মতামত

কায়িক পরিশ্রম ও আমাদের শিশু

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মো. মাঈন উদ্দিন

সন্তানের ভালো কে না চায়। নিজের সাধ্যের সবটুকু উজার করে দেওয়া হয় আদরের সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে, তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বা আলোকিত করার জন্য। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় হলো আধুনিক যুগে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের একটি প্রয়োজনীয় অংশ কায়িক পরিশ্রমের সুযোগ একেবারেই কমে আসছে। অন্যদিকে বিভিন্ন জাঙ্কফ্রুট সহজলভ্য হচ্ছে, এর ফলে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নানাবিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে তীব্রভাবে।

ঢাকাসহ বড় বড় শহরে সকাল বেলার একটি কমন দৃশ্য চোখে পড়ে তা হলো-প্রাতঃভ্রমণ। এসব প্রাতঃভ্রমণে সাধারণত যারা অংশগ্রহণ করেন তারা হলেন বয়স্ক টাইপের পুরুষ বা মহিলা। কারণ কী? বিভিন্ন কারণে তারা প্রাতভ্রমণে অংশগ্রহণ করে থাকেন। যার মধ্যে প্রধান কারণ হলো-নানাবিধ অসুস্থতা। তার মানে শরীর সুস্থ্য রাখার জন্য কায়িম পরিশ্রমের অংশ হিসেবে তারা প্রাতঃভ্রমণ করে থাকেন। এদের মধ্যে খুব অংখসংখ্যক যুবক বা যুবতীও প্রাতঃভ্রমণে অংশ নেয়, যাদের উদ্দেশ্য সম্ভাব্য রোগ-বিরোগের প্রতিকারস্বরূপ। কিন্তু শিশুদের প্রাতঃভ্রমণে দেখা যায় না বললেই চলে। আধুনিক যুগে শিশুদের পড়াশোনার যে চাপ, তাতে সকালবেলা শিশুদের শারীরিক পরিশ্রম হিসেবে প্রাতঃভ্রমণের সুযোগ কোথায়? এ ছাড়া রুটিনমাফিক পড়াশোনার ফাঁকে শিশুদের কায়িক পরিশ্রমের সুযোগ আস্তে আস্তে কমেই আসছে। অথচ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য শিশুদের কায়িক বা শারীরিক পরিশ্রম একান্ত জরুরি।

বাংলাদেশ রিপোর্ট কার্ড অন ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ুথ শীর্ষক এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু শারীরিকভাবে সক্রিয় নয়। অর্থাৎ সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে যে ধরনের শারীরিক কর্মকান্ড করতে হয় তা তারা করে না। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় প্রকাশিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ১৩ থেকে ১৭ বছরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৪১.৪ শতাংশ শিশু দিনে এক ঘণ্টা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকে। অন্যদিকে ৫৯.৬ শতাংশ শিশুই প্রয়োজনীয় শারীরিক কর্মকান্ড করে না। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য দিনে কমপক্ষে এক ঘণ্টা শারীরিক কর্মকান্ড করা উচিত। কেননা, এর ফলে শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই প্রজন্মকে জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং আগামীর অনেক প্রতিকূলতাকেও জয় করতে হবে। আর তাই তাদের স্বাস্থ্যবান ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে সক্ষম হওয়ার জন্য শারীরিকভাবে সক্রিয় হওয়া জরুরি। সুতরাং তাদের যাতায়াতে শারীরিক পরিশ্রম, স্কুলে খেলাধুলার আয়োজন, এলাকায় খেলাধুলার ব্যবস্থা এবং জাতীয়ভাবে শারীরিক কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এলাকায় খেলার মাঠ, পার্ক-শিশুপার্ক বা অন্য কোনো বিনোদন কেন্দ্র নেই বললেই চলে। ফলে শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দারুণভাবে। বর্তমানে গড়ে ওঠা নতুন নতুন আবাসিক এলাকাগুলোতেও শিশু-কিশোরদের মানসিক আনন্দ-বিনোদনের জন্য থাকছে না কোনো পার্ক বা খেলার মাঠ। উপরন্তু আমাদের শহরগুলোতে পুরনো যেসব খেলার মাঠ রয়েছে, সেগুলোও বেদখল হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার খোলা জায়গায় বস্তি গড়ে ওঠায় শিশু-কিশোরদের খেলার সুযোগ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। নগরসভ্যতার দাপটে সর্বত্র হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। আর মাঠ হারিয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

নগরের শিশু-কিশোররা এখন বন্দি হয়ে পড়ছে চার-দেয়ালের মধ্যে। বাইরে খেলার সুযোগ না থাকায় তাদের ঘরোয়া পরিবেশেই সময় কাটাতে হচ্ছে। শিশু-কিশোররা হয়ে পড়ছে টিভি-কম্পিউটার-ভিডিও গেমসনির্ভর। অথচ সিটি করপোরেশনগুলোর সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ থাকার কথা। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। তদুপরি পাড়া-মহল্লার মাঠগুলোয় ঘাসের অভাব ও বাউন্ডারি না থাকা, তদারকির অভাব এবং বিভিন্ন সময়ে মেলার জন্য স্টল বরাদ্দের কারণে শিশু-কিশোররা এসব মাঠে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য খেলাধুলার প্রয়োজন। খেলার মাধ্যমে তাদের মগজে রক্তসঞ্চালন ভালো হয়। শৈশবে খেলার চর্চা না থাকলে শিশুদের আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে যায়। সুতরাং শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু দৈহিক ও মানসিক বিকাশের প্রয়োজনেই পার্ক বা খেলার মাঠের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এর পাশাপাশি অ্যাক্টিভ লাইফস্টাইল বিষয়ে একটি জাতীয় নীতি প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়নের উদ্যোগ ও তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে-শারীরিকভাবে সক্রিয় হওয়া শুধু ইচ্ছার বিষয় নয়, জীবনের জন্যও প্রয়োজন। অতএব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

moin412902@gmail.com

"