় প্রকারের শাস্তি হতে পারে। ৩. যেসব অভিভাবক নাবালকের বিয়ে দেবে, তাদের এক মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় প্রকারের সাজা হতে পারে।

বেসরকারি সংস্থা সেভ দি ডটারের এক জরিপে গত ১ জানুয়ারি থেকে ১ মার্চ-১৮ পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৪০৩টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে ১১২ জন শিশু বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে এবং এসব বিবাহের বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ৭টি, গ্রেফতার করা হয়েছে জনকে এবং বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে ৩৭টি। দেশে বাল্যবিবাহ নিরসনের জন্য সরকারি-বেসরকারিসহ বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সবচেযে বেশি সামজিক, প্রশাসনিক পর্যায়ে কাজ করছে, এমন সংগঠনের প্রতিবাদ-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটছে ৭৯টি। যারা এসব প্রতিবাদের সাথে জড়িত ছিল, তারা হলো স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, কাজী, মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় লোকজন। দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কল্পে আইন বিদ্যমান। সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো বিভিন্ন রকম কর্মসূচিও পরিচালিত করছে। তবু বাল্যবিবাহ অব্যাহত রয়েছে। বেশির ভাগ বিয়ে আইনের পশ্চাতে এবং গোপনে হচ্ছে বলে এর সঠিক পরিসংখ্যানও নেই। একাধিক আন্তর্জাতিক এক জরিপের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বেশি। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি-২০১১ অনুযায়ী চীন ছাড়া উন্নয়নশীল বিশ্বেও প্রতি তিনজন মেয়ের মধ্যে একজনের ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিবাহ হয়। ইউনিসেফের গত বছরে প্রকাশিত ‘প্রোগ্রেস ফর চিলড্রেন এচিভিং দ্য এমডিজিস উইথ ইক্যুইটি’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিবাহ হয়।

বেসরকারি সংস্থা স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, সচেতনতার অভাব, প্রচলিত প্রথা ও কুসংস্কার, সামাজিক অস্থিরতা, সামাজিক চাপ, কন্যাশিশুর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব ও নিরাপত্তার অভাবকে বাল্যবিবাহের জন্য দায়ী করা হয়েছে। বাল্যবিবাহের অপর একটি হচ্ছে সামাজিক চাপ। বয়োসন্ধিক্ষণের সময় অতিবাহিত হলেই প্রতিবেশী ও গ্রাম-গঞ্জের মোড়ল বা ফতোয়াবাজরা কন্যা বিবাহের জন্য চাপ প্রয়োগ করে থাকে। অনেক সময় দেখা গেছে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে বিবাহ না দিলে সেই পরিবারকে একঘরে করার হুমকি প্রদান করা হয়। সেভ দ্য চিলড্রেন পরিচালিত ‘নগরায়ণের প্রবণতা ও শিশুদের ওপর প্রভাব’ ও ঢাকার নির্বাচিত পাঁচটি বস্তির অবস্থা বিশ্লেষণ শীর্ষক এক গবেষণা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার বস্তিতে থাকা ৮০ ভাগ কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বালকদের মধ্যে এই হার কিছুটা কম। এই বাল্যবিবাহের মূলে রয়েছে সুপাত্র প্রাপ্তি, দরিদ্রতা এবং যৌন হয়রানির ভয়। রিপোর্টে আরো বলা হয় বস্তির শতকরা ৩৭ ভাগ শিশুর জন্ম নিবন্ধিত হয়। যার ২৭ ভাগ মনে করে নিবন্ধনের জন্য টাকা প্রদান করতে হয়। ৪১ ভাগ অভিভাবক বিষয়টির গুরুত্ব বোঝেন না। ৩২ ভাগ জানেন না কীভাবে নিবন্ধন করা হয়। অথচ ২০০৪ সালে থেকে সরকার জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশে জন্মহার হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে প্রধান দুটি অন্তরায় বাল্যবিবাহ আর অল্প বয়সে সন্তান ধারণ। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) ২০১৮ সালে পরিচালিত এক জরিপে লক্ষ করা যায়, এ দেশের অর্ধেক মেয়েকে পনেরো বছরে পড়তে না পড়তে বিয়ের আসনে বসতে হয়। এই হার এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। আইন আছে আছে, নানা ধরনের প্রতিরোধ-প্রতিবাদ তবু দেখা যাচ্ছে বাল্যবিবাহ রোধ করা যাচ্ছে না। এর জন্য যা প্রয়োজন তা হলো সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ। বাল্যবিবাহ বন্ধে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরিÑ শিশুর জন্ম নিবন্ধীকরণ আইন মেনে চলা, বিয়ের রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করা, বহুবিবাহ রোধ করা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিয়ে সাংসদ ও আইনজীবী তারানা হালিম বলেন, ‘১৯২৯ সালের আইন বর্তমান সময়ের জন্য কার্যকর নয়। তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ একটি আইন তৈরি করা একান্ত জরুরি। সমাজে মেয়ে বা কিশোরীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত বিধান করতে না পারলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্ভব হবে না। তা ছাড়া মেয়েদের শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জোরদার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলারও কোনো বিকল্প নেই।’

লেখক : কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

"