নির্বাচন

নিয়ামক তরুণ ও নবীন ভোটার

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাদের ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষত এই তরুণ ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার জীবনে প্রথমবারের মতো তাদের ভোট দেবেন, সে হিসেবে তাদের নবীন ভোটার বলা যেতে পারে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন, বিশ্লেষণে এমনকি নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন বিবৃতিতে আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটারদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব গবেষণা তথ্য ও অনুসন্ধানী বিশ্লেষণকে কেন্দ্র করে জাতীয় নির্বাচনের প্রধান দুই জোট এবং অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মাঝে তরুণ ভোটারদের আকৃষ করতে নানামুখী পরিকল্পনার ছক আঁকা হচ্ছে। ঠিক তারই বিপরীতে তরুণ ও নবীন ভোটাররাও নিজেদের মূল্যবান ভোটকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের যথাযথ ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন প্রেক্ষিতে বলা যায়, সত্যিই কবির কথাই যেন সত্যি হতে চলছে। কেননা, ঘুণেধরা নোংরা রাজনীতির হুলিখেলায় ভোটাররা যখন নাস্তানাবুদ তখনÑএই নবীনরাই হয়তোবা আধমরাদের ঘাঁ মেরে বাঁচাবে।

আমাদের তরুণ সমাজ এখন অনেক সচেতন। সদা জাগ্রত তরুণদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। তারা যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে কোনো ভুল করবে না এইটাই প্রত্যাশিত। কেননা, তারা যদি যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে ভুল করে তাহলে আবারো দিক হারাবে বাংলাদেশ। থেমে যাবে উন্নয়নের গতিধারা। তাই জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক এই তরুণ সমাজের কাছে প্রত্যাশা অনেক। তারাই পরিবর্তনের দিকপালের ভুমিকায় অবতীর্ণ হবে এবারের নির্বাচনে। তরুণরাই বিবেচনা করবে কারা দেশ চালাবে। তবে তরুণদেরকেও সচেতন থাকতে হবে যাতে দেশ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও উন্নয়নের গতিধারা থেকে বিচ্যুত না হয়। পাশাপাশি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চার জায়গাটি যেন অবারিত থাকে। যুদ্ধাপারাধি ও দেশবিরোধি শক্তি যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে নিশ্চয়ই সচেতন তরুণ সমাজ বিচার, বিশ্লেষণ সাপেক্ষে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। বাংলাদেশের উন্নয়নধারাকে অব্যাহত রেখে, মুক্তিযুদ্ধের চেনতাকে সমুন্নত রেখে একটি সহনশীল, মানবীয় ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে যাতে আগামির উন্নত বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় তার জন্য এই তরুণ সমাজের সঠিক ও যোগ্য প্রার্থীদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে জাতীয় সংসদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার এটাই সুবর্ণ সময়। আমার বিশ্বাস, আমাদের সোয়া দুই কোটি তরুণ সমাজ যাদের অর্ধেক নারী এবং সিংহভাগ এবার প্রথমবারের মতো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে অনেক ভেবে চিন্তে। তারা নিশ্চয় দল মত ও মার্কা মনোবৃত্তির আদর্শ থেকে সরে এসে শিক্ষিত, রুচিশিল, অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিত, অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রার্থীদের জিতিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা নেবে। এভাবে এই নির্বাচনে যদি ১০০ জন তরুণ, শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিশীল, সেবক মনোবৃত্তির সাংসদকে নির্বাচন করতে আমরা সক্ষমত হই তাহলে রাজনীতিতে আদর্শিক চর্চা অনুসৃত হবে। এভাবে পরবর্তী আরো দুই টামে এই চর্চা অব্যাহত রাখতে পারলে- পাল্টে যাবে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস। আর এই সুযোগটি এসেছে এবারের একাদশ সংসদ নির্বাচনে তরুণ সমাজের ভোটাধিকারের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে।

তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে হলে তাদেরকে নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। তাদেরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে হবে ইতিবাচক ও অভিষ্যতমুখি রাজনীতির পরিবর্তন। মুক্তিযুদ্ধে চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক শিষ্ঠাচার ও সহনশীলতা, উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নের সকলকে নিয়ে এগিয়ে চলার মানসিকতা, তথ্যপ্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের বিপ্লবের মহাপরিকল্পনা থাকতে হবে। কেননা তরুণ সমাজ হানাহানি পছন্দ করেনা। তারা শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে চায়। তাই তাদের ভোট পেতে হলে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন, উন্নয়ন ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ-পরিকল্পনাই হবে সহজ উপায়। তরুণ-নবীন ও নারী ভোটাদের হাতেই আগামির উন্নত বাংলাদেশের চাবি : ২০১৮ : একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। ২০১৪ : দশম সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ জন। ২০০৮ : নবম সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার এবং ১৮ থেকে ২৮ বছরের তরুণ ভোটারের সংখ্যা সোয়া ২ কোটি । ২০০৮ থেকে ২০১৮ : ১০ বছরে দেশে ভোটার বেড়েছে দুই কোটি ৩১ লাখ তিন হাজার ৪৭৭ জন, গড়ে প্রতিবছর ভোটার তালিকায় যোগ হচ্ছে- ২৫ লাখ তরুণ। ফ্যাক্টর ১৮ থেকে ২৮ : একাদশ সংসদ নির্বাচনে যারা জীবনের প্রথমবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন তাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছর থেকে ২৮ বছর। যার সংখ্যা সোয়া ২ কোটি।গড়পড়তা হিসেবে দেশে সাড়ে ১০ কোটি ভোটারের অর্ধেকই নারী। নারীদের মধ্যে অনেকেই বয়সে তরুণ ও শিক্ষিত। তাই ক্ষমতার পালাবদলে ফলাফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর নারী ভোটারা। একারণে নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর উন্নয়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণ-নবীন ও নারী ভোটাররাই নিয়ামক : বলা হয়ে থাকে তরুণরাই পরিবর্তবনের মোক্ষম হাতিয়ার। ধারণা করা হচ্ছে এবার তরুণ, নবীন ও নারী ভোটারদের ভোটেই আগামির বাংলাদেশের পরিবর্তনের শুভ সূচনা হতে পারে। তাই বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে- এজন্য প্রয়োজন তরুণ, নারী ভোটার বিশেষ করে নবীন ভোটার যাত্রা জীবনের প্রথমবার ভোট দিবেন, তাদেরকে নিñিদ্র নিরাপত্তার সাথে যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ দেয়া হয়। পাশাপাশি পরিবর্তনের সারথী এই ভোটারেরা যেন যোগ্য প্রার্থীকে তাদের ব্যালট দিয়ে আগামির উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রাকে বেগবান করতে সহায়তা করে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪০ লাখের বেশি। ১৮ থেকে ২৮ বছরের তরুণ ভোটারের সংখ্যা সোয়া ২ কোটি। তবে এরমধ্যে পুরুষ ভোটার বেশি। ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর থেকে ১০ বছরে দেশে ভোটার বেড়েছে সোয়া দুই কোটির বেশি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের কাছে টানতে বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নানা সুযোগ-সুবিধা ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে নির্বাচনী ইশতেহার। একাদশ নির্বাচনে ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখেরও বেশি ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী তরুণ ভোটারের সংখ্যা সোয়া ২ কোটি। এ কারণে নির্বাচন বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, নির্বাচনে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটারই নিয়ামকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

বলা হয়ে থাকে, একটি দেশের যুবশক্তি বা তরুণের সংখ্যা যত বেশি সে দেশের ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও তত বেশি। তবে যথাযথভাবে তরুণ সম্প্রদায়ের মেধা-মননকে কাজে লাগাতে না পারলে সমূহ বিপদের আশঙ্কাও অমূলক নয়। এদিক থেকে বিবেচনা করলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তরুণদের ভোটের উপর যেমন নির্ভর করছে ইতিবাচক রাজনীতির লক্ষ্য অর্জন, তেমনি আবার রাজনৈতিক দলগুলোর তরুণদের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যত বির্ণির্মানবান্ধব ইশতেহারের উপর নির্ভর করছে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন সোপান। ইতিশেহার প্রসঙ্গে আসলেই যে বিষয়টি গুরুত্ব পায় তা হলো ইশতেহারের বিষয় নির্বাচন কেমন হবে। বর্তমান আধুৃনিক জমানার তরুণ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী অত্যন্ত স্পষ্ট, লক্ষ্য নির্ভর। একালের তরুণেরা রাজনৈতিক নোংরামি পছন্দ করে না। তরুণ সমাজ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা চায়, উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। তাই বর্তমান সময়ের জনপ্রত্যাশা হলো- তরুণ সমাজের মেধা, শ্রম ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা এবং কাজে লাগানো।

দেশজুড়ে আলোচিত হচ্ছে এইসব ভাবনা। কারুণ তরুণসমাজকে অমর একুশ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত করতে পারলে দেশ সঠিক পথে এগিয়ে যাবে। তাই সচেতন অভিভাবকমহলের প্রত্যাশা- নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণ সমাজকে দেশ গঠণে এবং উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজে লাগাবার ক্ষেত্রে যাদের কর্মসূচি গ্রহণযোগ্য মনে হবে তাদেরকেই ভোট দিয়ে যুক্তযুক্ত করবে তরুণ সমাজ। চলতি দশকে বাংলাদেশে তরুণদের সংখ্যাধিক্যকে দেশের সামগ্রিক সম্ভাবনায় প্রধানতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্লেষণ। নবম সংসদ নির্বাচনের পর যারা ভোটার হয়েছেন তাদের আমরা তরুণ ভোটার হিসাবেই বিবেচনা করতে পারি। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের এই তরুণেরাই উদ্ভাবনী ক্ষমতা, প্রায়োগিক শিক্ষা, উন্নত জীবনযাপন ও প্রগতিশীল চিন্তা-চর্চায় দেশ মাতৃকার প্রতি ভালবাসার সাক্ষর রাখবে। এসব কারণেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে তরুণ, নবীন ও নারী ভোটাররাই হবেন ক্ষমতার পালাবদলের বড় নিয়ামক।

লেখ : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

 [email protected]

"