পরামর্শ

রাজধানীর যানবাহন পরিকল্পনা

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবু আফজাল মোহা. সালেহ

যানবাহন থেকে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বেশি। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, আলো দূষণ প্রভৃতি ঘটে পরিবহন খাত থেকে। ডিজেল ব্যবহার, নিয়মিত মেরামত না করা, লক্কড়ঝক্কড় যান ইত্যাদি কারণে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমবেশি হয়। অতিরিক্ত যানবাহনের ওপরও দূষণমাত্রা নির্ভর করে। কয়েকটি শহর যানবাহনের চাপ কমিয়ে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে বা জিরোতে আনতে যানবাহন নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আমরা আমাদের দেশে বাস্তবায়ন করতে পারি।

নরওয়ের রাজধানীতে ডিজেল গাড়ি নিষিদ্ধের ব্যবস্থা করা হয়েছে ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে। অবশ্য অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য সরকারি পরিসেবার যানবাহন ডিজেল হলেও চলতে পারে। ২০১৯ সাল থেকে সিটি সেন্টারে সরকারি পার্কিং কমিয়ে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ২০২৪ সাল থেকে ফ্রান্সের রাজধানীতে ডিজেল গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ হবে; ২০৩০ সাল থেকে প্যারিসে ডিজেল বা পেট্রল, কোনো ধরনের খনিজ তেলে চলা গাড়ি নিষিদ্ধ করা হবে। প্যারিসে শুধু ইলেকট্রিক গাড়ি চলবে। আমরা একটু গবেষণা করে অনুরূপ বা বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারি।

মানুষ যেন গাড়ি নিয়ে শহরের কেন্দ্রে আসতে কমিয়ে দেওয়ার জন্য (একেবারেই প্রয়োজন ছাড়া) লন্ডনের কেন্দ্রে গাড়ি চালাতে গেলে দিনে ১০ পাউন্ড বা প্রায় ১৪ ডলার কিংবা ১১ ইউরো মাশুল গুনতে হয়। ২০০৩ সাল থেকে এই ‘কনজেশ্চান চার্জ’ বসানো হয়েছে। রাস্তায় লাগানো যন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বরপ্লেট চিনে নিতে পারে অর্থাৎ ধরতে পারে, ‘ভিড়ের মাশুল’ দেওয়া হয়েছে কি না। ব্যত্যয় হলে ২৪০ পাউন্ড অবধি জরিমানা! কোপেনহেগেনে ২০১৯ সাল থেকে ডিজেল গাড়ি ঢোকা বন্ধ করার কথা ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে ডেনমার্কের রাজধানীতে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা শুধু সাইকেল আরোহীদের জন্য রাখা; শহরের অর্ধেক বাসিন্দা সাইকেলে চড়ে অফিস যান।

আমরা এভাবে চিন্তা করতে পারি। একটি লেন শুধু সাইকেল আরোহীদের জন্য রাখতে পারি। এতে যানজট কমবে, সাইকেলে চড়ে অফিস, কর্মস্থলে যেতে পারবে। খরচ কমে যাবে, পরিবেশ দূষণের মাত্রা অনেক কমে যাবে। আর রাজধানীতে যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে দিতে হবেই। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে দিতে হবে। সরকারি গাড়ি ব্যবহারে বা বরাদ্দে নতুন চিন্তা আনা যেতে পারে। যাতে একটি গাড়ি অনেকে ব্যবহার করতে পারে, সেটা চিন্তা করা যেতে পারে।

মাদ্রিদের রয়্যাল থিয়েটারের সামনের চত্বরটিতে ইতোমধ্যেই গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ, অন্যান্য এলাকাও ‘পেডেস্ট্রিয়ান জোন’ ঘোষণা করার প্রচেষ্টা চলেছে। লক্ষ্য হলো, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ¯েপনের রাজধানীর গোটা কেন্দ্রীয় অংশটি শুধু পথচারীদের জন্য খোলা রাখা। এর কারণ হলো, মাদ্রিদের চারপাশে পাহাড় থাকার ফলে দূষিত বায়ু শহরেই আটকা পড়ে ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। রাজধানীতে আমরা পথচারীদের জন্য আরো রাস্তা তৈরি করতে পারি। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। আমাদের রাজধানী ঢাকায় ফুটপাত বেশির ভাগই অবৈধ দখলে। বাণিজ্যিক কাজে বা দোকান হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা দখল করে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এতে শহরের যানজট অনেক কমে যাবে। দুর্ঘটনাও কমে যাবে। ন্যারো রাস্তা প্রশস্ত হবে।

ভবিষ্যতে হেলসিংকিতে সরকারি পরিবহন আরো ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠবে, কেন না আগামী দশ বছরের মধ্যে সব ধরনের সরকারি পরিবহনকে একটি অ্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হবে; বাস, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি মিনিবাসগুলির কোনো নির্দিষ্ট রুট থাকবে না। তারা অ্যাপ অনুযায়ী যাত্রী তুলে নিতে পারবে। এতে গাড়ির ব্যবহার সংখ্যা কমে যাবে।

ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লি কুয়াশা বা ধোঁয়ার জন্য আজ বিশ্বসেরা। দিল্লি একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে দিল্লিতে যাবতীয় নতুন গাড়ি বিদ্যুৎচালিত হবে। ডিজেল বা পেট্রলে চলা গাড়ি আস্তে আস্তে কমিয়ে জিরোতে আনতে এ পরিকল্পনা। আমরাও ভেবে দেখতে পারি দিল্লিকেন্দ্রিক এ পরিকল্পনা। আমাদের মতো করে।

আমাদের রাজধানীকে পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্ত করতেই হবে। আগামীর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হবে শিশুদের জন্য। যানবাহন-সংক্রান্ত থেকে পরিবেশ দূষণ কমাতে পারলেই পরিবেশ দূষণের হার অনেকাংশেই কমে যাবে। আমরা সবাই মিলে এগিয়ে এলেই সহজ হবে। সবুজ শহর গড়ে উঠবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপ মিলেই বিরাট পথ তৈরি হবে।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

abuafzalsaleh@gmail.com

 

"