মতামত

অরিত্রী বনাম শিষ্টাচারশূন্য শিক্ষক

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিশ্বজিত রায়

বাবা-মায়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে যে ছাত্রীটি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, সে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী। নিজের অপরাধ বাবা-মায়ের গায়ে চাপিয়ে দেওয়ার অসম্মানিত হুঙ্কার তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছে। রাজধানীর অভিজাত স্কুলের অতি যোগ্যতাসম্পন্ন দেমাগী স্কুল অধ্যক্ষের অল্পতে অধিক বাড়াবাড়ির অযাচিত ক্ষমতা প্রদর্শন একটি মেধাবী জীবন প্রদীপকে শুধু নিভিয়ে দিয়েছে, তা নয়, একটি পরিবারের আনন্দ-ভালোবাসা, সুখ, স্বপ্ন ও সাচ্ছন্দ্যবোধকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে। আসলে কি এমন অপরাধ ছিল, অভিভাবক ডেকে পাঠিয়ে সন্তানের সামনে তাদের অসম্মান, অপদস্তের সঙ্গে অভিযুক্ত অরিত্রীকে ছাড়পত্র দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। মেয়ের হয়ে বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়েও পার না পাওয়ার মতো কি এমন ঘটনা ঘটিয়ে বসেছিল ভিকারুননিসার ছাত্রী অরিত্রী। এ নিয়ে সর্বত্র দেখা দিয়েছে প্রতিবাদ, ক্ষোভ, প্রশ্ন ও বিষাদ।

অরিত্রীর অপরাধ যতটা না শাস্তিসম্মত, তার চেয়ে অধিক যন্ত্রণাদায়ক মেয়ের সামনে বাবা-মায়ের অসম্মান লাঞ্ছনা। জন্মদাতাধাত্রী বাবা-মায়ের অসম্মানিত কষ্ট সইতে না পেরে যে মেয়েটি বাড়ি ফিরেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে, সেই অরিত্রী কতখানি অপরাধী তা নিয়েই কথা বলতে চাই। হ্যাঁ অরিত্রী অপরাধী, স্কুলপরীক্ষায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নকল করে সে জগণ্য অপরাধই করে ফেলেছে। এ জন্য বাবা-মাকে ডেকে পাঠিয়ে অধ্যক্ষ ভিকারুননিসা এর চেয়ে বহু গুণ বেশি অন্যায় আচরণ করেছে, তা অরিত্রীর আত্মহত্যাই পরিষ্কারভাবে জানান দিয়ে গেছে। নকলের অভিযোগে ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ অরিত্রীকে ছাড়পত্র দিয়ে হয়তো তার শাস্তি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই কলঙ্কিত ছাড়পত্র ও অন্যায় আচরণে যে বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটেছে, তাতে ছাড়পত্র প্রদানকারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাত্রপত্র দিলে অরিত্রী হত্যার যথাযোগ্য শাস্তি নিশ্চিত বলে বিবেচিত হবে।

অরিত্রী আত্মহননের ঘটনা হৃদয়বিদারক ও অভিভাবকদের অপমান করার ঘটনা বাজে দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। একাধিক দৈনিকে অরিত্রীর আত্মহননের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন চার আইনজীবী কর্তৃক আদালতের নজরে আনলে আদালত ওই মন্তব্য করেন। মাননীয় আদালত হৃদয়বিদারক বাজে দৃষ্টান্ত বলে অল্প কথায় হয়তো এই সীমা লঙ্ঘনের পুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অরিত্রী হননের বাজে দৃষ্টান্ত মানুষ গড়ার কারিগর ব্রতচারী মহৎ শিক্ষকের মহানুভবতা, জ্ঞান বিলানোর অপার ক্ষমতা, মহত্ত ও মানবতাকে মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

শিক্ষক যদি হন অনুর্বর মাটিকে উর্বরতায় ভরিয়ে দেওয়ার অন্যতম জ্ঞানচাষা, শিক্ষক যদি হন যতন স্পর্শের কাদা মাটিতে শুদ্ধ অবয়ব নির্মাণের প্রকৃত জ্ঞানের মৃৎ কারিগর, শিক্ষক যদি হন শিক্ষাশূন্য অপ্রকৃত মানুষকে প্রকৃত মানুষে রূপদানকারী অন্যতম জ্ঞানগুরু, শিক্ষক যদি হন শিক্ষা অনগ্রসর মানবসভ্যতায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো প্রজ্বলক জ্ঞানদিশারি, তাহলে এ কোন শিক্ষকের পাল্লায় পড়ে নিজের জীবন খুইয়েছে অরিত্রী। শিক্ষকের অমর্যাদাকর অশালীন আচরণের বলি হওয়া অরিত্রী আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের দুঃখ, কষ্ট, হতাশা সংবরণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু মেধাবী সন্তানহারা বাবা-মা কীভাবে নিজেদের শোক সংবরণ করবেন, সেটা ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অরিত্রী অঘটনে আবার গর্জে উঠেছে শিক্ষার্থী সমাজ। রাজধানীর রাজপথে তারা কাঁদছে অরিত্রী শোকে। তবে আজ কোনো কোটা আন্দোলন নয়, সড়ক দানবে তরতাজা প্রাণ হরণের প্রতিবাদী আন্দোলন নয়, আজ মানুষ গড়ার কারিগর মহতী প্রাণ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থী অভিভাবক সবাই। তাদের প্রতিবাদী সুরে বেরিয়ে আসছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মৌন কষ্টের অজানা কথা। মহৎ মানুষের পরিচয়ভুক্ত শিক্ষক নামধারী ছদ্মবেশী মানুষের ঘৃণ্য আচরণ সবাইকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। ফেসবুকেও ভাইরাল হয়েছে প্রাণবিসর্জিত অরিত্রীর ছবিসংবলিত ক্ষোব্ধ কথা। জনৈক ব্যক্তি তার ফেসবুক ওয়ালে অরিত্রীর ছবি দিয়ে স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ভুল করবে বলেই সে শিক্ষার্থী’ এবং ‘ভুলকে শুদ্ধ করবেন বলেই আপনি শিক্ষক।’ হ্যাঁ, সে ভুলেভরা শিক্ষার্থী আর আপনি ভুল সংশোধনের শুচিশিক্ষক। গুরু-শিষ্যের মতোই দুজনের পার্থক্য বিবদমান। একজন গুরু তার শিষ্যকে সুপথে পরিচালনা এবং শুদ্ধাচারের পক্ষে অবস্থান নিতে সর্বদা মন্ত্র জপে উজ্জীবিত করেন। সেই পবিত্র মন্ত্রে শিষ্য কলুষমুক্ত হয়ে নিজেকে পবিত্রতার দিকেই এগিয়ে নেয়, তেমনি চঞ্চল চটপটে কোমল অপরিপক্ব ছাত্রটি শিক্ষকের ভুলনিরোধক উজ্জীবনী শিক্ষায় হয়ে ওঠে খাঁটি থেকে আরো খাঁটি। সেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় জ্ঞানতাপস শিক্ষক যদি বিপথগামী ছাত্রকে ভুল শোধরানোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে শাসন-শোষণ অযাচিত ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মেধাবী জীবনের জন্য হয় হুমকিস্বরূপ, তখন শিক্ষকের প্রতি মানুষের যে সম্মানবোধ, সেটি কতটুকু সম্মানের জায়গায় অবস্থান করবে। আজ অরিত্রী শিক্ষক কর্তৃক যে অসদাচরণের বলি হলো, তাতে শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর থেকে মানুষ মারার ভয়ংকর বাজিকরে রূপ নিল কি না, সেটা সচেতন মানুষকে গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।

অরিত্রী যে ভুল করেছে, তার জন্য মৃত্যুই কি একমাত্র প্রাপ্য ছিল? সে ভুলের জন্য অরিত্রীর বাবা-মাকে তার সামনেই কঠিন ভাষায় শাসানো কিংবা স্কুল থেকে অরিত্রীকে তাড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন কি যথার্থ? অরিত্রীর ভুল সংশোধনের দায়িত্ব কি ভিকারুননিসা শিক্ষকের নয়। আসলে কি অরিত্রী মোবাইল ফোনে নকলের জন্যই শুধু অভিযুক্ত, না এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে। অরিত্রীর আত্মহননে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। রাজধানীর অভিজাত স্কুল ভিকারুননিসা ও তার শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ-সংক্রান্ত সংবাদ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হচ্ছে। খবরে প্রকাশ, ‘শিক্ষকদের কাছে কোচিংয়ে না পড়লে পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার হুমকি, অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণ, প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার ভর্তি বাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। অরিত্রীর আত্মহত্যার পর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে গেলে তার কাছে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা বলেন, ভিকারুননিসার শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও অভিভাবকদের প্রতি অসদাচরণ করেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম নিয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশে একাধিক অভিভাবক জানান, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের পরিচালিত কোচিংয়ে মেয়েরা না পড়লে ক্লাসের পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়া হয়।’ রাজধানীর অভিজাত এই স্কুলটির অভিজাতগিরিই অরিত্রীকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছে। ভিকারুননিসার আভিজাত্যকে কাজে লাগিয়ে সেখানকার শিক্ষকরা হয়তো এভাবেই নীরবে শিক্ষার্থী-অভিভাবকের টুটি চেপে ধরছে। অরিত্রী নিজেকে নিঃশেষ করার মাধ্যমে এসব অন্যায়ের জবাব দিয়ে গেছে।

ভিকারুননিসায় অরিত্রী অধ্যায়ই প্রথম নয়, এর আগে আরো ঘটেছে এমন ঘটনা। সংবাদে বলা হয়, ‘তোর কি এত মেধা আছে? তুই তো গাধা। তুই বিজ্ঞানে কীভাবে পড়বি?’Ñ শিক্ষকদের এমন রূঢ় মন্তব্যে তীব্র অভিমান বুকে নিয়ে ঘুমের বড়ি খেয়ে চিরতরে না-ফেরার দেশে পাড়ি দেয় নবম শ্রেণির ছাত্রী চৈতী রায়। অথচ ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকেই জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪ দশমিক ৬০ ফল নিয়ে উত্তীর্ণ হয় সে। তার ইচ্ছা ছিল নবম শ্রেণিতে উঠে সে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করবে। ভবিষ্যতে ডাক্তার হবে। তবে তার সে ইচ্ছায় বাদ সাধেন স্কুলের শিক্ষকরা। চৈতীকে পড়তে দেওয়া হয় ব্যবসায় শিক্ষা, যা সে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। ফলে ২০১২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ঘুমের ওষুধ খেয়ে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দেয় সে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ অরিত্রীর প্রস্থান। এর জন্য সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তি সবাই দায়ী।

আজ অরিত্রী বিয়োগান্ত ঘটনাটিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত ভিকারুননিসা স্কুলের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসসহ তিনজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের এমপিও (বেতনের সরকারি অংশ) বাতিল করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এটা যেন লোক দেখানো আইওয়াশ না হয়। কারণ এই লোক দেখানো তৎপরতা শুধু মানুষকে সাময়িক তৃপ্তি দিতেই পেরেছে। মূল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার নজির তেমনটা দেখাতে পারেনি। মানুষ যেকোনো অপরাধের সুষ্ঠু বিচার চায়। চায় অপরাধীর শাস্তি নিশ্চয়তা। যেকোনো অপরাধের ব্যাপারে রাষ্ট্র যেন হেলাফেলা না করে। অপরাধ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার পথে হাঁটতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

bishwa85@gmail.com

 

"