বিশ্লেষণ

পৃথিবী বাঁচাতে পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরি

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ড. ফোরকান আলী
ama ami

সুনামি, ক্যাটরিনা, সিডর, নারগিস প্রভৃতি শব্দের সঙ্গে আজ বিশ্ববাসী ব্যাপকভাবে পরিচিত। কারণ কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী যে হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে, তা গত শতাব্দীতেও পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ বিজ্ঞানীদের

মতে, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতাই এর একমাত্র কারণ। তারা আরো হুশিয়ার করে দিয়েছেন বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দিনে পৃথিবী নামক এ গ্রহটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তাই আজ বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষার তাগিদে সবার মধ্যে একই সুর পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিবেশকে বাঁচানোর তাগিদে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সুইডেনের স্টকহোমে ১৯৭২ সালে। এ বৈঠকে গৃহীত পদক্ষেপগুলো কাগজে-কলমে থাকায় এবং বিশ্বব্যাপী এর কোনো বাস্তব প্রয়োগ না হওয়ায় অচিরেই পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে বিশ্ববাসী। এর ফলে ‘পৃথিবীকে বাঁচাও এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অত্যধিক নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলো’Ñ এ স্লোগানকে সামনে রেখে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে ১৯৯২ সালের ৩ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলন। যা ধরিত্রী সম্মেলন নামে পরিচিত। ওই সম্মেলনে পৃথিবীর ১৭৮টি দেশের প্রতিনিধি এবং বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত এনজিও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে। এ সম্মেলনে ও পশ্চিমা দেশগুলোর অবাধ্য আচরণ সুস্পষ্ট রূপে বিশ্ববাসীর সামনে ফুটে ওঠে। ওই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মি. জর্জ বুশ সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবমালায় স্বাক্ষর করতে অনীহা প্রকাশ করেন। কারণ, পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ধরিত্রী সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবগুলো মেনে চললে নাকি তাদের দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে।

রও আয়োজকরা পরিবেশ ও পৃথিবীর উন্নয়নকল্পে ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রেখেছেন। কিন্তু শোষণকারী বিশ্বের মোড়ল দেশগুলো তার চরম বিরোধিতা করেছিল। অথচ বিশ্বের পরিবেশ দূষণের জন্য ৮০ শতাংশ তারাই দায়ী। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তারা এ ব্যাপারে এতটুকু ছাড় দিতেও নারাজ। পশ্চিমা দেশগুলোর শিল্পের কাঁচামাল জোগানোর ফলে বিশ্বের ‘ফুসফুস’ বলে খ্যাত রেইনফরেস্ট আজ বিলীন প্রায়। প্রত্যেক বছর ৪০ লাখ হেক্টর রেইনফরেস্ট উজাড় করা হচ্ছে, এর মধ্যে এশিয়ার রয়েছে সিংহভাগ অর্থাৎ পায় ২০ লাখ হেক্টর। ফাও-এর মতে একটি দেশের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকার জন্য মূল ভূখ-ের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন। অথচ আমাদের এ সুজলা সুফলা দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ছিল বনাঞ্চলে ভরপুর। যেখানে ১৯৬৫ সালে দেশের বনভূমির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ, তা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ৭-৮ শতাংশে।

মানুষের ধারণা প্রকৃতির ধারণ-ক্ষমতা অসীম। বর্তমান শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত মানুষের বদ্ধমূল এ ধারণা ছিল। মানুষ পরিবেশকে যতই দূষিত করুক না কেন। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে তা পরিশোধন করতে সক্ষম। ষাটের দশকে এ নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। আশির দশকে বিশেষজ্ঞরা প্রকৃতির সীমিত ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। নব্বইয়ের দশকে এসে অনুধাবন করেন যে, পরিবেশ বিবেচনাকে বাইরে রেখে টেকসই উন্নয়ন আদৌ সম্ভব নয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোতে এ পর্যন্ত পরিবেশ সম্পর্কিত কল্পনা-জল্পনা ও উৎসাহের কমতি নেই। আশির দশকের প্রথমে টোকিওতে অনুষ্ঠিত বিশেষজ্ঞদলের আলোচনা সভায় এবং ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকারি আলোচনা সভায় এ নিয়ে বিশ্লেষিত হয়। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের উন্নয়নে গতিধারার কখনো কখনো যে স্তিমিত অবস্থা লক্ষ করা গেছে। তার পেছনে পরিবেশকে গুরুত্ব না দেওয়া কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবেশ বিবেচনাকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন আদৌ সম্ভব নয়। তবে যদি হয় সেটা হবে ভারসাম্যহীন এবং অপরিপক্ক উন্নয়ন। তবে এদের সবাই একমত যে, টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ বিবেচনা আবশ্যক।

টেকসই উন্নয়ন: আশির দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন ব্যবস্থাপক ও প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের মুখে টেকসই উন্নয়ন কথাটি খুব বেশি শোনা যায়।

প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের মতে, যদি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নকাল শেষেও কোনো রকম বহিঃপৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই টিকে থাকতে পারে, তবে তাকে বলা হয় টেকসই প্রকল্প। আর এ জাতীয় উন্নয়নের গতিধারাকে বলা হয় টেকসই উন্নয়ন। উন্নয়নশীল বিশ্বের দারিদ্র্য, আন্তর্জাতিক অসমতা, টেকসই উন্নয়ন এগুলো হচ্ছে পরিবেশ ও উন্নয়নের মৌলিক বিষয়। টেকসই উন্নয়ন হলো এমন এক ধরনের উন্নয়ন যা অধিকতর নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক অগ্রগতি আনয়নে অবদান রাখে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থানীয় ও বিশ্ব পরিবেশকে সংরক্ষণ করে এবং সঠিক অর্থে জীবনের মানোন্নয়ন ঘটায়।

পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের কলা-কৌশল ঃ বৈজ্ঞানিক আবিস্কার এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন মানুষকে বস্তুগত ও নানাবিধ ভোগ-বিলাসের স্বাদ দিয়েছে। আর তাই বস্তুগত সম্পদ পাওয়ার আশা কখনো হ্রাস পায় না। সম্পদের ব্যবহার ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সেটা এ কারণে যে, আমরা সংখ্যায় অনেক বেশি এবং আমাদের খুব স্বল্প সংখ্যক লোকই অনেক কিছু দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে গভীর চিন্তা ভাবনা করে থাকে। যার জন্য অনেক কিছুই আমাদের জীবন যাপনের এমনকি বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং সমগ্র সমাজেই জীবমন্ডলের ওপর আচরণের পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

তাই সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞরা নিন্মোক্ত কলা-কৌশলের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিল।

* ব্যাপক পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি। * পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ। * কেন্দ্রীয় পরিবেশ কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব। * করারোপ। * পরিবেশ উন্নয়নে উৎসাহদান। * পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকতার সমন্বয় ইত্যাদি।

গ্রিন হাউস : মেরু অঞ্চলে তাপমাত্রা খুব কম থাকে। সেখানে সূর্যালোক বড় একটা দেখা যায় না। যেখানে গাছ-পালা জন্মানোর অনুকূল নয়। তবু কেউ কেউ কৃত্রিমভাবে সবুজ গাছ জন্মিয়ে থাকে। যে কৃত্রিম ব্যবস্থায় সবুজ গাছ জন্মিয়ে থাকে তা গ্রিন হাউস।

সবুজ ঘর আসলে একটা কাচের ব্যবস্থামাত্র। কাচ নির্মিত বা বেষ্টনিতে তাপমাত্রা খুবই বেশি থাকতে দেখা যায়। সৌর রশ্মি অপরিবর্তিতভাবে কাচের ভেতর ঢুকে পড়ে। উত্তপ্ত দেয়াল থেকে লম্বা দৈর্ঘ্যরে তরঙ্গগুলো বিকিরণ হয়। এগুলো আবার কাচ হতে প্রতিফলিত হয়। ভেতরের দিকে বারবার প্রতিফলিত হয় বলে এরা আর বের হতে পারে না। ফলে যতক্ষণ সূর্য জ্বলতে থাকে রশ্মিগুলো কাচের ফাঁদে আটকা পড়ে ভেতরটা উত্তপ্ত করতে থাকে।

উপরোক্ত কারণে সবুজ ঘর সৌর তাপের ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। তবে সবুজ ঘরে তাপমাত্রা অনির্দিষ্ট মাত্রায় বাড়ে না। নানাভাবে তাপ পালিয়ে যায়। তবুও রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সবুজ ঘর যন্ত্রণাদায়ক তাপ উৎপন্ন করতে পারে। সাম্প্রতিককালে

গ্রিন হাউস ইফেক্ট সারা পৃথিবীকে ভাবিয়ে তুলেছে।

উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জন্য আজ এটা মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। শ্বাস গ্রহণকালে আমরা বাতাসের অক্সিজেন

গ্রহণ করি। ফুসফুস বাতাসের এ অক্সিজেন গ্রহণ করে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বর্জন করে। এই কার্বন-ডাই অক্সাইড বাতাসে মিশে যায়।

প্রকৃতির গাছ-পালা লতাগুল্ম এমনকি যে ক্ষুদ্র ঘাসকে আমরা নিত্য পায়ে দলি। আর সে ঘাসও অক্সিজেন তৈরির প্রক্রিয়ায় নিখুঁতভাবে অবিরত কাজ করছে। বাতাসে অক্সিজেন সরবরাহ অবিরত চলছে বলেই প্রাণীকুল বেঁচে আছে। মানবসভ্যতার অগ্রগতির ফলে বিভিন্ন কল-কারখানা গড়ে উঠেছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে অক্সিজেনের ওপর। বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস বায়ুমন্ডলের উপরিভাগে উঠে চারদিকে একটি আবরণীর সৃষ্টি করছে। দিনের বেলায় সূর্যালোক এসে পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে আর রাতের বেলায় এই তাপ বিকিরিত হয়ে শূন্যে হারিয়ে যায়। ফলে পৃথিবীর সব জায়গায় তাপমাত্রার একটা সাম্যবস্থা বিরাজ করে। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বায়ুমন্ডলে তাপমাত্রা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া বিস্তার করছে। প্রতি এক ডিগ্রি ফারেনহাইট উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ধান-গম ইত্যাদি ফসলের বা ফলন পুষ্টি কম হয়ে যাচ্ছে। ফলে ধান-গম ইত্যাদি শস্য চিটা হয়ে যায়। আমেরিকার মতো গম উৎপাদনকারী দেশ ও এশিয়ার মতো ধান উৎপাদনকারী দেশে এর প্রভাব পড়তে শুরু করছে খুব মারাত্মকভাবে। এ প্রভাব সম্প্রতি আমাদের দেশেও পড়তে শুরু করেছে। এ ছাড়া বায়ুমন্ডলে তাপমাত্র বৃদ্ধির আর একটি প্রভাব হচ্ছে সমুদ্রের পানির উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়া। এ উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রে জমা হচ্ছে। এর ফলে ক্রমান্বয়ে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ মেরুর বরফ গললে পৃথিবী যতটা বিপন্ন হবে, উত্তর মেরুর বরফ গললে তার চেয়ে আরো বেশি মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হবে। ওজন স্তর ধ্বংস হলে অতি বেগুনি রশ্মির প্রতিক্রিয়ার মানবদেহে চর্ম, ক্যান্সার ব্যাপক আকারে দেখা যাবে। অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাবে সমুদ্রকূলে মৎস্যের খাদ্য জৈব প্লাংটন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ফলে সমুদ্রে আর মাছ থাকবে না। পরিবেশ দূষণের প্রতিক্রিয়া আজকের এই গ্রিন হাউস ইফেক্ট। পরিবেশকে বাঁচাতে হলে ও আমাদের বাঁচতে হলে এ দূষণ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

লেখক : গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

"