প্রত্যাশা

কেমন ইশতেহার চাই

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

দরজায় কড়া নাড়ছে জাতীয় নির্বাচন। ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিপুল প্রত্যাশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক এবং স্থানিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের টিকে থাকা, সুস্থতা ও উন্নয়নের জন্য জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনগণের জন্য ক্ষমতায় গেলে কী ধরনের কার্য পরিকল্পনা সম্পাদন করবেন তার একটা পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেশ ও জাতির জন্য তুলে ধরবেন। সবার নজর এখন ইশতেহার প্রকাশের দিকে।

ভোটারদের কাছে টানতে নানা চমক নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ইশতেহার তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে। ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের স্লোগান ছিল ‘দিনবদলের সনদ’। ২০১৪ সালে ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’। ২০১৮ সালের নির্বাচনী স্লোগান হচ্ছে ‘গ্রাম হবে শহর’। এতে ডেল্টাপ্ল্যান ২১০০, ব্লু ইকোনমি, তরুণদের ক্ষমতায়ন, দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স, নারীবান্ধব কর্মসূচি, বয়স্ক পুনর্বাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি থাকছে।

নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ একটা রাজনৈতিক রেওয়াজ। নির্বাচনে বিজয়ী হলে দেশ ও জনগণের জন্য কী ধরনের কাজকর্ম করা হবে; তা এই ইশতেহার নামক ঘোষণাপত্রে প্রকাশ করা হয়। এটা করা হয় এ কারণে, যাতে ওই কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে জনগণ ভোটের বাক্স ভর্তি করে তাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসে। যে দল যত গণমুখী, তাদের নির্বাচনী ইশতেহার তত সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়। নির্বাচনকালীন সময় ঘোষিত কর্মসূচির পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়। ২০০৮ সালে নির্বাচনের পূর্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যে ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছিল, তাতে দিনবদলের চেষ্টা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সত্য-সত্যই আ.লীগ পরবর্তী বছরগুলোতে দিনবদলে সক্ষম হয়। সুদীর্ঘ ১০ বছর একটানা ক্ষমতায় থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছে যে, ২০০৮ সালের পূর্বে বাংলাদেশের যে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিরাজমান ছিল, তা সম্পূর্ণভাবে মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে দিয়ে এমন গতিসঞ্চার করা হয়েছে যে, আজ প্রতিটি মানুষ ভাগ্য পরিবর্তন শুরু করেছে। আর প্রতিটি ক্ষেত্রে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার নিরন্তর সাহায্য করে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিব্যবস্থাপনা, সড়ক ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি দমন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমন সব যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। মানুষ এখন সবল, সুস্থ, সক্ষম জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় সবাই তৎপর। শেখ হাসিনার সরকার দেশের জনগণের জন্য সুদিন বয়ে আনতে পেরেছে; তা দেখে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার সরকারকে আগামী নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় আনার চিন্তা করছে জনগণ। এবার এমন এক নির্বাচন ক্ষমতাসীন দল আ.লীগ মোকাবিলা করতে যচ্ছে, যাতে সব দল ও মতের অংশগ্রহণ প্রায় সুনিশ্চিত। জনগণের ভোটের ওপর নির্ভর করে তাকে পুনরায় ক্ষমতায় যেতে হবে। এবারের নির্বাচনী ইশতেহার হতে হবে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও গণমুখী। এই ইশতেহার হতে হবে মানুষের চিন্তাচেতনা বহনকারী। বাংলার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে। এ সরকার যে উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম, তা জনগণ খুব ভালো করেই জানে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছে। উন্নয়নের মহাসড়কে আজ বাংলাদেশ। এরপরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনগণের যে আশা পূরণ হয়নি, তাও বাস্তব সত্য। যেসব ব্যাধি সমাজকে পীড়া দেয়, তার মধ্যে দুর্নীতি অন্যতম। একমাত্র দুর্নীতির কারণেই ২৫-৪০ শতাংশ উন্নয়নের সুফল মানুষ ভোগ করতে পারে না। ধরুন, ১০০ টাকা ব্যয় করে যে উন্নয়নের সুফল পাওয়া যায়, তার পরিমাণ যদি ৯০ ভাগ হয়, তাহলে বলা যায় উন্নয়ন প্রক্রিয়া সফল হয়েছে। যদি ৮০ ভাগ হয় তাও কম নয়। কিন্তু ১০০ টাকা ব্যয় করে যদি ৫০ ভাগ বা তারও নিচে অর্জন হয়, তাহলে বলতে হবে অনিয়মতান্ত্রিকতা ও দুর্নীতি উন্নয়নকে প্রতিহত করছে।

আমাদের বাজেট যদি ৪ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন নির্ধারণ হয়ে থাকে এবং তা ৩০-৪০ শতাংশ অর্থ দুর্নীতির কারণে অপব্যয় হয়, তাহলে উন্নয়ন হবে কী করে। বাজেটের আকার যতই বড় হোক না কেন, দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে না পারলে উন্নয়নের গতি স্তিমিত হতে বাধ্য। তাই বাজেটের বৃহৎ আকার দেখে উন্নয়নের আকার বৃহৎ হবে বলে চিন্তা করা ঠিক হবে না। আর প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য জনগণকেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হবে। আমাদের প্রতি বছর বৈদেশিক বিনিয়োগের যে সুদ দিতে হয়, তাতে করে বৃহত্তর খুলনা জেলার মতো জেলায় সম্পূর্ণ উন্নয়ন তৎপরতা সম্পন্ন করা যায়। ঘুষ, দুর্নীতি নিয়োগ বাণিজ্য, মনোনয়ন বাণিজ্য সবকিছু বিবেচনায় নিলে ও কালো টাকার যে পাহাড় আমাদের অর্থনীতির ওপর যে প্রভাব পড়ছে এবং যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে; তা বিবেচনায় নিলে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আমাদের উন্নয়ন তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পেত। আমরা বিশ্ব অর্থনীতিতে আরো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারতাম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা চুরি এবং ব্যাংকিং ক্ষেত্রে যে অরাজকতা এখনো বিদ্যমান, জবাবদিহির প্রশ্ন এখনো এড়িয়ে যাচ্ছে, তা সামাল দিতে পারলে, আমাদের অর্থনীতি আরো শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারত, সদিচ্ছা ও জবাবদিহির প্রশ্নে এড়িয়ে গেলে; অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের সরকারপ্রধান সৎ, দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত সক্রিয় থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তিনি সফলতার সাথে সামাল দিচ্ছেন, তার পরও বলতে হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার এত সবল নয়। এ সরকার ও তার দলের হাইআপস্ দুর্নীতির সাথে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়েছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে তাই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আগামী ইশতেহারে এরূপ কিছু কথা উল্লেখ থাকলে জনগণ খুশি হয়ে এই সরকারকে আবার ক্ষমতায় আনবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ সরকার গণমুখী ও জনকল্যাণমুখী কাজ করেছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সন্দেহ নেই সক্ষমতা নিয়ে। সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এ কথাও সত্য, দুর্নীতি আরো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখলে উন্নয়নের আকার আরো ২০-৩০ ভাগ বৃদ্ধি পেত। সবচেয়ে বড় কথা, যারা এসব অনিয়ম করছেন, তারা জনসংখ্যায় ৫ ভাগও নন। পরোক্ষভাবে হয়তো কিছু কিছু লোক জড়িয়ে পড়ছেন, তবে অধিকাংশ জনগণ এর সাথে সংশ্লিষ্ট নন। তাই তারা দুর্নীতি করে জনগণের ভাগ্যের বিপর্যয় ঘটাচ্ছেন, তাদের তা করতে দেওয়া যাবে না। সংখ্যায় কম হলেও দুর্নীতিবাজরা অত্যন্ত শক্তিশালী। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাই পারেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করতে। যেভাবে মাদক ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করেছে, ঠিক তেমন করে ইশতেহারে আগামীতে সরকার গঠন করে এদেশ থেকে দুর্নীতিকে চির বিদায় দেবেন বলে জনগণের প্রত্যাশা। তাই নির্বাচনী ইশতেহার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও কঠোর দিকনির্দেশনা থাকা বাঞ্ছনীয়। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার থাকতে হবে।

শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা, বয়স্কভাতা ও প্রতিবন্ধীদের মানবিক কারণে সরকারি ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি যা ওয়াদা করেন, যেই প্রতিশ্রুতি পালন করেন। শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃক গৃহীত সামাজিক সুরক্ষায় নানাবিধ কর্মসূচির বাস্ত¡বায়ন ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। আমাদের সম্পদ সীমিত কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব দারিদ্র্য দেশের তুলনায় অত্যাধিক। তাই সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে কীভাবে জনসম্পদে পরিণত করা যায় এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়, এ বিষয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্ব সহকারে সন্নিবেশিত থাকতে হবে।

আমি এই লেখার শেষে এই বলে সমাপ্তি টানতে চাই যে, হাজারো সমস্যায় জর্জরিত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে। শুধু কথা বা কাগজ-কলমে অঙ্গীকার নয়, বাস্তবায়নেরও পথ দেখাতে হবে। তুলে ধরতে হবে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও কৌশল, তবেই জনগণের জন্য একটি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং সবার বাসযোগ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব। এটা আমার মতো বিবেকবান, দেশপ্রেমিক এবং শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের প্রত্যাশা। দেশের সর্ববৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল, যাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সেই রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট

"