বিশ্লেষণ

সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

চামড়া শিল্প এ দেশের জন্য একটি বিরাট সম্ভাবনাময় খাত। বাংলাদেশে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জুতা তৈরির কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বড় প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ১১০ থেকে ১৫০টি, যেগুলোকে আমার ম্যাকানাইজ বা সেমি ম্যাকানাইজড ফ্যাক্টরি বলি। এ শিল্পের সাথে সরাসরি প্রায় ২০ লাখ শ্রমিকের জীবনজীবিকা জড়িত। তৈরি পোশাকশিল্পের মতো ফুটওয়্যার খাতের ৭০ শতাংশ কর্মীই নারী। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৪ কোটি ৩০ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করে। বিশ্বে ফুটওয়্যার উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান অষ্টম ।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চাহিদার কথা বিবেচনা করে চামড়াজাত পণ্য রফতানির বাড়ানোর ওপর সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই দেশে চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ও রফতানি আয় বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং প্রণোদনাও দিতে হবে। একসময় কূটনীতি ছিল রাজনৈতিক আর এখন হয়ে গেছে অর্থনৈতিক। তাই এ বিষয়ে সরকার সব দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাই কমিশনারদের ডেকে তাদের করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেছে। কী ধরনের বিনিয়োগ আমাদের দেশে আসতে পারে, সেটাকেই খুঁজে নিয়ে আসা এবং সেভাবেই আমাদের কাজ করতে হবে। সরকার রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত যে চারটি খাতের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ নামে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার মধ্যে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাশিল্প অন্যতম।

রাজধানীর হাজারীবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ট্যানারি শিল্পসমূহকে একটি পরিবেশবান্ধক জায়গায় স্থানান্তরের জন্য ঢাকার সাভারে ধলেশ্বরী নদীর তীরে ২০০ একর জমিতে চামড়া শিল্পনগরী স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ১১৫টি ট্যানারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে। তবে এটাকে আরো আধুনিকায়ন করতে হবে। জবাই করা পশুর শরীর থেকে সঠিক নিয়মে চামড়া সংগ্রহ না করার কারণে সংগ্রহকৃত চামড়ার একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এটা চামড়াশিল্পের জন্য একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ট্যানারি মালিকদের চামড়া সংগ্রহের আধুনিক কলাকৌশলের ওপর কসাইদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

চামড়া খাতে যে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসছে, তা ওই প্রদর্শনীতে গিয়েই বোঝা গেছে। ক্রাফটম্যান নামের নতুন একটি জুতার ব্র্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রদর্শনীতে যাত্রা শুরু করে। ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার আ্যান্ড এক্সেসরিজের ব্যবস্থাপক (পণ্য উৎপাদন) জানান, তাদের কারখানা গাজীপুরে অবস্থিত। দেশীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি তারা পণ্য রফতানি করার প্রত্যাশা করেন। তাদের লক্ষ্য একটু দামি পণ্য উৎপাদন করা। জানা যায়, গত দুই বছরে চামড়ার জুতা, চামড়াজাত পণ্য ও অন্যান্য পাদুকা উৎপাদনে প্রায় ৫০টি নতুন কারখানা বাংলাদেশে স্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বেশ বড়। নতুন করে দেশবন্ধু গ্রুপ, ন্যাশনাল পলিমার, জাপানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আ্যালায়েন্স ফুটওয়্যার, ভারতের ফরিদা গ্রুপ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি কিছুটা কমেছে। শুধু চামড়ার পাদুকা রফতানি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ খাতে দুটি বিষয় খুব জরুরি। একটি হলো সাভারে সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা। প্রয়োজনে এই ক্ষেত্রে দক্ষ কোনো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নিরীক্ষা করিয়ে দেখা যেতে পারে, কী কী ঘাটতি রয়েছে। আবার সিইটিপি পরিচালনার দায়িত্ব কোনো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যেতে পারে। পণ্যের সরবরাহ আদেশ পাওয়ার পর রফতানি মধ্যকার সময় (মিড টাইম) কমিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যার হাউস তৈরির মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার বসুন্ধাতে ‘লেদার টেক বাংলাদেশ-২০১৮’ নামের চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাশিল্পের প্রদর্শনীতে হংকং, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, জাপান, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৩টি দেশের ক্রেতারা অংশ নিয়েছেন। এবারের মেলার স্লোগান ছিল ‘বাংলাদেশ ডেস্টিনেশন নেক্সট’। মেলায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, সোর্সিং এজেন্ট, রিটেইলার, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাশিল্প সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিনোয়োগকারীদে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা মেলায় অংশ গ্রহণ করে সরাসরি বাংলাদেশ থেকে পণ্য সোর্সিং সুবিধা ও বিনিয়োগের সম্পর্কে অবগত হওয়ার সুযোগ পান। লেদার গুডস অ্যান্ড ম্যানুফেকচারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

প্রায় ২২ হাজার কোটি ডলারের বিশ্ব চামড়াজাত পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব খুবই সামান্য। চামড়াজাত পণ্যের রফতানি আয় বাড়ানোর পর্যাপ্ত সুযোগ আছে বাংলাদেশের। তবে বৈশ্বিক বাজার ধরতে হলে বাংলাদেশকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে চামড়া উৎপাদন করে চামড়া থেকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে রফতানি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পণ্যবাজার পরমর্শক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকনাভিওয়ের ‘চামাড়জাত পণ্যের বাজার; ২০১৭-২১’ শীর্ষক সমীক্ষায় বলা হয়Ñ ২০১৬ সালে বিশ্বে চামড়াজাত পণ্য বেচাকেনা হয়েছে ২১ হাজার ৭৪৯ কোটি ডলারের। বাজারের এই আকার বেড়ে ২০২১ সালে ২৭ হাজার ১২১ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। এতে বছরে ৫ শতাংশ হারে বাড়াবে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ দেশের চামড়াজাত পণ্যের রফতানি আয় ছিল ১২৩ কোটি ডলার, যা তার আগের বছরের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি। টেকনাভিওয়ের বাজার সমীক্ষার সাথে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের তুলনা করলে দেখা যায়, মোট বৈশ্বিক বাজারের শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ দখলে নিতে পেরেছে বাংলাদেশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এখন দেশের দ্বিতীয় রফতানি খাত। মানের দিক দিয়ে ইউরোপের চামড়া বিশ্ব সেরা। এরপরই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চামড়ার মান। বাংলাদেশের চামড়ারব্যাগ জাতীয় পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার হলো চীন। বেলজিয়াম, হংকং, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, স্পেন, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে বেশ ভালো পরিমাণে রফতানি হয় ব্যাগজাতীয় পণ্য। আর চামড়ার জুতার সবচেয়ে বড় বাজার হলো জার্মানি। এ ছাড়া কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল রফতানি হয় বাংলাদেশের চামড়ার জুতা। এমনকি জাপানেও বাংলাদেশের চামড়ার ব্যাগ ও জুতার বড় বাজার রয়েছে।

এ দেশের গরু ও ব্ল্যাকবেঙ্গল জাতের ছাগলের চামড়া দিয়ে মেয়েদের উন্নতমানের জুতার ব্যাগ তৈরি করা হয়। কারণ, এ দেশের চামড়ার পুরুত্ব কম ও সহজে নরম করা যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশি চামড়ার উপরিভাগ খুব মসৃণ, যা পুরুষের জুতা তৈরির জন্য খুব উপযোগী। চামড়া রফতানিকারকরা বলেন, বৈশ্বিক বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে কোনোপ্রকার চামড়া কেনে না। কারণ দেশের ট্যানারিগুলোর বিরুদ্ধে রয়েছে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ। সাভারে স্থাপিত চামড়াশিল্প নগরে পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদন শুরু হওয়ায় চামড়াজাত পণ্যের রফতানি কয়েক গুণ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাজার ১০০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে আগামী ৩ বছরে মধ্যে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন খাতে এখন দেশে ১০টির মতো বিশ্বমানের কারখানা আছে।

২০১৬ সালে সারা বিশ্বে ফুটওয়্যারের রফতানির মধ্যে চীনের অংশ ছিল ৩৭ শতাংশ, যার পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সালে চীনের ফুটওয়্যার রফতানি ছিল প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চীনের রফতানি বাজার ১ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে। ভিয়েতনাম এই বাজারে প্রবেশ করে আশির দশকের দিকে। তাদের মূল্য সংযোজন বাংলাদেশের মতোই, প্রায় ৩৩ শতাংশ। ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি মূল্য সংযোজনের সক্ষমতা আছে বাংলাদেশের। চেষ্টা করলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করতে পাররে দেশটি। তাই আমরা যে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির দেশে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, তা কোনো অবাস্তব কল্পনা নয়। এটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। ২০২১ সালে আমারা যদি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চাই, তাহলে দেশে পশু উৎপাদন বাড়াতে হবে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে পশু গবেষণা, পশু খাদ্য ও পশুচিকিৎসা খাতে আরো অধিক মনোযোগ দিতে হবে।

বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য পণ্যের মূল্য সংযোজন, কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে কারখানার কর্মপরিবেশের ওপর জোর দিতে হবে। শিল্পে অটোমেশনের বিপ্লবের ফলে তৈরি পোশাক, চামড়া খাতসহ দ্রুতবর্ধনশীল শিল্প খাতে বিপুল পরিমাণ শ্রমিকের চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই এর আগেই দেশের জনশক্তিকে মৌলিক কারিগরি শিক্ষায় স্বনির্ভর করে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিল্পের ভ্যালুচেইন এবং সার্টিফিকেশনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস, নাটোর

netairoy18@yahoo.com

"