বিশ্লেষণ

‘মুক্তিযুদ্ধের গান’ ও আমাদের চেতনা

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ড. আলী হোসেন চৌধুরী

মুক্তিযুদ্ধের গান আজও আমাদের চেতনায় অভূতপূর্ব শিহরন জাগিয়ে তোলে। বাঙালির উত্থানপর্বে এক অপূর্ব নিদর্শন এই মুক্তিযুদ্ধের গান। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান মুক্তিযোদ্ধা তথা স্বাধীনতাকামী দেশের সব মানুষের কাছে হৃদয়ের অন্তস্থিত সত্যের উন্মেষ ঘটায় দারুণ সংহতিতে। অংশুমান রায়ের ‘শোন একটি মুজিবরের...’ এ গানটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি বারবার জেগে উঠেছিল নতুন প্রত্যয়ে। আবার ‘বাংলার হিন্দু...’ গানটিতে এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অসামান্য চিত্রকল্প ফুটে ওঠে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘মাগো ভাবনা কেন আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে তবুও শত্রু এলে অস্ত্র হাতে’ এ গানটিতে সাহসী বাঙালির দৃপ্ত অঙ্গীকার দেশমাতৃকার প্রতি। আপেল মাহমুদের ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ এ গানটি একটি প্রতীকী দোলায় সত্য ও শান্তির জন্য ধ্বনিত হয়েছে। একই শিল্পীর ‘তীর হারিয়ে ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিবরে’ মহান অভিযাত্রায় সাহসী স্বরধ্বনি। মুক্তিযুদ্ধকে স্পষ্ট করে দেয় যে গানটি তা হলো ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল, রক্ত লাল রক্ত লাল’ যদিও কিছুটা প্রতীকী উচ্চারণ তারপরও মুক্তিযুদ্ধ অনুভূত হয় এ গানটিতে। অনুরূপভাবে চেতনায় দারুণ দোলা দেয় ‘জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে নিশ্চয়’ গানটি। বাঙালিত্ব বোধের চেতনায় আগে থেকেই যারা জল সিঞ্চন করেছেন, তেমনি একজন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দেশ মাতৃকার প্রতি তার নিবেদন সে সময় বড়বেশি ফলদায়ক হয়ে উঠেছিল। তার গান ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার ফুল বাংলার ফল’, ‘বাঁধ ভেঙ্গে দাও, বাঁধ ভেঙ্গে দাও’। কবি নজরুলের ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমার’ ডিএল রায়ের গান ‘ধন ধান্য পুষ্পভরা আমাদের এ বসুন্ধরা’ এসব গান এক অভূতপূর্ব আনন্দ ও ভালোবাসায় জড়ায় দেশের প্রকৃতি-নিসর্গ আর মানুষের জীবনাচার। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যেন সে সময় জীবনের প্রাণ প্রবাহ আর তা প্রতিদিন জীবনের জয়গান হয়ে উঠেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের গান বাঙালির এক অবিস্মরণীয় শিহরন। বাঙালি জাতির সর্বোচ্চ উত্থান পর্ব ১৯৭১। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতিসত্তাকে করেছে অপরিসীম মহিমা ম-িত। অন্তত হাজার বছরের নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জাতিসত্তার যে বিকাশ হচ্ছিল, তারাই ধারবাহিকতা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এ ছিল বাঙালির অস্তিত্বের যুদ্ধ। এ পর্যায়ে আসতে যেমন দীর্ঘ সময় লেগেছিল, তেমনি এর প্রস্তুতি পর্বগুলো তৈরি হতেও সময় লেগেছিল। যেহেতু রাজনৈতিক শক্তিই সব শক্তির নিয়ামক, সেহেতু বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাঙালিত্বের এ উত্থানে যার যার অবদান রেখেছেন এবং সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ জাগরণকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির উজ্জ্বলতর উত্তরণ, যার আলোড়ন ঘটে বিশ্বময়। ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান ও সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধ। এর পেছনে দীর্ঘদিন থেকেই কাজ করেছে নানা কর্মপ্রবাহ, প্রতিক্রিয়া এবং উপাদান, যা রাজনৈতিক শক্তিকে দিয়েছে প্রণোদনা ও উজ্জীবিত করেছে নবনব প্রাণময়তায়। রাজনীতির ক্ষেত্রকে প্রস্তুত করার জন্য বাঙালি শিল্পী-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের ভূমিকা অবশ্য স্মরণযোগ্য। লেখকদের লেখা, কবিদের কবিতা, বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষণ ও লেখা। আর গণসংগীতশিল্পীদের গান। দুর্দান্ত অবদান রেখেছিল সংগ্রামী চেতনার মূলে।

শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সব গানই মুক্তিযুদ্ধের গান একথা বলা ঠিক হবে না। বরং এগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব থেকেই ধরা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্প্রসারিত করেছিল গণসংগীত। সে সময়ের অগ্নিঝরা গান রণেশ দাশ গুপ্তের ‘যায় যদি যাক প্রাণ তবু দেবো না দেবো না গোলার দান’ ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় খুব জনপ্রিয় এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল নজরুলের ‘কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙ্গে ফেল করবে লোপাট’ এবং ‘বলবীর চির উন্নত মমশির’ ‘জাগো অনশন বন্দি ওঠরে জাগো’, ‘শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল’ ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি, আমার দেশের মাটি’ গান হিসেবে যে জাগরণ তৈরি করে তা বিশালভাবে জনমনে স্পন্দিত হয়। কারণ ঐ সময় বঙ্গবন্ধুসহ অনেক জাতীয় নেতা কারারুদ্ধ ছিলেন। এ সময় কবি সুকান্তের কবিতা গানে রূপায়িত হয়ে পরিবেশিত হয়। তার গান ‘বিদ্রোহ চারিদিকে বিদ্রোহ আজ’ ‘অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি’ ‘রানার ছুটেছে রানার’। কবি বিষ্ণু দে’র কবিতা গান হয়, হয় জনপ্রিয় ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, ধ্বংসের মুখোমুখী আমরা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ এখন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হলেও তখন সত্যি সত্যি দেশপ্রেমের দারুণ অনুভূতি ছড়িয়েছিল মানুষের মুখে-মুখে, অন্তরে-অন্তরে। গণসংগীত ‘একঝাঁক পলাশের দুরন্ত রক্তে রাজপথ জনপথ সিক্ত’ এ ছাড়া ‘ইতিহাস জানো তুমি আমরা, আমরা পরাজিত হইনি’ ‘মাগো তোমার সোনার মানিক’ ‘ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধুলিতে’ ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা, সোনা নয় কত খাঁটি’ আবদুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ ‘ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাগদাসে’ ‘ওরা নাকি আমাদের ক্ষেত আর খামারে সবুজের স্বপ্ন কেড়ে নিতে চায়। এসব জাগরণী গান বিপুল গণজোয়ার সৃষ্টি করেছিল। দেশের প্রকৃতি ও সৌন্দর্য নিয়ে গানÑ ‘পলাশ ঢাকা কোকিল ঢাকা আমার এ দেশ ভাইরে’ আবার ‘আমারো দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারামন’ গানগুলো দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও দেশের প্রেমে উদ্বেলিত করে। তেমনিভাবে জাগরণের গান ‘ওরে বিষম দইরার ঢেউ উথাল-পাতাল করে নাও আজি কার সাথে নাচেরে’ ‘হায়রে কিষাণ তোদেরই শীর্ণ দেহ দেখে যে রে অশ্রু মানে না’ ‘বাদাম উড়াইয়া নাওয়ের দেরে দে মাঝি ভাই’, ‘জনতার সংগ্রাম চলবে’ ‘এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াই জিততে হবে’ ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কতো প্রাণ হলো বলিদান’। জাগরণের মূল পর্ব থেকে যে গানটি মূল চেতনায় শপথ তৈরি করেছিল তা হলো ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর অমর শোকগাথা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?’ উল্লিখিত গানগুলো ছাড়াও আরো অনেক গান রয়েছে, যা এ লেখায় সংযোজন করা সম্ভব হয়নি।

বাংলা ও বাঙালির জাগরণ, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ তথা বাঙালির ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রূপে চিহ্নিত হয়ে আছে এ গানগুলো, যা বাঙালির আগামীর স্বপ্ন ও শৌর্য-বীর্যের ইতিহাস।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

 

 

"